রহমান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো তার মুখের দিকে।
বনহুর ফিরে দাঁড়ালো–চলো রহমান।
অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করলো রহমান–সেকি সর্দার, ওখানে গিয়ে দেখলেন না একটি বার?
বৃথা অন্বেষণ করা হবে, ওখানে ওর চিহ্নটিও নেই।
বনহুর তার বিশ্রাম কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো।
রহমান অনুসরণ করলো তাকে।
কক্ষে প্রবেশ করে রিভলভারটা টেবিলে রেখে শয্যায় এসে বসলো বনহুর, মুখোভাব স্বাভাবিক।
রহমান সম্মুখে দাঁড়িয়ে রইলো নিশ্চপ, সর্দারের কোন আদেশের প্রতিক্ষা করছে সে।
বনহুর বললো–রহমান।
বলুন সর্দার?
তোমার কি সন্দেহ হয় ঐ ছায়ামূর্তি জোবাইদার প্রেতআত্মা?
হয়না, কিন্তু আশ্চর্য ঐ ছায়ামূর্তি ছায়াই বটে। সর্দার আমি অনেক দিন লক্ষ্য করেছি– নিশিথ রাতে যখন সমস্ত আস্তানা নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ে তখন কে যেন অতি সন্তর্পণে আস্তানার। পাশে পাশে ঘুরে বেড়ায়, কার যেন লঘু পদশব্দ শোনা যায় গভীর অন্ধকার। একটা দীর্ঘশ্বাস যেন ভেসে বেড়ায় এদিক থেকে সেদিকে। কোন বেদনা ভরা নিঃশ্বাস।
বনহুর এবার আরো জোরে হেসে উঠলো–রহমান ভুলে যেওনা তুমি সাধারণ মানুষ নও। তোমার কথা শুনে আমার মনে হচ্ছে আজকাল তুমি কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে বেড়াচ্ছো।
সর্দার, আপনি যা-ই বলুন, আমি নিজের চোখে দেখছি, সেই ছায়ামূর্তি কোথা থেকে আসে। জানিনা, কিন্তু তাকে আমি জোবাইদার কবরের দিকে চলে যেতে দেখেছি।
তুমি আর ওকে অনুসরণ করোনা রহমান।
কেনো সর্দার।
ভয় পাবে।
সর্দার রহমান ভয় পাবার বান্দা নয়।
জানি, কিন্তু তোমার মনের দুর্বলতা তোমাকে অনেকখানি নিচে নামিয়ে এনেছে। যাও বিশ্রাম করোগে, আর শোন–কাল ভোরে নাছরিনের মৃত্যুদন্ডাদেশ সবাইকে আর একবার স্মরণ করিয়ে দিও।
আচ্ছা সর্দার। রহমান বেরিয়ে গেলো।
রহমান চলে যেতেই বনহুর কক্ষ মধ্যে পায়চারী শুরু করলো।
গভীরভাবে কিছু চিন্তা করছে সে।
এক সময় বনহুর তার নিজস্ব ড্রেসে সজ্জিত হয়ে নিলো। তারপর রিভলভারটা তুলে নিলো হাতে। অত্যন্ত সর্তকতার সঙ্গে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলো বাইরে। এগিয়ে চললো বনহুর জোবাইদার কবরস্থানের দিকে।
ঘন ঝোপ ঝাপের ভিতর দিয়ে গোপনে এগুতে লাগলো সে। দক্ষিণ হস্তে গুলী ভরা। রিভলভার।
কবরের অদূরে পৌঁছতেই বনহুরের কানে এলো একটা চাপা করুণ কান্নার সুর।
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো বনহুর, একটা ঝোপের আড়ালে আত্মগোপন করে দাঁড়িয়ে রইলো।
শব্দটা জোবাইদার কবরের পাশ থেকেই আসছে।
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কে যেন কাঁদছে।
বনহুর সজাগ হয়ে কান পাতলো তবে কি রহমানের অনুমান সত্য! জোবাইদার প্রেত আত্মাই কি, রাত্রির দুর্ভেদ্য অন্ধকার ভেদ করে আস্তানার চারিপাশে ঘুরে বেড়ায়? তবে কি রহমান এ সব যা দেখেছে সব বাস্তব? কিন্তু সবাই বিশ্বাস করলেও সে বিশ্বাস করতে পারেনা। মৃতের অশরীরী আত্মা কোনদিন–
