সমস্ত আস্তানা জুড়ে একটা ভয়ানক আতঙ্কের সৃষ্টি হলো। জোবাইদার আকস্মিক মৃত্যুতে একেই সবাই হকচকিয়ে গিয়েছিলো তারপর আবার প্রেত আত্মা–জোবাইদার প্রেত আত্মা।
*
বনহুর জুলেখার লেবরেটরীতে প্রবেশ করতেই জুলেখা আনন্দে আত্মহারা হয়ে সাদর সম্ভাষণ জানালো –হ্যালো মঞ্জুর সাহেব।
বনহুর হেসে তাকে অভ্যর্থনা জানালো–মিস্ জুলেখা, ভাল তো?
জুলেখার চোখে-মুখে আনন্দ উপচে পড়ছে যেন, বললো সে–ভাল আছি, আপনি?
খুব ভাল না।
জুলেখা কণ্ঠস্বরে সহানুভূতি টেনে বললো–কোন অসুখ-বিসুখ হয়নি তো?
না, শারীরিক নয়–মানসিক। মনিরা কেমন আছে?
জুলেখা গলার স্বর স্বাভাবিক করে নিয়ে বললো– মনিরা ভাল আছে। ওর চোখের অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভাল।
ধন্যবাদ মিস জুলেখা। আপনার অনুগ্রহে মনিরা আজ তার হারানো দৃষ্টি ফিরে পেতে চলেছে–আচ্ছা ওর সঙ্গে দেখা করে আসি কেমন? বনহুর জুলেখার জবাবের প্রতীক্ষা না করে বেরিয়ে গেল লেবরেটরী হতে।
জুলেখা চিত্রাপিতের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো একটু পূর্বে যে মুখে রাশিকৃত আনন্দ ঝরে পড়ছিলো, নিমিষে সব আনন্দ কোথায় যেন উবে গেলো কপুরের মত। মুখমন্ডল অন্ধকার বিষণ্ণ হয়ে উঠলো।
বনহুরের আগমনে জুলেখার মনে একটা অপূর্ব অনুভূতি দোলা জাগিয়েছিলো। খুশির আবেগে আত্মবিস্মৃতি ঘটেছিলো তার। ভুলে গিয়েছিলো মঞ্জুর সাহেব তার সীমার মধ্যে নয়।
সহকারী ডক্টর হামিদের কণ্ঠস্বরে সম্বিৎ ফিরে আসে জুলেখার। ডক্টর হামিদ তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বলেছেন–সিষ্টার রোগীকে বসিয়ে রেখে এসেছেন, সে এখন ফিরে যাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
সরি। চলুন–একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে ত্যাগ করে অগ্রসর হলো জুলেখা।
একটি রোগীকে বসিয়ে এসেছিলো জুলেখা তার লেবরেটরী কক্ষে, জরুরি কোন একটা কাজে। এসে তখনই ফিরে যাবে, এই উদ্দেশ্য নিয়েই এসেছিলো সে। মঞ্জুর সাহেব এসে পড়ায় তার বিলম্ব হয়ে গেছে।
জুলেখা রোগী দেখা শেষ করে ফিরে এলো তার লেবরেটরী কক্ষে। হঠাৎ মনে পড়লো মঞ্জুর সাহেবের কথা, তাছাড়া এখন মনিরার ইনজেকসানের সময় হয়েছে। জুলেখা সিরিঞ্জে ঔষধ ভরে নিয়ে মনিরার কক্ষে প্রবেশ করলো। সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো জুলেখা। তার হাত থেকে খসে পড়লো ঔষধ সহ সিরিঞ্জটা। ভূতলে খান খান হয়ে ভেঙে গেলো।
বনহুর মনিরাকে বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়ে ফিরে তাকালো।
জুলেখা পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার পাশে মেঝেতে। পায়ের কাছে টুকরো ভাংগা সিরিঞ্জের খন্ডগুলো ছড়িয়ে পড়ে আছে। এক রাশ কালি কে যেন মেখে দিয়েছে জুলেখার মুখে।
বনহুর হাস্যউজ্জ্বল মুখে এগিয়ে আসে কি হলো?
