অবাক কণ্ঠে বললো বনহুর–জোবাইদার প্রেত আত্না!
হা সর্দার, রোজ রাতেই প্রেত আত্না গোটা আস্তানায় ঘুরে বেড়ায়। ছায়ার মতই দেখে যায় তাকে, গুলী ছুঁড়লে হাওয়ায় মিশে যায়। নিকটে গেলে দেখা যায় না।
কথাগুলো বললো রহমান।
বনহুরের চোখেমুখে অবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠলো।
দরবার কক্ষস্থ সকলেই একবার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে নিলো।
বনহুর সকলের মুখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো-দরবার কক্ষে সবাই উপস্থিত আছে?
হা সর্দার, সকলেই উপস্থিত আছে। বললো রহমান।
বনহুর গভীর কণ্ঠে বললো–জোবাইদার হত্যাকারীর সন্ধান পেয়েছো রহমান?
না সর্দার, এখনও জোবাইদার হত্যাকারীর কোন সন্ধানই পাওয়া যায়নি।
আস্তানায় আমরা অনুচরদের মধ্যে কেউ কি বাইরে গেছে?
না, আপনার আদেশ অমান্য করার সাহস কারো নেই। আস্তানার বাইরে কেউ যায়নি সর্দার।
বেশ।
সেদিনের মত দরবার শেষ হলো।
.
গভীর রাত।
সমস্ত আস্তানা জুড়ে বিরাজ করছে একটা থমথমে নিস্তব্ধতা।
প্রহরীদের ভারী বুটের শব্দ ছাড়া কোন শব্দ নেই।
আজ কদিন হলো জোবাইদার প্রেত আত্নার আবির্ভাবে বনহুরের সাহসী দুর্ধর্ষ অনুচরগণও ভড়কে গেছে। গোটারাত ধরে তারা জেগে হই-হুল্লোড় করতো, কিন্তু এখন আর তাও করেনা। সদা ভয় কখন জোবাইদার প্রেত আত্না তাদের ঘাড় মটকে রক্ত চুষে নেবে।
এতোবড় একটা আস্তানায় সদা সর্বদা একটা আতঙ্ক ভাব জেগে রয়েছে।
বনহুর নিজের কক্ষে রিভলভার হস্তে পায়চারী করছে। জোবাইদার প্রেত আত্নাকে আজ সে দেখবে, তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে সে–যদি আপোষে না হয় তবে রিভলভারের গুলীতে হঠাৎ বনহুরের চিন্তাধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, রহমানের কণ্ঠস্বর শুনতে যায় বনহুর।
দরজার বাইরে ফিস ফিস করে ডাকছে রহমান–সর্দার, সর্দার।
বনহুর রিভলভার হস্তে দরজার বাইরে বেরিয়ে এলো।
রহমানের মত সাহসী যুবকের মুখেও ভয়ার্ত ভাব বনহুরকে দেখে বললো সে সর্দার, সেই ছায়ামূর্তি। জোবাইদার প্রেত আত্না।
কোথায়? বললো বনহুর।
সর্দার, ঐ যে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রহমান আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেলো সম্মুখের দিকে।
বনহুর দেখলো–একটা জমকালো ছায়া ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
রহমান সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল উঁচু করে ধরলো।
বনহুর বাম হস্তে রহমানের রাইফেল নীচু করে দিলো, মুখে কোন কথা বললোনা।
কিন্তু ততক্ষণে ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হয়েছে।
রহমান বললো–সর্দার, দেখলেন কেমন হাওয়ায় মিশে গেলো।
বনহুর বললো–রহমান, জোবাইদার প্রেত আত্নাকে যেন গুলী করো না।
করেছিলাম সর্দার কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি।
আশ্চর্য। বনহুর কথাটা উচ্চারণ করলো।
ফিরে এলো বনহুর আর রহমান নিজেদের কক্ষে।
রহমান বললো–সর্দার, এবার তো বিশ্বাস করেছেন জোবাইদার আত্না কিনা?
