দিন গিয়ে এক সময় রাত হয়ে এলো।
আস্তানায় সূর্যালো প্রবেশের কৌশলে ব্যবস্থা করছিলো সূর্যের আলো নিভে যেতেই আস্তানার আললাগুলি জ্বলে উঠলো– মশালের আলো।
কিন্তু বনহুর আজ আদেশ দিলো সব আলো নিভিয়ে ফেলতে। রহমান স্বয়ং এ আদেশ প্রচার করলে আস্তানার মধ্যে। বনহুরের আস্তানায় আলো নিভিয়ে ফেলার আদেশ এই সর্ব প্রথম।
বনহুরের অনুচরগণ সকলেই অবাক হলো, এমন অদ্ভুত আদেশের জন্য তারা মোটেই প্রস্তুত ছিলো না।
এমন কি আস্তানার কারাকক্ষগুলিও আজ অন্ধকার।
রাত বেড়ে আসছে।
বনহুরের কক্ষে দেয়াল ঘড়িটা টিক্ টিক্ করে বেজে চলছে। শয্যায় শয়ন করে ঘড়িটার শব্দ শুনছিলো বনহুর।
রাত যখন তিনটা বাজলো, সমস্ত আস্তানা যখন সুপ্তির কোলে ঢলে পড়ছে, বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো। শরীরে তার জমকালো পোশাক পরাই ছিলো।
রিভলভারটা হাতে তুলে নিয়ে অগ্রসর হলো অতি সন্তর্পণে।
জমাট অন্ধকারে বনহুরের আস্তানা আজ অন্ধকার। বনহুর এগিয়ে চলেছে, চারিদিকে সর্তক দৃষ্টি রেখে অতি গোপনে যাচ্ছে সে–
বেশ কিছুদূর অগ্রসর হয়েছে–ঠিক সেই সময় একটা লঘু পদশব্দ তার কানে এসে পৌঁছলো। অত্যন্ত ধীর পদক্ষেপে কেউ যেন সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে।
বনহুর চট করে একটা থামের আড়ালে আত্মগোপন করলো। স্পষ্ট দেখতে পেলো একটা ঝাপসা কালো মূর্তি মন্থর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
বনহুর এই মুহূর্তে মূর্তিটাকে গ্রেপ্তার করতে পারতো কিন্তু তা না করে নিশ্চুপ অনুসরণ করলো ছায়ামূর্তিটাকে।
বনহুরের চোখ দুটি অন্ধকারে জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। দক্ষিণ হস্তে গুলী ভরা রিভলভার। ছায়ামূর্তিটিকে লক্ষ্য রেখে অগ্রসর হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে ছায়ামূর্তি আস্তানার দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সমস্ত শরীর তার কালো আবরণে আচ্ছাদিত।
ছায়ামূর্তিটি এবার সোজা দক্ষিণ দিকে এগিয়ে গিয়ে দেয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বনহুর রুদ্ধ নিঃশ্বাসে প্রতিক্ষা করছে। হঠাৎ যেন অদৃশ্য হয়ে গেলো ছায়ামূর্তিটা।
বনহুরও এবার সেই দেয়ালের পাশে এসে দাঁড়ালো। একটা হাসির রেখা তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো অন্ধকারে। বনহুরও অদৃশ্য হলো এবার দেয়ালের মধ্যে।
গহন বন।
ছায়ামূর্তি সন্তর্পণে বনের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো। ঝোপ ঝাড় ছাড়িয়ে চলেছে মূর্তিটা।
বনহুর বেশ কিছুটা দূরে ছায়ামূর্তির উপর লক্ষ্য রেখে এগুচ্ছে। কোন রকম যেন টের না পায় ছায়ামূর্তি সেদিকে বনহুরের সতর্ক লক্ষ্য আছে।
জোবাইদার কবরের দিকে এগিয়ে চলেছে ছায়ামূর্তি। বনহুরও সেইদিকে যাচ্ছে, লক্ষ্য তার ছায়ামূর্তি।
