বনহুর এবার আসন ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো। সম্মুখের পাথরের টেবিলে জোবাইদাকে। যে চোরা দ্বারা নিহত করা হয়েছিলো, সেই ছোরাখানা একটি থালার উপরে রাখা হয়েছে। বনহুর তুলে নিলো ছোরাখানা হাতে তারপর আসন ত্যাগ করে নেমে এলো, অনুচরগণের সম্মুখে এক এক করে ছোরাখানা তুলে ধরলোকার এ ছোরা, জবাব দাও?
বনহুর ছোরাখানা যখন যার সম্মুখে ধরছিলো তখন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার মুখোভাব লক্ষ্য করছিলো। ছোরাখানা আসল অধিকারীর সন্ধানই বনহুরের উদ্দেশ্য।
আশ্চর্য হলো বনহুর যখন ছোরাখানা নাসরিনের সম্মুখে উঁচু করে ধরে গম্ভীর কণ্ঠে বললো–এ ছোরাখানা তোমার কি না?
নাসরিনের মুখভাবে একটা বিস্ময়ভাব জেগে উঠলো মুহূর্তের জন্য পরক্ষণেই নিজকে সামলে নিয়ে বললো নাসরিন সর্দার ছোরাখানা আমার নয়।
নাসরিনের কণ্ঠস্বর কেঁপে গেলো যেন।
বনহুরের ভ্রূকুঞ্চিত হয়ে উঠলো, গর্জন করে উঠলো বনহুর রহমান, নাসরিন ছোরাখানা চিনতে পেরেছে।
বনহুরের ইংগিতে রহমান ও আরও কয়েকজন অনুচর নাসরিনের চারি পাশে রাইফেল উদ্যত করে ধরলো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই নাসরিনকে মজবুত বরে বেঁধে ফেলা হলো।
বনহুর বললো– তুমি এই হত্যা ব্যাপারে অবগত আছো আমি বুঝতে পেরেছি নাসরিন। যদি নিজের মঙ্গল চাও তবে স্পষ্ট করে বলো–কার এ ছোরা, কে সে হত্যাকারী।
নাসরিন নত মস্তকে দাঁড়িয়ে রইলো কোন জবাব দিলো না।
বনহুর এবার রহমানকে আদেশ দিলো–নাসরিন যতক্ষণ না জোবাইদার হত্যাকারীর নাম বলেছে ততক্ষণ তাকে অন্ধকার কারাকক্ষে বন্দী করে রাখবে এবং রোজ তাকে শাস্তিদানপূর্বক আসল কথা উদঘাটনের চেষ্টা করবে।
তখনকার মত দরবার শেষ হলো।
অনুচরগণের মধ্যে এতোক্ষণ একটা ভীতিকর ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিলো সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। যদিও তারা এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত নয়, কারণ এখনও জোবাইদার হত্যাকারীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। নাসরিনকে বন্দী করা হলো সন্দেহজনকভাবে। নাসরিনের বলার উপর এখন নির্ভর করছে জোবাইদার হত্যাকারীর জীবন।
কে সে হত্যাকারী, কি-ই বা উদ্দেশ্য ছিলো তার জোবাইদাকে হত্যা করার পিছনে?