বনহুরের চিন্তাজাল ছিন্ন হয়ে গেলো ফিস ফিস করে কে যেন কথা বলছে, ব্যথা ভরা কণ্ঠস্বর।
বনহুর শুনতে চেষ্টা করলো কিন্তু কিছুই বোঝা গেলো না।
কখন যে আকাশে মেঘ জমে, উঠেছিলো খেয়াল করেনি বনহুর; ঝম ঝম করে বৃষ্টি শুরু হলো। চমকে উঠলো বনহুর–বৃষ্টির সঙ্গে দমকা হাওয়া বইতে আরম্ভ করলো।
সাঁ সাঁ করে বাতাস বইছে, সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ বৃষ্টি। বনহুর কবরের দিকে এগুতে চেষ্টা করলো, কিন্তু তখন সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে।
ফিরে এলো বনহুর নিজের কক্ষে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলো–রহমান যা ভাবছে। তা সম্পূর্ণটা মিথ্যা বা অহেতুক নয়। সত্যই এটা অতৃপ্ত আত্মা তার আস্তানায় কার অপেক্ষায় যেন হা হুতাশ করে মরছে। কিন্তু কে সে; বনহুর তাকে আবিষ্কার করবেই করবে।
বনহুর এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
ধীরে ধীরে দরজা খুলে যায় তার শিয়রে এসে দাঁড়ায় ছায়ামূর্তি। সমস্ত শরীর তার কালো কাপড়ে ঢাকা।
সমস্ত রাত্রি জাগরণের ফলে বনহুর অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
ছায়ামূর্তি অর্ধনির্বাপিত মশালের আলোতে বনহুরের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো অতৃপ্ত নয়নে। কালো আলখেল্লার মধ্যে চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে জ্বলছে ঠিক ভোরের তারার মত। বনহুর নিজের শরীরে কোন চাদর চাপা না দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ছায়ামূর্তি ওদিকের আলনা থেকে শালের চাদরটা নিয়ে বনহুরের গায়ে বেশ করে দিয়ে দিলো। তারপর যেমনি এসেছিলো তেমনি বেরিয়ে গেলো মন্থর গতিতে।
*
ভোরে বনহুরের ঘুম ভাংতেই হাই তুলে বিছানায় উঠে বসলো।
এমন সময় রহমান এসে দাঁড়ালো–সর্দার!
বেলা হয়ে গেছে বড়।
বেশি বেলা হয়নি সর্দার, তবে কমও হয়নি। দরবার কক্ষে সবাই এসে হাজির হয়েছে। কাল যে খবরটা প্রচার করে দিতে বলেছিলেন–
হাঁ, দাও গে যাও। কথাটা বলেই অবাক হলো বনহুর–তার শরীরে এ শালের চাদরটা এলো কি করে! একটু চিন্তা করে বললো সে–আমি শোবার পর তুমি কি আবার আমার কক্ষে এসেছিলে?
না সর্দার, আমি আর আসিনি। কিন্তু কেনো?
বনহুর কিছু বলতে গিয়ে আর বললো না, একটু শব্দ করলো শুধু-হু।
রহমান বনহুরের মুখভাব করে এবং কিছু সে তার কাছে গোপন করলো বুঝতে পেরে গম্ভীর হলো।
বনহুর বললো–যাও, আমার আদেশটা আস্তানার সকলের নিকট জানিয়ে দাও।
আপনি যাবেন কি সর্দার?
না, তুমি যাও।
রহমান বেরিয়ে গেলো।
বনহুর আবার তাকালো নিজের দেহের দিকে–কে তার শরীরে চাদর চাপা দিয়েছিলো, সত্যি তাকে বাহবা না দিয়ে পারলো না বনহুর। কারণ তার মত এক জনের পাশে এসে তার দেহে কাপড় চাপা দেবার সাহস এ আস্তানায় কার হতে পারে।