জুলেখা কোন কথা না বলে দ্রুত বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
বনহুর কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো জুলেখার চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে।
মনিরার দৃষ্টিশক্তি নেই, সে কিছুই বুঝতে না পেরে বসে থাকে নিশ্চুপ।
বনহুর মনিরার পাশে এসে কাঁধে হাত রাখলো।
মনিরা স্বামীর হাতের উপর হাত রেখে বলে উঠে–কি হলো? আমি কিছু বুঝতে পারছি না যে?
বনহুর মনিরার পাশে বসে পড়ে বললো–মনিরা একদিন আমাকে মিথ্যা সন্দেহ করেছিলে, এবং সে জন্য জীবন নাশ করতেও গিয়েছিলে হরিদ্রা সাগর বক্ষে।
আজ কেন আবার সে কথা তুলছো?
না বলে উপায় নেই মনিরা বলতেই হবে।
বলো?
তোমার বান্ধবী তোমার স্বামীকে ভালবেসে ফেলেছে মনিরা।
কি বললে। কি বললে তুমি?
অতো ধৈর্যহারা হলে আমি নাচার। যদি স্থির হয়ে শোন তবে আমি বলতে পারি।
বলো শুনবো আমি বলো? আর কোন কথা আমি বলবো না। মনিরা স্বামীর দক্ষিণ হাত চেপে ধরে মুঠায়।
বনহুর বলে চলে–তোমার বান্ধবী মঞ্জুর সাহেবকে ভালবেসে ফেলেছে এবং তাকে না পেলে তার জীবন ব্যর্থ হয়ে যাবার উপক্রম–
না না, আর আমি শুনতে চাইনা। নিয়ে চলো আমাকে। চাইনা আমি দৃষ্টিশক্তি ফিরে। চাইনা–চাইনা–চাইনা–
মনিরা এজন্যই আমি তোমাকে এতোদিন বলিনি কোন কথা। ধৈর্য ধরে সব শুনে যাও। তারপর যা ভাল মনে করো বলো।
কিন্তু এখানে আর এক মুহূর্ত আমি থাকতে চাইনা।
তোমার দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে চাও না?
না চাই না। আমি চিরদিন অন্ধ হয়ে থাকবো তবুও—
মনিরা এতো অধৈর্য তুমি। আমি কি তাকে ভালবেসেছি? আমি কি তাকে চাই? কেনো। কেনো তুমি বুঝোনা! মনিরা জীবনে বহু নারীর সান্নিধ্য লাভ আমার ঘটেছে কিন্তু কোন নারীর প্রেমা আমাকে পথচ্যুত করতে সক্ষম হয়নি। তুমি বিশ্বাস কর আমাকে, কোনদিন পথচ্যুত হইনি। মনিরা, জুলেখা জানোনা তুমি আমার স্ত্রী তাকে কথাটা না বলে ভুল হয়েছে। বললো হয়তো এতোটা হতে পারতোনা। একটু নিশ্চুপ থাকার পর বললো বনহুর–মনিরা সব খুলে বলবো আজ তোমার বান্ধবীর কাছে।
না না, তার চেয়ে চলো আমরা চলে যাই এখান থেকে। কাজ নেই আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরে এনে–
বনহুর রাগতভাবে বললো–তুমি চুপ করে থাকো মনিরা যা করতে হয় বা বলতে হয় আমি জানি। আমি জুলেখার ভুল ভেঙে দিতে চাই।
বনহুর আর বিলম্ব না করে বেরিয়ে গেলো কক্ষ হতে। প্রথমে চ্যাম্বারে প্রবেশ করে দেখলো জুলেখা সেখানে নেই। লেবরেটরীতেও নেই। বিস্মিত হলো বনহুর–গেলো কোথায় সে তবে। বনহুর যখন জুলেখার অন্বেষণে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলো ঠিক সেই সময় তার পাশ কেটে চলে যাচ্ছিলো একটা দারওয়ান।
