নাসির শাহ জানে–মনিরা দৃষ্টিহীন, কজেই মনিরাকে এখন হাতের মুঠায় পেয়েছে। নাসির শাহ মনিরার দিকে অগ্রসর হলো।
এমন সময় বনহুর আর জুলেখা প্রবেশ করলো সেই কক্ষে।
পদ শব্দে ফিরে তাকালো নাসির শাহ!
জুলেখা আর একটি লোককে তার সঙ্গে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো মাঝপথে, একটু হেসে বললো নাসির শাহজুলেখা, তোমাকেই খুঁজছিলাম। তা ইনি কে?
বনহুরকে দেখিয়ে বললো নাসির শাহ।
নাসির শাহকে মনিরার কক্ষে দেখেই জুলেখার মুখ গম্ভীর কঠিন হয়ে উঠেছিলো, বললো, সে-ইনি আমার বান্ধবী মনিরার স্বামী মিঃ মঞ্জুর সাহেব।
ক্ষণিকের জন্য নাসির শাহর মুখভাব গম্ভীর হয়ে পড়লো! তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো সে বনহুরের মুখের দিকে।
জুলেখা বললো-মঞ্জুর সাহেব, এ আমার বড় ভাই নাসির শাহ।
বনহুর নাসির শাহর দিকে দক্ষিণ হাতখানা এগিয়ে দিলো। হ্যান্ডসেক করার জন্য।
নাসির শাহ অনিচ্ছা সত্বেও হাতখানা বাড়ালো বনহুরের দিকে।
জুলেখা বললো–ভাইয়া, কি দরকার তোমার আমাকে?
এখন নয়, পরে বলবো। নাসির শাহ বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
তখনকার মত নাসির শাহ বেরিয়ে গেলেও মনিরার নেশা তাকে উম্মত্ত করে তুললো।
সোজা নাসির শাহ হাজির হলো গিয়ে তার গোপন আড্ডায়।
কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর ছিলো নাসির শাহের, যাদের দ্বারা সে তার মন্দ কাজগুলি সমাধা করতো।
নাসির শাহকে দেখেই তারা এগিয়ে এলো।
গোল টেবিলে গোলাকার হয়ে বসলো সবাই।
বয় মদের বোতল আর গেলাস এনে রেখে গেলো টেবিলে।
প্রতিদিন এ টেবিলে বসে নানা রকম কু’পরামর্শের অন্ত নেই তাদের। কোথায় কার সর্বনাশ করবে, সদা এই নিয়েই চলতো আলাপ আর আলোচনা। আজকের আলোচনার বিষয় হলো অন্ধ মনিরা।
নাসির শাহ তার প্রধান সহকারী রাজকে বললো–পেয়েছি, আর আমার হাতের মুঠো থেকে ফসকে যাবে না। কিন্তু ভেবেছিলাম মনিরাকে বিয়ে করবো…
রাজ দাঁত মুখ ভেংচে বললো–আরে ছোঃ একটা অন্ধ মেয়েকে তুমি বিয়ে করবে নাসির?
তা হচ্ছে কই বন্ধু, মনিরা শুধু অন্ধই নয়–বিবাহিতা।
অবাক কণ্ঠে বললো রাজ–চৌধুরী মেয়ে মনিরা বিবাহিতা। অবাক করলে বন্ধু?
কেনো, এতে এমন অবাক হবার কি আছে রাজ?
