ছায়ামূর্তি কথাটা শেষ করে দ্রুত চলে যাচ্ছিলো।
কারাকক্ষ ছেড়ে কিছুদূর অগ্রসর হতেই বনহুর ছায়ামূর্তির সম্মুখে এসে দাঁড়ালো দৃঢ় মুষ্ঠিতে চেপে ধরলো ছায়ামূর্তির একটি হাতজোবাইদাকে তুমিই তাহলে হত্যা করেছিলে?
ছায়ামূর্তি এতোটুকু চমকালো না, বললো–হাঁ আমিই জোবাইদাকে হত্যা করেছি।
কি অপরাধ করেছিলো সে তোমার?
জানি না।
বলতে হবে তোমাকে।
আমি কোন কথা বলবো না।
কাল ভোরে তোমাকে গুলী করে হত্যা করা হবে।
বেশ, আমি তাই চাই।
ছায়ামূর্তি এবার এক ঝটকায় বনহুরের হাতের মুঠা থেকে হাত খানা ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেলো।
বনহুর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, তারপর ফিরে চললো নিজের কক্ষের দিকে। জোবাইদার প্রেত আত্মা ভেবে আস্তানার লোকেরা যে ছায়ামূর্তিটি সন্দেহ করে এসেছিলো, বনহুর আজ তার আসল পরিচয় পেয়েছে। আরও জানতে পেরেছে নাসরিন জোবাইদার হত্যাকারিণী নয়।
বনহুর জানতো, কে এই নর হত্যাকারী তবু সে আসল হত্যাকারী উদ্ঘাটনের জন্য উন্মুখ ছিলো।
এবার তার সব সন্দেহের অবসান হয়েছে কিন্তু এতে তার চিন্তাধারা লাঘব হলো না বরং আরও বেড়ে গেলো চরম আকারে। নিজ কক্ষে প্রবেশ করে হস্তস্থিত রিভলভারটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো টেবিলে। গভীর একটা দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠলো তার মুখমন্ডলে।
ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারী করছে বনহুর।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলো রহমান।
বনহুর পদশব্দে চমকে উঠলো, এই বুঝি সে জীবনে সর্বপ্রথম আচমকা চমকে উঠলো। ফিরে তাকাতেই দেখলো-রহমান দাঁড়িয়ে আছে নত মস্তকে।
বনহুর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে কিছু ভাবলো, তারপর কয়েক পা এগিয়ে এসে ডাকলো –রহমান।
সর্দার।
তুমি এসেছো ভালই হলো, একটা কথা আছে তোমার সঙ্গে এসো রহমান!
রহমান বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো।
বনহুর আবার পায়চারী করতে শুরু করলো। কিছু যেন বলতে চায় কিন্তু বলতে সাহস পাচ্ছে না সে।
রহমান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিক্ষা করতে লাগলো। তার মুখ ভাবও বেশ গম্ভীর ভাবাপন্ন।
বনহুর পায়চারী বন্ধ করে রহমানের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। কিছু বলতে গেলো কিন্তু পারলো না।
রহমান বলে উঠলো–সর্দার, আমি জানি আপনি কি বলতে চান।
রহমান। অস্ফুট শব্দ করে উঠলো বনহুর।
হাঁ সর্দার আমি সব শুনেছি।
শুনেছো! শুনেছো রহমান? বলো এখন উপায়?
সর্দার কাল ভোরে নাসরিনের মৃত্যুদন্ড—
হবে না! রহমানের কথা মাঝখানে বলে উঠলো বনহুর।
তাহলে?
আমি সেই কথাই তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি রহমান। নাসরিনের মৃত্যুদন্ডাদেশ বাতিল করতে হবে।
কিন্তু–
দোষীকে শাস্তি দেওয়াই আমার কাজ। রহমান, জোবাইদার হত্যাকারী কি নিশ্চয়ই জানতে পেরেছো।
হাঁ সর্দার; কিন্তু কি করে তাকে আপনি—
বনহুর কাউকে ক্ষমা করে না, নিজের পিতাকেও না।
তাহলে কি আপনি–?
হাঁ, জোবাইদার হত্যাকারীকে উচিৎ সাজা পেতে হবে।
সর্দার।
কিন্তু কোন উপায় নেই।
সর্দার, ওর বদলে আমাকে মৃত্যুদন্ড দিন, আমিই প্রকাশ্য দরবারে নিজকে জোবাইদার হত্যাকারী বলে প্রমাণ করবো।
তা হয় না রহমান, বনহুর কোনদিন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেয় না। তুমি যাও, কাল জোবাইদার হত্যাকারী প্রেত আত্মাবেশী নূরীর মৃত্যুদন্ড হবেই।
সর্দার–রহমান বনহুরের পা দু’হাতে জড়িয়ে ধরলো। নূরীকে মাফ করে দিন সর্দার।
যে অপরাধ সে করেছে তার মাফ নেই।
সর্দার! সর্দার, কেউ জানে না নূরী জোবাইদার হত্যাকারী।
কিন্তু আমি জানি, আমি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ পেয়েছি। জোবাইদাকে হত্যা করে সে ভুল করেছে।
সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করে নূরী, দৃঢ়কণ্ঠে বলে–না, আমি ভুল করিনি। জোবাইদাকে হত্যা না করলে সেই দন্ডে সে হত্যা করতো বনহুরকে।
রহমান বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে উঠলো–সরদারকে সে হত্যা করতো? বলো কি নূরী?
হাঁ, জোবাইদা তোমাদের সর্দারকে খুন করতো।
বনহুর অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলো–তাই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছো?
হাঁ, আমি সব সহ্য করতে পারবো, কিন্তু তোমাকে কেউ হত্যা করবে, এ আমি সহ্য করতে পারবো না। জোবাইদার হত্যাকারী আমি–আমাকে তুমি মৃত্যুদন্ড দাও কোন দুঃখ নেই।
তাই হবে কাল ভোরে তোমাকে হত্যা করা হবে। গম্ভীর কণ্ঠে বললো বনহুর।
রহমান বলে উঠলো–সর্দার!
যাও, তোমরা আমাকে বিরক্ত করো না।
রহমান মাথা নত করে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলো।
নূরীও বেরিয়ে গেলো পরক্ষণে।
*
মনি অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
পাশে এসে দাঁড়ালো নূরী, চোখে তার অশ্রুর বন্যা বয়ে চলেছে। কাল ভোরে তার মৃত্যুদন্ড। মরণে নূরীর এতোটুকু বেদনা বা দুঃখ নেই। দুঃখ মনিকে ছেড়ে যেতে হবে তাই–
জোবাইদাকে হত্যা করার পর নিজকে সে বাঁচাতে চেয়েছিলো। তাই সেদিন নাসরিনের ম্লান। মুকের দিকে তাকিয়েও নূরী নিজেকে দোষী বলে স্বীকার করেনি। কিন্তু নিজের মনের কাছে সে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলো না। রাত হলেই জোবাইদার আত্মা যেন তার গলা টিপে ধরতে আসতো নূরী আতঙ্কে শিউরে উঠতো কিছুতেই স্থির থাকতে পারতো না। অন্ধকারে আত্মগোপন করে বেরিয়ে পড়তো। আস্তানার বাইরে যাবার গোপন দ্বার যা কারো জানা ছিলো না সেই দ্বারের সন্ধান জানতে পেরেছিলো নূরী। বনহুর যেদিন জোবাইদাকে বলেছিলো “আমাকে হত্যা করার পর ঐ পথে পালিয়ে যাবে, কেউ তোমার সন্ধান পাবে না।” তখন নূরী আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনেছিলো বনহুরের উক্তিটা।