ছায়ামূর্তি জোবাইদার কবরের পাশে থমকে দাঁড়ালো। অন্ধকারে জায়গাটা কালো হয়ে উঠেছে, ছায়ামূর্তির শরীরের পোশাকও কালো থাকায় তাকে আর মোটেই দেখা যাচ্ছে না।
বনহুর জোবাইদার কবরের অতি নিকটে একটা গাছের গুঁড়ির আড়ারে লুকিয়ে পড়লো। সেখান থেকে ছায়ামূর্তিটাকে দেখা না গেলেও তার গতিবিধি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ কোন শব্দই শোনা গেলো না। বনহুর কান পেতে প্রতিক্ষা করছে–এবার শোনা গেলো একটা চাপা কান্নার আওয়াজ। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে কেউ যেন।
বনহুর ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলো আজ সে আবিষ্কার করবে জোবাইদার প্রেত আত্মার আসল পরিচয়। তার সঙ্গে প্রমাণ করবে কে জোবাইদার সত্যিকারের হত্যাকারী। নাসরিনই জোবাইদাকে হত্যা করেছে কিনা জানতে চায় বনহুর।
অনেকক্ষণ কেটে গেলো, ছায়ামূর্তি এবার কবরের পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালো বলে মনে হলো বনহুরের। ফিরে চললো আবার যে পথে এসেছিলো সেই পথে।
আবার আস্তানায় প্রবেশ করে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কিছু চিন্তা করলো ছায়ামূর্তি এবার সে অগ্রসর হলো নাসরিনের কারাকক্ষের দিকে।
বনহুরও এবার তাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে আসতে লাগলো। ছায়ামূর্তি সোজা নাসরিনের কারাকক্ষের পাশে এসে দাঁড়ালো।
বনহুর চট করে একটা থামের আড়ালে আত্মগোপন করে লুকিয়ে পড়লো।
ঠিক সেই সময় আর একজন অতি সতর্কতার সঙ্গে এসে দাঁড়ালো অন্য একটি থামের আড়ালে।
অজানিত এই লোকটি বনহুর আর ছায়ামূর্তিটাকে সর্বপ্রথম হতেই ফলো করে আসছিলো। তার শরীরেও জমকালো পোশাক– অন্ধকারে তাকে যেন কেউ দেখে না ফেলে সেদিকে তার অত্যন্ত সতর্কতা ছিলো।
নাসরিনের কারাকক্ষের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ছায়ামূর্তি ফিস ফিস করে ডাকলো–নাসরিন– নাসরিন–,
চমকে উঠলো বনহুর–এ কণ্ঠস্বর তার যে অতি পরিচিত।
আর চমকে উঠলো ঐ অজ্ঞাত লোকটি।
বনহুর সজাগ হয়ে দাঁড়ালো সে জানে না আর একজন তাদের দু’জনাকেই প্রথম থেকে লক্ষ্য করে আসছে।
এবার শোনা গেলো ব্যথাকরুণ গলায় আওয়াজ–আমাকে ক্ষমা করো নাসরিন, আমাকে ক্ষমা করো, যে পাপ আমি করেছি তার প্রায়শ্চিত্ত আমাকেই করতে হবে।
নাসরিনের গলার আওয়াজ শোনা গেলো–তা হয় না, সবাই জানে, আমিই জোবাইদার হত্যাকারী, কাজেই–
চুপ। আর ও কথা বলো না। নাসরিন আমার এ বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকাই শ্রেয়। কি হবে এ দুর্বিসহ জীবন বয়ে? ছায়ামূর্তি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
এবার নাসরিনের কণ্ঠ–তোমার যদি দুর্বিসহ জীবন হয় তাহলে আমারই বা কি লাভ বেঁচে থেকে বলো। বরং তুমি বেঁচে থাকলে–
না না, তা হয় না নাসরিন তা হয়না। আমি জোবাইদার হত্যাকারী–ভোরে আমারই মৃত্যুদন্ড হবে,তোমার নয়।
