নাসরিনের হাত দু’খানা লৌহ শিকলে বাধা, বনহুরের সম্মুখে ভূতলে নত মুখে বসে আছে। চুলগুলো পিঠের উপর ছড়িয়ে পড়ে আছে। মুখমন্ডল করুণ অশ্রুসিক্ত।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–নাসরিন, তুমি মৃত্যু চাও না মুক্তি চাও?
নাসরিন চোখ তুলে তাকালো, ঠোঁট দু’খানা নড়ে উঠলো, কিছু বলতে গিয়ে বলতে পারলো না।
বনহুর পুনরায় কঠিন কণ্ঠে গর্জে উঠলো–নাসরিন, আমার নিকটে কোন সময় মিথ্যা বলতে বা কিছু গোপন করতে চেষ্টা করোনা, আমি জানি–জোবাইদার হত্যাকারী তুমি, কাজেই মৃত্যু চাও না মুক্তি চাও?
নাসরিন মুহূর্তে চোখ তুলে তাকালো, নূরীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো তার।
নূরী অধর দংশন করলো।
বনহুর বললো–কি চাও তুমি? মৃত্যু হলে জোবাইদার হত্যার প্রায়শ্চিত্ত গ্রহণ করতে হবে, আর যদি মুক্তি চাও তবে তোমার হস্তদ্বয় ছেদন পূর্বক তোমাকে আমরা আস্তানা থেকে বের করে দেওয়া হবে। বলো কোটা চাও?
নাসরিন এবার মুখ তুলে সোজা হয়ে বসলো–মৃত্যুই আমি চাই।
বেশ, তাই হবে। রহমান, কাল ভোর রাতে নাসরিনকে তীরবিদ্ধ করে হত্যা করা হবে।
রহমান বলে উঠলো–সর্দার।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বললো–আমার আদেশ অমান্য হরার নয়। যাও, কালকের জন্য প্রস্তুত হও।
বনহুর কক্ষ ত্যাগ করে বেরিয়ে গেলো। সমস্ত দস্যু অনুচরের মুখমন্ডল বিবর্ণ করুণ হলো। তারা সবাই জানে নাসরিন অতি ভাল মেয়ে। সে কিছুতেই জোবাইদাকে হত্যা করতে পারে না। কিন্তু সর্দারের আদেশ নাসরিনের মৃত্যুদন্ড হবেই।। সমস্ত আস্তানায় একটা গভীর শোকের ছায়া নেমে এলো। সবাই নাসরিনের মৃত্যুদন্ড নিয়ে আলোচনা করতে লাগলো–এমন কি রহমানের মনেও একটা ব্যাথার ছায়া ঘনিয়ে এলো।
সর্দারের বিচারে কেউ খুশি হতে পারলো না তেমন করে।
নাসরিনকে আবার সেই অন্ধকার কারাকক্ষে বন্দী করে রাখা হলো। রাত ভোরে তাকে হত্যা করা হবে। জোবাইদাকে হত্যার অপরাধে তাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে–
সর্দারের এ বিচারে কেউ খুশি না হলেও প্রতিবাদ করতেও সাহসী হয়নি কেউ।
গোপনে তারা দু’চারটে আলাপ আলোচনা যে না করলো তা নয়। সবাই দুঃখ করলো, অনুতপ্ত হলো, ব্যথিত হলো নীরবে কেউ কেউ চোখের পানি মুছলো।
বনহুর আজ সকাল সকাল চারটি খেয়ে বিশ্রাম কক্ষে প্রবেশ করলো। শরীর নাকি তার ভাল নয় আজ।
রহমান বুঝতে পারলো, নাসরিনের মৃত্যু দন্ডাদেশ দিয়ে সর্দার খুব ব্যথা পেয়েছে, কিন্তু কি করবে, আইন তো অমান্য করতে পারে না সে।
এক প্রহর দু’প্রহর করে রাত বেড়ে চললো।
রহমান সর্দারকে বিরক্ত না করে আস্তানায় ঘুরে ঘুরে পাহারা দিতে লাগলো। এটা তার ডিউটি–তার কাজ।
