বনহুর তাকে লক্ষ্য করে বললো –ডক্টর কাঁহা, দেখ্যা তুম?
হাঁ দেখ্যা বাবুসাহাব, ডক্টর আপামনি বাগানকা তরফ গিয়া।
বনহুর এবার বাগানের দিকে অগ্রসর হলো। জুলেখাদের বাড়ির সম্মুখেই ছিলো বাগানটা। প্রায় এক বিঘা জমি নিয়ে মস্ত বাগান। নানা রকম ফুলের সমারোহ ছিলো এ বাগানে। জানা অজানা কত রকম গাছ-গাছড়ায় ভর্তি। বাগানের দক্ষিণ দিকে মস্ত বড় পুকুর ছিলো একটা। পুকুর পাড়ে অনেকগুলি পাইন গাছ গোলাকারভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই সান বাধানো ঘাট। পুকুরের পানিতে ভাসছে পদ্মপাতা, মাঝে মাঝে দু’চারটা পদ্মফুলও ফুটে রয়েছে। সখ করে জুলেখার আব্বা পুকুরে পদ্মগাছ লাগিয়েছিলেন। আগে অসংখ্য পদ্মফুল ফুটে থাকতো পুকুরের পানিতে। আজ যদিও সেরকম নেই, তবু দু’চারটা পদ্মফুল পুকুরের শোভা বর্ধন করে থাকে এখনও।
এই পুকুরঘাটেই বসেছিলো জুলেখা, মুখোভাব গম্ভীর বিষণ্ণ সব আশা-বাসনা যেন নিমিষে মুছে গেছে তার জীবন থেকে আজ পর্যন্ত তাকে বহু পুরুষের সাথে মিশতে হয়েছে, কিন্তু কাউ-ে কই সে ভালবাসতে পারেনি কোনদিন অন্তর দিয়ে। অনেকেই তার কাছে এসেছে, প্রেম নিবেদন। জানিয়েছে–সবাইকে কেমন যেন স্বার্থপর মনে হয়েছে। কাউকে জুলেখা তেমন করে বিশ্বাস করতে পারেনি।
জুলেখা শিক্ষিতা–আদর্শবতী বিদুষী যুবতী। চরিত্রাহীনা বা কু’মনোবৃত্তি মেয়ে সে নয়। যে কোন পুরুষকে সে ভালবাসতে পারবে না, বা পারেনি কোনদিন। কিন্তু তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। মঞ্জুর সাহেবের কাছে পরাজিত হয়েছে সে। নিজের অজ্ঞাতে ভালবেসে ফেলেছে কখন তাকে।
মঞ্জুর সাহেবকে দেখার পর জুলেখা নিজ অন্তরে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করছে। সব সময় নানা কাজে লিপ্ত থেকেও বিস্মৃত হতে পারেনি এক দন্ডের জন্যও তাকে। হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে সর্বক্ষণ কামনা করে এসেছে মঞ্জুর সাহেবকে। অনেক সময় জুলেখা নিজেই ভেবে পায়নি, তার মনের এই অহেতুক ভাবান্তরের কারণ কি? সে সম্পূর্ণভাবে জানে, মঞ্জুর সাহেব আর মনিরার মধ্যে কোন সংযোগ রয়েছে। না হলে মঞ্জুর সাহেব মনিরার জন্য এতো করতোনা, পড়ে থাকতো না তাদের এখানে। এতো জেনেও জুলেখা কেননা নিজের মনের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো মঞ্জুর সাহেবকে।
জুলেখার গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দুই ফোঁটা অশ্রু।
ঠিক সেই মুহূর্তে পিছনে এসে দাঁড়ায় বনহুর–মিস জুলেখা!
জুলেখা চট করে হাতের পিঠে চোখের পানি মুছে ফেলে, কোন জবাব দেয়না।
বনহুর পুনরায় ডাকে–মিস জুলেখা, আপনার সঙ্গে আমার কয়েকটা জরুরি কথা আছে।
জুলেখা এবার চোখ তুলে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে তারপর বললো–বলুন?
