কিছু না থাকলেও জোবাইদার এমন কোন কাজ করতে যাচ্ছিলো যার জন্য বনহুরের যে কোন অনুচর তাকে হত্যা করতে পারে।
নূরী তুমি তাহলে জোবাইদা হত্যারহস্য অবগত আছো?
রহমান, আমাকে তুমি অবিশ্বাস করছো?
হাসলো রহমান তোমাকে অবিশ্বাস করবার মত সাহস আমার আছে নাকি? কিন্তু নূরী মনে রেখো জোবাইদাকে যেই হত্যা করে থাকুক না কেননা সর্দার জানেন।
নূরী আর কোন কথা বলে না চলে যায় সে নিজের কক্ষের দিকে।
রহমানের ভ্রূকুঞ্চিত হলো।
রাত বেড়ে আসছে দেখে রহমান চলে গেলো তার দলবলকে সজাগ করে দিতে–একটি প্রাণীও যেন আস্তানার বাইরে যেতে না পারে। নিজেও সে রাইফেল হস্তে ঘুরে ঘুরে সব দিকে লক্ষ্য করতে লাগলো।
সমস্ত আস্তানা ঝিমিয়ে পড়েছে।
যে যার বিশ্রাম স্থানে বিশ্রাম নিচ্ছে।
কয়েকজন সশস্ত্র দস্যু কড়া পাহারায় নিযুক্ত রয়েছে তাদের ভারী বুটের আঘাতে পাথুরিয়া মাটিতে প্রতিধ্বনি জাগছে খট খট খট–
লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দস্যু বনহুর এ আস্তানা তৈরি করেছে। কঠিন পাথর কেটে কেটে তৈরি হয়েছে সুড়ঙ্গ পথ। তিরিশ জন বলিষ্ঠ দস্যু অবিরত পরিশ্রম করেছে প্রায় এক বৎসরকাল। কান্দাই পর্বতের নিচে এই আস্তানা, আস্তানায় প্রবেশের সুড়ঙ্গমুখ পর্বতেরই একটি গুহার মধ্যে।
কান্দাই জঙ্গলের শেষ প্রান্তে এ পর্বত। পর্বতের পাদমূলে গহন জঙ্গল। বাইরের কোন লোক সমাজে এ জঙ্গলে ভুলেও প্রবেশ করতে সক্ষম হয়না। হিংস্র জীবজন্তুর ভয় তো রয়েছেই তাছাড়া এ জঙ্গলে দস্যু বনহুরের আস্তানা একথাও অনেকেরই জানা আছে। স্পষ্টভাবে না জানালেও লোক সমাজে আতঙ্কের সীমা নেই এ জঙ্গল সম্বন্ধে।
পুলিশ মহলেও জঙ্গল সম্বন্ধে নানারকম ধারণা আছে। একবার মিঃ জাফরী জঙ্গল মধ্যস্থ পোড়ো রাজবাড়ী আস্তানাতে হানা দিয়ে বনহুরের বহু সংখ্যক অনুচরকে হত্যা করেছিলো এবং কয়েকজনকে বন্দীও করেছিলো তারা। কিন্তু দস্যু বনহুর তার কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচররের সন্ধান। পুলিশ বাহিনী পায়নি।
এই সংঘর্ষে শুধু দস্যু বনহুরের অনুচরই নিহত হয়নি, অনেক পুলিশ ফোর্সও জীবন দিয়েছিলো।
এই সংঘর্ষের পর দস্যু বনহুর নতুনভাবে তৈরি করেছিলো তার এই পর্বত তলে ভূগর্ভের আস্তানাটি। শুধু লোক চক্ষুর অন্তরালেই নয়, কোন ভূতত্ত্ববিদও সমস্ত বছর ধরে অনুসন্ধান করে খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে না।
রহমান এই ভূগর্ভ আস্তানারই সতর্ক পাহারদার হিসাবে পাহারায় রত ছিলো।
আস্তানার বিভিন্ন স্থানের আলোগুলি এখন নিভিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।
কোন কোন জায়গায় দেয়ালের গোঁজা মশাল থেকে নিভু নিভু আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়ছিলো। সেই আলোকরশ্মি ভূগর্ভ আস্তানার গাঢ় অন্ধকারকে আরও বিভীষিকাময় করে তুলছিলো।