সমস্ত আস্তানা ঝিমিয়ে পড়েছে।
রহমান ঘুরে বেড়াচ্ছে, সজাগ প্রহরীর মত।
হঠাৎ চমকে উঠে রহমান অদূরে একটা, জমকালো ছায়ামূর্তি এগিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিনের মত। রাইফেল উদ্যত করতেই কানের কাছে ভেসে উঠলো সর্দারের কণ্ঠস্বর–ছায়ামূর্তি লক্ষ্য করে কখনও গুলী ছুঁড়বে না। রহমান উদ্যত রাইফেল নামিয়ে নিলো।
ছায়ামূর্তি এগিয়ে চলেছে।
রহমান আজ গুলী না ছুঁড়ে অনুসরণ করলো ছায়ামূর্তিটিকে। অতি সন্তর্পণে সাবধানে এগুতে লাগলো সে। থামের আড়ালে, দেয়ালের আড়ালে গোপনে গা ঢাকা দিয়ে ছায়ামূর্তিকে অনুসরণ করলো রহমান।
রহমান যখন ছায়ামূর্তি লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছে, ঠিক তখন বিপরীত দিক থেকে অন্ধকারে আত্নগোপন করে উদ্যত রিভলভার হস্তে অগ্রসর হচ্ছিলো বনহুর। উভয়েরই লক্ষ্য সেই জমকালো ছায়ামূর্তি।
ছায়ামূর্তি অতি লঘু পদক্ষেপে এগুচ্ছে।
কোথায় চলেছে আজ দেখবে রহমান।
বনহুর জানতে চায় জোবাইদার প্রেত আত্না কেমন, কি তার অভিসন্ধি। মানুষ না সে অস্পৃশ্য ছায়া।
দু’জনার লক্ষ্য একই বস্তু।
দু’জনার মনেই একই জানার বাসনা।
অন্ধকারে এগুচ্ছে জমকালো ছায়ামূর্তি।
রহমান এগুচ্ছে, বিপরীত দিক থেকে এগুচ্ছে বনহুর।
হঠাৎ বনহুরের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যায় রহমানের।
বনহুর ঠোঁটে আংগুল চাপা দেয়।
রহমান চাপা কণ্ঠে বলে উঠে–সর্দার, ওটা জোবাইদার প্রেত আত্না।
২.০৪ প্রেত আত্মা
জমাট অন্ধকারে সন্তর্পণে এগুচ্ছে ছায়ামূর্তি।
বনহুর আর রহমান অতি গোপনে অনুসরণ করছে ছায়া মূর্তিটিকে। বনহুরের হস্তে গুলী। ভরা রিভলভার। আর রহমানের হস্তে উদ্যত রাইফেল। নিশ্বাস বন্ধ করে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা।
বনহুর ইচ্ছা করলে এই মুহূর্তে রিভলভারের এক গুলীতে ছায়ামূর্তির ভবলীলা সাঙ্গ করে দিতে পারে কিন্তু তার সে ইচ্ছা নয়। বনহুর ছায়ামূর্তিটিকে গ্রেপ্তার করে দেখবে–কে সে, সত্যই জোবাইদার প্রেত আত্মা না অন্য কেউ।
বনহুরের আস্তানায় প্রেত আত্মা–কম কথা নয়!
ছায়ামূর্তিটা যতই অগ্রসর হচ্ছে–বনহুর আর রহমান ততই আত্মগোপন করে দ্রুত তাকে অনুসরণ করছে।
হঠাৎ বনহুর আর রহমান স্তম্ভিত হয়ে পড়লো–সম্মুখস্থ ছায়ামূর্তি আচম্কা কোথায় যেন মিশে গেলো।
রহমান রাইফেল বাগিয়ে ধরলো, এই মুহূর্তে সে গুলী ছুড়বে।
বনহুর দক্ষিণ হস্তে রহমানের রাইফেল নামিয়ে দিয়ে বললো–আর গুলী ছুঁড়ে কোন ফল হবে না রহমান।
তাহলে ও পালিয়ে গেলো?
সুযোগ দিলাম আজ ওকে।
সর্দার।
হাঁ রহমান।
কিন্তু ওটা জোবাইদার প্রেত আত্মা ছাড়া কিছু নয় সর্দার।
বনহুর হঠাৎ হেসে উঠলো হাঃ হাঃ করে।