আরে তুমি শুধু অর্থ আর নারীই বোঝ, আর আমরা সবদিকে তাল দিয়ে চলি। দুনিয়ার কোথায় কি ঘটছে সব আমাদের নখদর্পণে।
তাতো বুঝলাম, কিন্তু মনিরার বিয়ে হয়নি, তবে জুলেখা মিথ্যা কথা বলেছে। ঠিক, আমাকে সে ধোকা দিয়ে একটা ভেঁড়া বুঝ বুঝিয়েছে…
যেমন তুমি ভাই, তেমনি তোমার বোন। শোন নাসির, চৌধুরী মেয়ে মনিরাকে ভালবাসে দস্যু বনহুর…শুধু ভালবাসা-বাসি নয়, একেবারে গভীর প্রেম যাকে বলে। কাজেই এমন মেয়ের বিয়ে…নাঃ আমার কেমন সন্দেহ লাগছে।
দস্যু বনহুর মনিরাকে ভালবাসে এ কথা আমিও জানি। তাই বলে শহরে মনিরার সঙ্গে মাখামাখি করবে এমন সাহস তার হবেনা।
দস্যু বনহুরকে তুমি চেনোনা বাছাধন, দেখলে তো কেমন করে শত শত পুলিশ বাহিনীর চোখে দুলো দিয়ে হাওয়ায় উড়ে গেলো। যার জন্য তুমি বেচারাও নাজেহাল পেরেশান কম হলেনা। পুলিশের হাওলা হয়ে হাঙ্গেরী কারাগারটাও দেখে এলে।
এটা আমার কপাল জোর বন্ধ। কারণ কান্দাই-এ বহু লোকই আছে কিন্তু এমন সৌভাগ্য ক’জনার ভাগ্যে জোটে বলো, দস্যু বনহুর সেজে পুলিশকেও ঘাবড়ে তুলেছিলাম।
হেসে উঠে বলে রাজ–আর একটু হলে হয়েছিলো আর কি।
দস্যু বনহুর ভেবে তোমাকেই ত্রিফলায় বিদ্ধ করে…বাস্ বুঝেছেই।
নাসির শাহকে অতো বোকা পাওনি রাজ। ত্রিফলায় বিদ্ধ হবার পূর্বে আমিও গলায় ফাঁস লাগিয়ে পগার পার হতাম।
খাসা বুদ্ধি হে নাসির তোমার, খাসা বুদ্ধি। বনহুর বেটা এতো নাজেহাল পেরেশান হবার চেয়ে, বাপু তোমার বুদ্ধিটা বেছে নিলেই পারে।
হাঁ, তাহলেই লেঠা চুকে যায়, কি বলো…
ঠিক সেই মুহূর্তে সম্মুখস্থ টেবিলে একখানা ছোরা এসে খচ করে গেঁথে গেলো।
বিস্ময়ে চমকে উঠলো নাসির শাহ ও রাজ, সঙ্গে সঙ্গে কক্ষস্থ অন্যান্য সবাই উঠে দাঁড়ালো আতঙ্কগ্রস্তভাবে।
নাসির শাহ ছোরাখানা হাতে তুলে নিতেই দেখতে পেলো–এক খন্ড কাগজ ছোরায় গাঁথা রয়েছে।
নাসির শাহ ছোরা থেকে কাগজখানা খুলে নিয়ে চোখের সম্মুখে মেলে ধরেই অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠলো–দস্যু বনহুর।
গোল টেবিলের চার পাশে যারা এখনও বসেছিলো, সবাই এক সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে কম্পিত কণ্ঠে উচ্চারণ করলো–কি বললে, দস্যু বনহুর!
সকলের মুখের কথা মুখেই রইলো। জমকালো একটা মূর্তি তাদের পিছনে এসে দাঁড়ালো, দুই হস্তে রিভলভার।
নাসির শাহর হাত থেকে কাগজের টুকরাটা খসে পড়লো। কক্ষস্থ সকলেই মুখমন্ডল ভয়ে। বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে। কারো মুখে কোন কথা সরলো না।
নাসির শাহর অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটপূর্ণ হয়ে উঠলো। থর থর করে কাঁপছে, চোখে-মুখে অসহায়ের চাহনী। রাজ একটু সাহসী ধরণের লোক, এক নম্বরের গুন্ডা বলা চলে। রাজ চট করে ছোরাখানা টেবিল থেকে হাতে তুলে নিয়ে দাঁড়ালো।
ছায়ামূর্তি অন্য কেহ নয় স্বয়ং দস্যু বনহুর।
বৈকালে জুলেখার সঙ্গে বনহুর যখন মনিরার কক্ষে প্রবেশ করেছিলো, তখন মনিরার কক্ষে প্রথম নাসির শাহকে দেখেই বনহুর তার মনোভাব অনুমেয় করে নিয়েছিলো। সুচতুর বনহুরের কাছে নাসির শাহর কুৎসিৎ মনোবৃত্তি গোপন ছিলো না, যদিও সে নিজেকে সংযত করে নিতে যথাসাধ্য চেষ্ট করেছিলো।
