*
আজ সমস্ত আস্তানায় একটা গম্ভীর থমথমে ভাব বিরাজ করছে। আজকের রাত্রি গত হলেই নাসরিনের মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে। জোবাইদাকে হত্যা করার জন্যই তাকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে।
নাসরিনকে আস্তানার সবাই ভালবাসতো, স্নেহ করতো। কারণ নাসরিন ছিলো সদা হাস্যময়ী উদার প্রাণ যুবতী। কালু খাঁ জীবিত কালে নাসরিন খুব বড় ছিল না তার মৃত্যুর পর সে এতো বড় হয়েছে। বৃদ্ধা দাই মা আর অন্যান্য সকলের আন্তরিকতায় মানুষ হয়েছে সে। কাজেই ওকে সকলে অত্যন্ত ভালবাসতো।
নাসরিনের মৃত্যুদন্ডাদেশ সকলের মনে গভীর একটা বেদনার ছায়াপাত করেছে। কিন্তু কোন উপায় নেই-দস্যু বনহুরের আদেশ।
কারাকক্ষে নাসরিন শুনলো, কাল ভোরে তার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে চিরতরে। একটা করুণ ক্রন্দন তার কণ্ঠ ঠেলে বেরিয়ে এলো প্রাণ ভরে কাঁদলো সে।
দাইমা তো মাথা কুটে কাঁদা শুরু করে দিয়াছে। নাসরিন কখনও জোবাইদাকে হত্যা করতে পারে না–এ কথাই সে বার বার উচ্চারণ করছে। দাইমার ক্রন্দনে বনহুরের আস্তানার পাষাণ প্রাচীরে প্রতিধ্বনি জাগছিল।
নূরী আজ কদিন তার কক্ষ থেকে বাইরে বের হয়নি। মনিকে নিয়ে সে সব সময় নিজের। ঘরে ব্যস্ত রয়েছে এমন কি বনহুরের সঙ্গেও সে আর দেখা করেনি।
দাইমার কান্নার আওয়াজ তার কানে পৌঁছবে বলে সে নিজের ঘরের দরজা জানালা শক্ত করে বন্ধ করে দিয়েছিলো। কেমন যেন একটা বিমর্ষ ভাব নূরীর মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো, হাজার হলেও তার শিশু কালের সাথী সহচরী কিনা।
বনহুর আজ কোথাও যায় নি, নিজের কক্ষে বসে কিছু চিন্তা করছিল; এমন সময় ঝড়ের বেগে কক্ষে প্রবেশ করলো বৃদ্ধা দাইমা বনহুরের জামার আস্তিন দু’হাতের মুঠায় আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে উঠলো সে বনহুর তুমি দস্যু হয়েছে বলে যা তা করবে? পারবে না আমি বেঁচে থাকতে তুমি পারবে না নাসরিনকে হত্যা করতে।
বনহুর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো–আমার আদেশ তাকে হত্যা করতেই হবে।
কেন? কেন তাকে হত্যা করবে?
নাসরিন জোবাইদাকে হত্যা করেছে বলে।
না, নাসরিন তাকে হত্যা করেনি।
সে নিজে স্বীকার করেছে–জোবাইদার হত্যাকারী সে নিজে।
তুমি জানো না বনহুর, নাসরিন তাকে হত্যা করতে পারে না। না না, কিছুতেই না। আমি নাসরিনকে হত্যা করতে দেবনা।
বনহুর এক ঝটকায় বৃদ্ধাকে ঠেলে সরিয়ে দিলো–যাও এখান থেকে।
আমি যাবো না। যতক্ষণ না তুমি নাসরিনের মৃত্যুদন্ডাদেশ ফিরিয়ে নিয়েছো আমি যাবো না তোমার কক্ষ থেকে।
বনহুর ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকালো বৃদ্ধার দিকে। তার কলিং বেলে হাত রাখলো।
সঙ্গে সঙ্গে কক্ষে প্রবেশ করলো রহমান–সর্দার।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–একে নিয়ে যাও, যতক্ষণ নাসরিনের মৃত্যুদন্ড না ঘটেছে। ততক্ষণ বন্দী করে রাখো।
পাপিষ্ঠ আমাকে বন্দী করবি। চিরদিন দস্যুতাকে সমর্থন করে এসেছি–আর নয়। আমিই তোকে হত্যা করবো–বৃদ্ধ কাপড়ের নিচ হতে একখানা সূতীক্ষ ধার ছোরা বের করে আচমকা বসিয়ে দিতে গেলো বনহুরের বুকে।
সঙ্গে সঙ্গে রহমান খপ করে বৃদ্ধার ছোরা সহ দক্ষিণ হাতখানা ধরে ফেললো–এ তুমি কি করতে যাচ্ছো দাইমা?