বনহুর জুলেখার নিকট হতে একটু দূরে এসে পড়লো। তারপর বললো–মিস জুলেখা, প্রথমেই আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। কারণ একটা ভুল হয়ে গেছে, যার জন্য আমি এবং মনিরা উভয়েই আপনার কাছে অপরাধী।
জুলেখা নতমুখে বসে রইলো আঁচল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো সে।
বনহুর বললো আবার–আপনি না জেনে হয়তো ভুল করে ছিলেন যার জন্য আমি দুঃখিত ও লজ্জিত। মনিরা আমার বিবাহিতা স্ত্রী….।
জুলেখা নিজের অজ্ঞাতে চমকে উঠলো, দু’চোখে রাশিকৃত বিস্ময় নিয়ে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে, তারপর অস্ফুট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো-মনিরা আপনার স্ত্রী!
হা, মিস জুলেখা। কিন্তু লোকসমাজ জানে না একথা, সবাই জানে–মনিরা আজও অবিবাহিতা!
তার মামীমা, তার বাড়ির সবাই?…
মামীমা আর সরকার সাহেব ছাড়া তাদের বাড়ির কেউ জানে না।
জুলেখা বিস্ময়াবিষ্টের মত বসে রইলো চুপ করে, তার কণ্ঠ দিয়ে কোন কথা বের হলো না।
বনহুর জুলেখার দিকে তাকিয়ে বললো আবার–মিস্ জুলেখা আমি দোষী। সত্য কথা না বলার জন্য চরম অপরাধী…একটু চুপ করে থেকে আবার বললো সে–আপনার অনুগ্রহ ছাড়া মনিরার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসবে না। মিস জুলেখা, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন…
মঞ্জুর সাহেব!
মিস জুলেখা..
আমি কথা দিলাম মনিরার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আনতে আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দেবো, তবুও চেষ্টা থেকে ক্ষান্ত হবো না।
মিস জুলেখা। বনহুরের কণ্ঠে ঝরে পড়ে রাশিকৃত কৃতজ্ঞতা।
বনহুর ও জুলেখার যখন বাগান বাড়িতে পুকুর ঘাটে কথা হচ্ছিলো, ঠিক সেই মুহূর্তে মনিরার কক্ষে প্রবেশ করে নাজির শাহ। জুলেখার খোঁজে সে এ কক্ষে প্রবেশ করেছে। মনিরাকে দেখতে পেয়েই থমকে দাঁড়ায় নাসির শাহ অবাক হয়ে যায় সে। মনিরাকে চিনতে ভুল হয় না।
এতোদিন ধরে মনিরা আর বনহুর জুলেখাদের বাড়ি রয়েছে কিন্তু নাসির শাহ তার সন্ধান জানে না। কারণ সে কোন দিন বাড়ির খোঁজখবর রাখতো না। বাড়ি ফিরতো গভীর রাতে আবার বেরিয়ে যেতো খুব ভোরে সারাদিন ইন্ডাষ্ট্রি দেখাশুনার নাম করে কাটিয়ে দিতো তার গোপন আড়া ক্লাব আর জুয়াখেলায়। মদ না খেলে একদিনও তার চলতো না। গভীর রাতে মদের নেশায়। টলতে টলতে বাড়ি ফিরতো। বাড়ি-ঘর-সংসার বলে তার কোন অনুভূতি ছিলো না। ক্লাব আর। গুন্ডাদের নিয়েই কাটাতো সে সারাটাক্ষণ।
আজ হঠাৎ জুলেখার সন্ধানে এসে দেখতে পেলো মনিরাকে। নাসির শাহর চোখ দুটো চক চক করে উঠলো লালসায়। বিস্মিত হলো না সে, কারণ বুঝতে পারলো, জুলেখা আইজ স্পেশালিস্ট তাই মনিরা এসেছে জুলেখার কাছে চক্ষুর চিকিৎসার জন্য।
