নাসির শাহ যেন তাড়াতাড়ি সরে পড়তে পারলে বেঁচে যায়, এমনি ভাবেই সরে পড়েছিলো।
বনহুর জুলেখার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বললেও তার মনের মধ্যে তখন নাসির শাহই উঁকিঝুঁকি মারছিলো। বনহুর বেশিক্ষণ জুলেখার সঙ্গে মনিরার কক্ষে ছিলো না, বেরিয়ে এসে আড়াল থেকে লক্ষ্য করছিলো নাসির শাহকে।
রাজ টেবিল থেকে ছোরাখানা হাতে তুলে নিতেই বনহুর বুটের এক লাথি দিয়ে তার হাত থেকে ছোরাখানা ছিটকে ফেলে দিলো দূরে। গম্ভীর কণ্ঠে বললো সেনাসির শাহ, যে মতলব নিয়ে বুদ্ধির প্যাঁচ খেলছো–তা থেকে ক্ষান্ত থাকবে নচেৎ তোমার মৃত্যু অনিবার্য।
কথা শেষ করার পূর্বেই বনহুর রিভলভার চেপে ধরেছিলো নাসির শাহের বুকে, এবার নাসির শাহর পকেট থেকে দশ হাজার টাকার নোটের একটা ফাইল বাম হস্তে তুলে নিলো। ইতিমধ্যে বনহুর তার বামহস্তের রিভলভারখানা প্যান্টের পকেটে রেখেছিলো।
এক ঘর লোক থ’ মেরে দাঁড়িয়ে রইলো, কেউ একটু টু-শব্দ করতে পারলো না।
বনহুর যেমন এসেছিলো তেমনি বেরিয়ে গেলো।
কিছুক্ষণ করো মুখে কারো কথা নেই, সবাই যেন একটা মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলো।
পরক্ষণেই হুস হলো রাজের, দাঁতে দাঁত পিষে বললো–ফোন, ফোন করো নাসির…পুলিশ অফিসে ফোন করো–দস্যু বনহুর এসেছিলো এখানে।
নাসির শাহর মুখ মরার মুখের মত ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। শুধু মৃত্যু ভয়ই দস্যু বনহুর তাকে দেখিয়ে গেলো না, নিয়ে গেছে তার দশ হাজার টাকা।
রাজের কথায় হুশ হলো নাসির শাহর, হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠলো নাসির শাহরাজ, পুলিশ অফিসে ফোন করে আর কি হবে। দস্যু বনহুর কি আর দশ হাজার টাকা ফেরৎ দেবে?
তবু পুলিশকে ব্যাপারটা জানানো ভালো।
যা খুশি তোমরা করো, যেখানে খুশি ফোন করো…মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো নাসির শাহ একটা চেয়ারে।
কক্ষমধ্যে একটা ভয়াবহ থমথমে ভাব বিরাজ করতে লাগলো। যে দস্যু বনহুরের নামে সমস্ত দেশবাসী সদা আতঙ্কগ্রস্ত রয়েছে, যে দস্যুর ভয়ে লোকজন সচ্ছভাবে পথ চলতে পারে না, সেই দস্যু বনহুরের আবির্ভাব ঘটেছিলো এই গোপন আড্ডায়–কম কথা নয়।
নাসির শাহ আর বিলম্ব না করে বাড়ির পথে রওয়ানা দিলো। রাজ ও অন্যান্য সবাই শত চেষ্ট করেও রুখতে পারলো না তাকে।
উদ্ভ্রান্তের মত গাড়ি নিয়ে চললো নাসির শাহ। শুধু দশ হাজার টাকাই তার খোয়া যায় নি, মনিরার উপর হস্তক্ষেপ করা তার চলবে না, তা হলে মৃত্যু অনিবার্য।
বাড়ি ফিরে হন্তদন্ত হয়ে জুলেখার লেবরেটরী কক্ষে প্রবেশ করে ডাকলো-জুলেখা।
জুলেখা তখন মনিরার কক্ষে মনিরার চোখে ঔষধ লাগিয়ে পট্টি বেঁধে দিচ্ছিলো। পাশে বসে বসে বনহুর তাকে সহায়তা করছে।
এই কক্ষে এবার প্রবেশ করলো নাসির শাহ, বিক্ষিপ্তভাবে চুলগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ে আছে কপালে। চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে একরাশ ভয় আর আতঙ্ক। কম্পিত কণ্ঠে ডাকলো নাসির শাহজুলেখা।
বড় ভাইয়ের কণ্ঠস্বরে ফিরে তাকালো জুলেখা এবং বনহুর।
মনিরার চোখে পট্টি বাঁধা তখন হয়ে গিয়েছিলো।
নাসির শাহর বিবর্ণ ফ্যাকাশে মুখোভাব লক্ষ্য করে জুলেখা বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বলে উঠে ভাইয়া, কি হয়েছে তোমার?