ছেড়ে দাও আমি ওকে হত্যা করবো। দস্যুতার শেষ সমাধি করবো আমি—
বনহুর বললো–নিয়ে যাও ওকে।
রহমান দাইমাকে টানতে টানেতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো।
বনহুর ওদিকের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলো কে যেন দ্রুত সরেগেলো ওপাশ থেকে।
অন্যান্য দিনের চেয়ে বনহুরকে আজ বেশি গম্ভীর মনে হচ্ছিলো। সব সময় কিছু যেন গভীরভাবে চিন্তা করছে।
আজ একটি মাত্র রাত্র–তারপর জোবাইদার হত্যাকারীকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হবে। সত্যই নাসরিন হত্যাকারী কিনা, তার প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে আজ রাতেই। আজ রাতেই আরও একটা রহস্য তাকে উদ্ঘাটন করতে হবে–কে এই জোবাইদার প্রেত আত্মার বেদে ছায়ামূর্তি। বনহুর গত রাতেই প্রেত আত্মার আত্ম প্রকাশের চরম পরিণতি ঘটাতে পারতো কিন্তু রহমানের সম্মুখে সে চায়না ও কাজ করতে।
কিন্তু আজ রাতে সে দেখবে–কে এই প্রেত আত্মা। কি উদ্দেশ্য নিয়ে সে তার আস্তানায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। জোবাইদার কবরের পাশে জমাট অন্ধকারে কে-ই বা অমন করে রোদন করছিলো! বনহুরের কাছে এসব যেন রহস্যময় মনে হচ্ছে। জীবনে সে কোন দিন বিশ্বাস করেনি ভূতপ্রেত বা অশরীরী আত্মার অস্তিত্ব। ছোট বেলা হতেই বনহুর ভয়হীনভাবে মানুষ হয়েছে। দুর্বলতা কাকে বলে জানে না সে কোনদিন। অসাধ্য সাধন করাই বনহুরের জীবনের ব্রত।
আজ তার নিজের আস্তানায় প্রেত আত্মার আবির্ভাব উপলব্ধি করে হাসি পায় ওর। বনহুর জানে প্রেত আত্মার সাহস নেই তার আস্তানায় প্রবেশ করে।
বনহুর আজ এক মহা সমস্যার সম্মুখীন। মানুষ হত্যা করা তার কাছে তেমন কিছু নয়, কিন্তু জোবাইদার হত্যা তাকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। জোবাইদার হত্যাকারী হিসাবে নাসরিনকে কারারুদ্ধ করা হলেও আসলে নাসরিন হত্যাকারী নাও হতে পারে সে হয়তো মনের কোন ব্যথা চাপতে গিয়ে নিজেকে জোবাইদার হত্যাকারী বলে প্রমাণ করছে। আসলে সে-ই হত্যাকারী কিনা এর নিগূঢ় প্রমাণ দরকার এবং সে প্রমাণ আজ রাতেই তাকে সংগ্রহ করতে হবে।
বনহুরের সম্মুখে আজ সারাটা দিন কেউ আসতে সাহসী হয়নি একমাত্র রহমান ছাড়া। বনহুর আজ রহমানকেও এড়িয়ে চলেছে, বেশিক্ষণ ওর সঙ্গে কথা বলেনি সে!
