মনিরাকে নিয়ে বনহুর যখন চৌধুরী বাড়ি পৌঁছলো তখন সন্ধ্যা হয় হয়।
মরিয়ম বেগম পুত্র এবং মনিরাকে পেয়ে খুশিতে মেতে উঠলেন। আবার একটা আনন্দের উৎস বয়ে চললো মরিয়ম বেগমের মনে।
মনিরা আর মায়ের কাছে নিবিড় হয়ে বসলো বনহুর আজ। পাশে মা, অদূরে অন্ধ মনিরা।
বললো বনহুর–আমি এক সপ্তাহ পর আবার আসবো মা, আজকের জন্য বিদায় দাও।
মনির, এখনও কি তুই দস্যুতা ত্যাগ করতে পারলিনা? কিসের অভাব তোর–ধন-মাল ঐশ্বর্য সব তোর রয়েছে। বাবা, কি জন্য তুই এখনও দস্যুতা করছিস বল আমাকে।
মা, তুমি কি মনে করো আমি ধন-মাল আর ঐশ্বর্যের লোভে দস্যুতা করি?
তবে কিসের জন্য বল মনির?
এ কথা তোমাকে অনেক বার বলেছি মা। তোমার পুত্র কোনদিনই কুমতলব নিয়ে দস্যুতা করেনা। পরের মঙ্গল চিন্তাই তার একমাত্র পাথেয়। মা গো, তুমি আমাকে কোন সময় ভুল বুঝনা।
বাবা, চিরদিন কি এমনি করে কাটবে ব? আমার দিকে না তাকিয়ে কিন্তু মনিরা…ওর জন্যও তো তেকে ভাবতে হয়। তার জন্য একটি জীবন এমনি করে নষ্ট হয়ে যাবে মনির।
বনহুর ধীরে ধীরে ভাবাপন্ন হয়ে যায়। মায়ের শেষ কথাটার প্রতিধ্বনি হয় কানে…তোর জন্য একটি জীবন নষ্ট হয়ে যাবে মনির…তোর জন্য একটি জীবন নষ্ট হয়ে যাবে মনির…
বনহুর দুই হাতে মাথার দুই পাশে টিপে ধরে। মায়ের কথাটা সম্পূর্ণ সত্য। মায়ের কণ্ঠের সঙ্গে আরও শত শত কণ্ঠ যেন প্রতিধ্বনি করে উঠে…একটি নয়, এমন অনেক জীবন তুমি নষ্ট করে দিয়েছো বনহুর…একটি নয়, অনেক জীবন নষ্ট করে দিয়েছো বনহুর…ব্যর্থ করে দিয়েছে। যে নারী তোমাকে দেখেছে সেই তোমাকে ভালবেসেছে…চোখের জল ফেলেছে, মন প্রাণ সঁপে দিতে চেয়েছে তোমাকে…কিন্তু তুমি কাউকেই ধরা দাওনি…তোমার নীরব কঠিন হৃদয়ের সাড়া কেউ পায়নি…পাষাণ মূর্তির মতই তুমি অচল অটল রয়েছো…কোন নারীর অশ্রুই তোমাকে বিচলিত–পথ ভ্রষ্ট করতে পারেনি…চিরদিন তারা অশ্রু বিসর্জন করেছে তোমার জন্য…না না, একটি নয়, বহু নারীর জীবন তুমি নষ্ট করে দিয়েছো বনহুর…শুভাষিণী, হীরাবাঈ আতিয়া, সিন্ধিরাণী, এমনি আরও কত যুবতীর জীবনই না তুমি ব্যর্থ করে দিয়েছে, ব্যর্থ করে দিচ্ছো নূরীর জীবন বনহুর তুমি অপরাধী–তুমি দোষী…তোমার জন্য জোবাইদা হারালো তার ফুলের মত একটি সুন্দর জীবন…জোবাইদার মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী বনহুর…
বনহুর অধর দংশন করে, কিছুতেই নিজকে সে সংযত রাখতে পারেনা অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠে–মা, আমি দোষী…আমিই দোষী-অপরাধী..মা, আমাকে কেউ ক্ষমা করবেনা কেউ ক্ষমা করবেনা।
মনিরা দেখতে না পেলেও স্বামীর মনের ব্যাকুলতা বুঝতে পারলো, চঞ্চল হয়ে পড়লো সে। বললো মনিরা–মামীমা, কে বললো আমার জীবন ও নষ্ট করে দিচ্ছে? কেননা তুমি ওকে এ কথা বলে কষ্ট দিচ্ছো? আমার মত সৌভাগ্যবতী আর কে আছে বলো?