নাসির শাহ ঢোক গিলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠে–জুলেখা, সর্বনাশ হয়ে গেছে–ধপ করে একটা সোফায় বসে পড়ে নাসির শাহ।
বনহুর এবার বলে উঠে–সর্বনাশ? কি হয়েছে নাসির সাহেব?
জুলেখা ভয়-বিহ্বল কণ্ঠে বলে উঠলো–ভাইয়া কি হয়েছে বলো?
নাসির শাহ বললো এবার–দস্যু বনহুর আমার…
জুলেখা শুষ্ক ভয়-কম্পিত কণ্ঠে বললো–দস্যু বনহুর!
বনহুরও চোখে-মুখে ভীত ভাব টেনে এনে বললো–দস্যু বনহুর আপনার…
হাঁ, আমার উপর হামলা চালিয়ে দশ হাজার টাকা সে নিয়ে গেছে।
বিস্ময়ে বনহুরের মুখমন্ডল হা হয়ে উঠে, বলে–দশ হাজার টাকা।
জুলেখা বলে–তবু ভালো টাকা নিয়েই সে ক্ষান্ত হয়েছে ভাইয়া। ভাগ্যিস তোমাকে হত্যা করেনি…
হত্যা করেনি কিন্তু হত্যার হুমকি দেখাতে সে কসুর করেনি। জুলেখা, কোন্ মুহূর্তে দস্যু বনহুর আমাকে হত্যা করে বসে তার ঠিক নেই।
জুলেখা বললো–দস্যু বনহুরের অসাধ্য কিছু নেই ভাইয়া। সমস্ত কান্দাই শহর যার নামে আতঙ্কগ্রস্ত। পুলিশ বাহিনীকে যে দস্যু নাকানি-চুবানী খাইয়ে ছাড়ছে, তার কথা সত্যি ভয়ানক।
দস্যু বনহুর মনে মনে হাসলো।
মনিরা চোখে না দেখলেও ওদের সব কথা সে শুনতে পাচ্ছো। বুঝতে পারলো সব কিছু।
ভাই-বোনের ভীতিপূর্ণ আলোচনায় যোগ দিলো বনহুর।
একটু পূর্বে সে নাসির শাহর পকেট থেকে দশ হাজার টাকার নোটের ফাইল আত্নসাৎ করে নিয়েছে, এখনও তার পকেটে সেই টাকা বিরাজমান।
বনহুর বললো নাসির শাহ, আপনি সাবধানে থাকবেন। দস্যু বনহুর নাকি অপরাধীকে কিছুতেই ক্ষমা করে না।
নাসির শাহ আবার ঢোক গিললো, কোন কথা বের হলো না তার কণ্ঠ দিয়ে।
বনহুর এবার মনিরা সহ ফিরে এল চৌধুরী বাড়িতে। জুলেখা মনিরার চোখে একটা ঔষধ লাগিয়ে পট্টি করে দিয়েছে। এক সপ্তাহ পর আবার মনিরাকে আসতে হবে জুলেখার বাড়িতে। সেদিন মনিরার চোখের বাঁধন মুক্ত করে দেওয়া হবে। মনিরার দৃষ্টিশক্তির ভাগ্য নির্ভর করছে সেই দিনটির উপর।
ফিরে এলো মনিরা নিজ বাড়িতে, সঙ্গে দস্যু বনহুর।
বনহুর নিজে মটর ড্রাইভ করছিলো।
পথের ধারে পুলিশগণ পাহারায় রত হয়েছে। বনহুর নির্বিঘ্নে তাদের সম্মুখ দিয়ে গাড়ি নিয়ে এগিয়ে এলো।