জোবাইদার মৃত্যুর পর সমস্ত অনুচরগণের মনে একটার গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিলো। দস্যু হলেও তারা তো মানুষ। মন-প্রাণ-হৃদয় সব আছে তাদের। জোবাইদার মৃত্যুতে আস্তানার অনেকেই দুঃখ পেয়েছিলো ভীষণভাবে। আবার অনেকের প্রাণে জেগেছিলো ভীতিভাব। না জানি জোবাইদার মৃত্যুর জন্য কার নসীবে কি আছে কে জানে।
রহমান রাইফেল হস্তে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছিলো নিস্তব্ধ আস্তানার মধ্যে।
হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তি তার সম্মুখ দিয়ে চলে গেলো। চমকে সরে দাঁড়ালো আড়ালে রহমান। পরক্ষণেই অনুসরণ করলো সে ছায়ামূর্তিটিকে। অতি অন্তর্পণে এগুতে লাগলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।
ছায়ামূর্তি এগুচ্ছে সম্মুখের দিকে।
রহমানের বুকের মধ্যে ধক ধক করছে যদিও সে একজন নির্ভীক দস্যু। তবুও আজ কেননা, যেন এমন একটা মনের মধ্যে দুর্বলতা বোধ করছে সে।
দস্যু বনহুরের আস্তানায় ছায়ামূর্তি।
কে এই ছায়ামূর্তি? রহমান রাইফেল ঠিক রেখে ছায়ামূর্তিটিকে অনুসরণ করলো।
ছায়ামূর্তি ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
রহমান ফলো করছে তাকে।
দেয়ালের আড়ালে থামের পাশে আত্মগোপন করে অগ্রসর হচ্ছে ছায়ামূর্তি।
হঠাৎ রহমান বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো। ছায়ামূর্তির পিছনে পিছনে সে অগ্রসর হচ্ছিলো। সম্মুখস্থ একটি দেয়ালের পাশে এসে ছায়ামূর্তি মুহূর্তে অদৃশ্য হলো।
সঙ্গে সঙ্গে রহমান তার রাইফেল থেকে গুলী ছুড়লো, পর পর কয়েকটা, কিন্তু কোন আর্তনাদই ফুটে উঠলো না সেখানে।
রহমানের গুলীর শব্দে অন্যান্য অনুচরগণ ছুটে এলো অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে। এক একজনের চোখ দিয়ে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে। এই মুহূর্তে তারা যেন শত্রুকে পেলে পিষে মারবে এমনি সকলের মনোভাব।
কায়েস বললো–কি হয়েছে রহমান?
রহমানের চোখের ধাঁধা তখনও কাটেনি, কায়েসের প্রশ্নের জবাবে বললো সে–আশ্চর্য, জোবাইদার আত্মা এসেছিলো এখানে।
আত্মা! এক সঙ্গে কায়েস ও আরও কয়েকজন উচ্চারণ করলো।
রহমান বললো–হাঁ, জোবাইদার আত্মাই হবে, ঠিক সেই রকম পোশাক পরা একটা ছায়ামূর্তি আমি দেখেছি।
কোথায়? বললো কায়েস।
ঐখানে দেয়ালে মিশে গেছে।
দেয়ালে মিশে গেছে। আশ্চর্য তো?
হাঁ, আশ্চর্যই বটে। রহমান ধীরে ধীরে কথাটা উচ্চারণ করলো।
ততক্ষণে দাইমা, নূরী, মনিও ঘুম থেকে জেগে এসে দাঁড়িয়েছে অন্যান্য অনুচরদের পাশে। রহমানের কথা শুনে সকলেই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ কম কথা নয়–জোবাইদার প্রেত আত্মা।
দস্যু বনহুরের আস্তানায় জোবাইদার প্রেত আত্মা।