বনহুর পায়চারী করতে করতে বললো–জোবাইদার প্রেত আত্না কি চায় রহমান বলতে পারো?
না সর্দার, এ কথা আমরা বলবো কি করে?
রহমান।
বলুন সর্দার?
নূরীকে আজ দেখিনি কেনো?
কি জানি, জোবাইদার মৃত্যুর পর নূরী কেমন যেন হয়ে গেছে, এক সঙ্গেই থাকতো কিনা, তাই বোধ হয় শোক পেয়েছে বেচারী।
মিথ্যা নয় রহমান, এটা স্বাভাবিক। নূরী কি ঘুমিয়েছে?
হাঁ সর্দার, এখন তার কক্ষ অন্ধকার দেখছি, হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে।
তুমি যাও রহমান, নূরী যদি ঘুমিয়ে না থাকে তবে কথা শেষ না করে থেমে পড়লো বনহুর, একটু চিন্তা করে বললো–আচ্ছা আমিই যাচ্ছি ওর ওখানে।
বনহুর রিভলভার টেবিলে রেখে বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
রহমান চলে গেলো রাইফেল হস্তে বিপরীত দিকে।
বনহুর নূরীর কক্ষে প্রবেশ করেই সুইচ টিপে আলো জ্বালালো।
বনহুরের আস্তানায় ভূগর্ভ জলস্রোত হতে কারেন্ট তৈরি হতো এবং সেই কারেন্ট থেকে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলতো। কিন্তু মশালও ব্যবহার করতো বনহুর তার নিজস্ব কক্ষে এবং দরবার কক্ষে।
বনহুর আলো জ্বালতেই দেখতে পেলো–নূরী মনিকে বুকের কাছে নিয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
বনহুর কিছুক্ষণ নূরীর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে চাদরখানা মনি আর নূরীর গায়ে টেনে। দিয়ে বেরিয়ে গেলো লঘু পদক্ষেপে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ওদিকের জানালা হতে সরে গেলো একটি মুখ।
বনহুর ফিরে এলো নিজের কক্ষে।
বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই নজরে পড়লো দরজার পাশে একটা ছোরা গাঁথা, ছোরায় একখানা কাগজ ভাঁজ করা আছে মনে হচ্ছে।
বনহুর অবাক হলো, শয্যা ত্যাগ করে উঠে এলো দরজার পাশে। সত্যিই একখানা ছোরা গাঁথা রয়েছে দরজার চৌকাঠে।
বনহুর ছোরাখানা তুলে নিলো হাতে-অপরিচিত ছোরা। এ ছোরা তার আস্তানায় তৈরি হয়নি। কারণ, বনহুরের আস্তানায় তৈরি ছোরার বাটে একটি সংকেত চিহ্ন আঁকা থাকে। আশ্চর্য হলো বনহুর, তার আস্তানায় অজ্ঞাত ছোরা–দস্যুর উপর দস্যুতা।
বনহুর ছোরা থেকে কাগজখানা খুলে নিয়ে মেলে ধরলো তার কক্ষস্থ মশালের আলোর সামনে। কাগজে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে হেসে উঠলো হাঃ হাঃ করে। হাসি থামিয়ে ছোরাখানা ছুঁড়ে ফেলে দিলো খাটের নিচে, আর কাগজের টুকরা খানা ভাঁজ করে রেখে দিলো জামার পকেটে।
*
পরদিন।
বন্দিনী নাসরিনের বিচার দিন।
দরবার কক্ষে বনহুরের সমস্ত অনুচর সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সকলেরই হস্তে রাইফেল বর্শা-বল্লম।
বনহুরের আসনের পাশে উপবিষ্টা বৃদ্ধা দাইমা আর নূরী।
মনি ঠিক নূরীর কোলের কাছে দাঁড়িয়ে।