বনহুর বললো আবার–মনিরা, মিছামিছি নিজকে সৌভাগ্যবতী বলে আমাকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করো না। মায়ের কথা অত্যন্ত সত্য আমি তোমার জীবন ব্যর্থ করে দিচ্ছি।
মরিয়ম বেগম বললেন এবার হাঁ, যতদিন তুই আমার মনে আঘাত দিবি ততদিন আমি তোকে ক্ষমা করবো না।
মা! অস্কুট ধ্বনি করে উঠলো বনহুর।
মরিয়ম বেগম কঠিন কণ্ঠে বললেন–মনিরার সুখে আমার সুখ, মনিরার শান্তিতে আমার শান্তি, যতদিন মনিরা মা আমার চোখের পানি ফেলবে, ততদিন আমি।
মনিরা উঠে পড়তে গিয়ে এগিয়ে এলো, চেপে ধরলো মামীমার মুখ–ওকে তুমি অভিশাপ দিওনা মামীমা, ওকে তুমি অভিশাপ দিওনা।
এমন সময় সরকার সাহেব দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকলেন বেগম সাহেবা!
মরিয়ম বেগম উঠে দাঁড়ালেন–আসছি।
বেরিয়ে গেলেন মরিয়ম বেগম।
বনহুর ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন জানালা দিয়ে বেরিয়ে গেলো।
মনিরা বুঝতে পারলো, মরিয়ম বেগম সরকার সাহেবের ডাকে বেরিয়ে গেছেন। স্বামী বসে আছে তার অনতিদূরে তাই মনে করে মনিরা বললো–তুমি মামীমার কথায় রাগ করলে? লক্ষীটি রাগ করোনা, মামীমা যাই বলুন আমার-তোমার মঙ্গলের জন্যই বলেন, বুঝলে? ওকি কথা বলছো না কেনো? আমার উপর বুঝি রাগ করছো? ছিঃ ছেলেমানুষী করতে নেই। এসো, আমার কাছে এসো।
মনিরা স্বামীর অন্বেষণে দুই হাত প্রসারিত করে এগিয়ে আসে।
সরকার সাহেবের সঙ্গে কথা শেষ করে ফিরে আসেন মরিয়ম বেগম। হাতে তার খাবারের প্লেট।
দরজার পাশে এসে থমকে দাঁড়ান, তার কানে ভেসে আসে মনিরার হাসির শব্দ–দুষ্ট, আমি তোমাকে দেখতে পাইনা বলে খুব ভোগানো হচ্ছে। দাঁড়াও মামীমাকে ডাকছি– মামীমা…মামীমা…
এই যে মা আমি আসছি। মরিয়ম বেগম হাসতে হাসতে কক্ষে প্রবেশ করলেন।
কক্ষে প্রবেশ করেই থমকে দাঁড়ালেন–কোথায় মনির। শুন্য কক্ষ খাঁ খাঁ করছে। চারিদিকে ব্যাকুল আঁখি মেলে দেখতে লাগলেন।
মনিরার মুখে তখনও আনন্দের হাসি লেগে রয়েছে, মামীমার আগমনে একটু লজ্জাও বোধ করছে সে, তর বললো–মামীমা দেখো না আমি দেখতে পাইনা বলে আমার সঙ্গে কথাও বলেনা।
গম্ভীর কণ্ঠে বললেন মরিয়ম বেগমকে কথা বলবে তোর সঙ্গে? কে কথা বলবে মা?
ও…
হায়রে হতভাগী, কার সঙ্গে তুই এতোক্ষণ কথা বলছিলি! সেকি আছে? কখন চলে গেছে কে জানে…
চলে গেছে! ও চলে গেছে মামীমা?
হাঁ, মরিয়ম বেগম পুত্রের জন্য খাবার এনেছিলেন হাতে করে, ধীরে ধীরে টেবিলে খাবারের প্লেট নামিয়ে রেখে বসে পড়লেন, খাটের পাশে।