বনহুর দরবার কক্ষ ত্যাগ করলো। রহমানও তার সঙ্গে বেরিয়ে গেলো।
কয়েকজন অনুচর নাসরিনকে বন্ধন অবস্থায় নিয়ে চললো অন্ধ কারাগার অভিমুখে।
*
দু’দিন পর।
বনহুর তার নিজের কক্ষে শয্যায় বসা।
রহমান তার সম্মুখে দন্ডায়মান।
বনহুর বললো–রহমান আজ থেকে তিন দিন পূর্বে জোবাইদা নিহত হয়েছে।
হাঁ, সর্দার।
আজও জোবাইদার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করা সম্ভব হলো না। একটু নিশ্চুপ থেকে বললো আবার বনহুর–আমার আস্তানাতেই আছে জোবাইদার হত্যাকারী আমি বুঝতে পেরেছি।
সর্দার।
হাঁ, আমি ফিরে এসে বিচার করবো। রহমান তুমি সমস্ত আস্তানায় সতর্ক পাহারা নিযুক্ত রাখবে–আমার আস্তানা ছেড়ে একটি প্রাণীও যেন বাইরে না যায়।
রহমান নত মস্তকে বললো–আদেশ ঠিকভাবেই পালন হবে সর্দার।
বনহুর উঠে এবার পায়চারী করতে লাগলো। ললাটে ফুটে উঠলো গভীর চিন্তারেখা।
রহমান সর্দারের মুখোভাব লক্ষ্য করে চিন্তিত হলো।
বনহুর কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বললো–রহমান তাজকে প্রস্তুত করো আমি এক্ষুণি রওয়ানা দেবো। কথা শেষ করে শয্যায় এসে বসলো বনহুর।
রহমান কুর্নিশ জানিয়ে প্রস্থান করলো।
বনহুর তাজের পাশে এসে দাঁড়ালো।
রহমান কুর্নিশ জানালো সর্দারকে। অন্যান্য অনুচরগণ তারাও কুর্নিশ জানিয়ে তাজের দুই পাশে সরে দাঁড়ালো।
বনহুর লম্ফ দিয়ে তাজের পিঠে উঠে বসলো।
বহুদিন পর তাজ প্রভুকে নিজ পৃষ্ঠে পেয়ে আনন্দিত হলো, সম্মুখের পা দু’খানা উঁচু করে শব্দ করে উঠলো–চি চি–
তারপর ছুটতে শুরু করলো তাজ।
ভূগর্ভের সুড়ঙ্গ পথ প্রকম্পিত হয়ে উঠলো তাজের পদ শব্দে।
নিমিষে অশ্বপৃষ্ঠে রহমান নূরী, অদূরে দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পেলো সে।
রহমান এগিয়ে এলো নূরীর পাশে।
নূরী জিজ্ঞাসা করলো-বনহুর কোথায় চললো রহমান?
সর্দার কোনদিন বলে যায়না নূরী, তবে হাঁ যখন বলার মত হয় বলে যায় বটে। আচ্ছা নূরী, আমি লক্ষ্য করেছি, তুমি আজকাল সব সময় সর্দারকে এড়িয়ে চলো কেনো? কই আজ সে কোথায় গেলো বা যাচ্ছে–একটিবার কাছেও এলেনা জিজ্ঞাসাও করলেনা–ব্যাপার কি বলো তো?
নূরী একটু ম্লান হাসি হেসে বললো–বনহুরের পাশে যাওয়া আমার মানা তুমি বুঝি জানোনা?
ও তাই নাকি, কিন্তু এতোদিন তো কোন মানা ছিলোনা।
ছিলোনা কিন্তু–নূরী কিছু বলতে গিয়ে থেমে পড়লো।
রহমান আর নূরী এগুচ্ছে আস্তানার অভ্যন্তরে।
বললো রহমান–আস্তানার অনেকেই তোমার আর সর্দারের মিলামিশা ভাল নজরে দেখতোনা। এ নিয়ে অনেক কথাও উঠেছে আস্তানায় অনুচরদের মধ্যে। কিন্তু সর্দারের ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহসী হয়নি। একমাত্র জোবাইদাই প্রতিবাদ জানিয়েছিলো এ ব্যাপারে।
হাঁ জোবাইদাই প্রতিবাদ জানিয়েছিলো।
আচ্ছা নূরী?
বলো রহমান।
জোবাইদাকে আমাদের আস্তানায় কোন ব্যক্তি ছোরা নিক্ষেপ করে হত্যা করেছে তাই নয় কি?
জানিনা সে কথা।
জানোনা কিন্তু আস্তানার সকলকেই এ প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। সর্দার নাসরিনকে বন্দী করে রাখলেও আসল হত্যকারীর সন্ধান তিনি জানেন।
নূরী ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললো–তাহলে তুমি তাকে হত্যা করেছো রহমান?
আমার সঙ্গে জোবাইদার মনোমালিন্যের কারণ?
