শব্দটা সমস্ত আস্তানায় ছড়িয়ে পড়লো মুহূর্তে।
আস্তানার প্রবেশ পথে এবং সমস্ত স্থানে স্থানে রাইফেলধারী দস্যগণ সজাগ হয়ে দাঁড়ালো। একটি প্রাণী যেন আস্তানার বাইরে যেতে না পারে, এই সংকেত ধ্বনির একটা ইংগিৎ।
রহমান ও বিশিষ্ট কয়েকজন অনুচর ছুটলো বনহুরের কক্ষ অভিমুখে।
বনহুর তখন জোবাইদার পিঠ থেকে ছোরাখানা খুলে নিয়েছে। জোবাইদার মাথাটা তখন তার কোলে।
রহমান বনহুরের কক্ষে প্রবেশ করেই থমকে দাঁড়ালো। জোবাইদার রক্তমাখা ভুলুণ্ঠিত দেহের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়লো। ততক্ষণে কায়েসও অন্যান্য কয়েকজন অনুচর গুলীভরা রাইফেল হস্তে এসে দাঁড়িয়েছে। সকলেরই চোখে-মুখে বিস্ময় ফুটে উঠেছে।
সর্দারের কক্ষে জোবাইদাই বা এলো কি করতে এবং তাকে এভাবে ছোরাবিদ্ধ করলো কে সব যেন কেবল এলোমেলো লাগছে অনুচরদের কাছে।
রহমান ও অনুচরদের দিকে তাকিয়ে বনহুর ব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠলো –আস্তানা থেকে আমাদের একজনও যেন বাইরে না বের হতে পারে।
রহমান বললো–সর্দার, সংকেত ধ্বনি হবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পাহারাদারগণ আস্তানার সমস্ত গুপ্তপথের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে এবং তারা সাবধানে পাহারা দিচ্ছে। একটি প্রাণীও আস্তানার বাইরে যেতে সক্ষম হবেনা! কিন্তু জোবাইদাকে কে এ ভাবে ছোরাবিদ্ধ করলো সর্দার?
ঐ প্রশ্ন আমার মনেও রহমান–কিন্তু সব কথা পরে হবে, তুমি শীঘ্র ঔষধ আনার ব্যস্থা করো যাও রহমান–
বনহুরের কথা শেষ হয়না, জোবাইদা ক্ষীণ জড়িত কণ্ঠে বলে উঠে–ঔষধ আর আনতে হবেনা–সর্দার, আমি তোমাকে হত্যা–করতে এসেছিলাম–পারলামনা–আমাকে তোমার শত্রু জেনেও–তুমি আমাকে ক্ষমা–করলে–আঃ–আঃ- উঃ বড় কষ্ট হচ্ছে–আমার–
জোবাইদা। বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠস্বর বনহুরের। চোখে মুখে তার ফুটে উঠেছে একটা ব্যথা করুণ ভাব।
রহমান ঔষধ আনতে যায়নি এখনও যেতে পারেনি সে। জোবাইদার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনছিলো। কায়েস চলে গেছে ঔষধ আনতে অবশ্য রহমানের ইংগিতেই গেছে সে।
বনহুর জোবাইদার মাথার চুলে-কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। মাঝে মাঝে তার বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠ দিয়ে অস্কুট ধ্বনি বেরিয়ে আসছে–জোবাইদা–জোবাইদা–
জোবাইদা বেশ হাপিয়ে পড়েছিলো খুব কষ্ট হচ্ছে বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট ভাবে।
বলছে জোবাইদা–আমাকে যে হত্যা করলো তাকে আমি–দেখেছি কিন্তু আমি বলবোনা–আমি তাকে ক্ষমা করলাম সর্দার, সে যদি–ধরা পড়ে যায়–তাকে–তুমি–ক্ষমা–ক–রো–
জোবাইদার মাথাটা বনহুরের কোলের উপর কাৎ হয়ে ঢলে পড়লো।
বনহুরের কন্ঠ দিয়ে একটি শব্দ আর উচ্চারণ হলো না। চিত্রাপিতের মত বসে রইলো স্থির হয়ে কিছুক্ষণ। জোবাইদার কথা গুলিই পুনরাবৃত্তি হচ্ছিলো তার মনের মধ্যে–আমাকে যে হত্যা করলো তাকে আমি দেখেছি–কিন্তু আমি বলবোনা–আমি তাকে ক্ষমা করলাম—
বনহুর লক্ষ্য করেছে জোবাইদা যখন তার পায়ে লুটিয়ে পড়তে যাচ্ছিলো তখন জোবাইদা একবার তাকিয়ে দেখেছিলো ওদিকের জানালাটা। যে জানালায় একটু পূর্বে বনহুর একখানা হাতকে দ্রুত সরে যেতে দেখছিলো।
কায়েস ঔষধ হস্তে ফিরে এলো কক্ষ মধ্যে।
বনহুর বললো–ঔষধ আর লাগবেনা কায়েস। জোবাইদা চির বিশ্রাম নিয়েছে। জোবাইদার মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে রাখলো বনহুর।
সোজা হয়ে দাঁড়ালো বনহুর, গম্ভীর কঠিন তার মুখভাব বললো সে–রহমান এই মুহূর্তে জোবাইদার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করো। আমার অনুচরদের মধ্যেই কেউ তাকে ছোরা নিক্ষেপ করেছে। কে সে পাপিষ্ঠ তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। আমি শপথ করলাম তাকে আমি নিজ হস্তে শাস্তি দান করবো।
রহমানের চক্ষুদ্বয় অপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো, গলাটা পরিস্কার করে নিয়ে বললো–সর্দার আমিও শপথ করছি যে জোবাইদার জীবন নাশ করলো তাকে আমি খুঁজে বের করবোই। আমার নিজের পিতা হলেও আমি তাকে মাফ করবো না।
জোবাইদার লাশ কান্দাই বনে দাফন করবার জন্য আদেশ দিলো বনহুর।
সমস্ত আস্তানা ব্যাপী একটা মহা হইচই পড়ে গেলো। কে হত্যা করেছে জোবাইদাকে কে সে ভয়হীন পাপিষ্ঠ?
বনহুর আস্তানার প্রত্যেকটা অনুচরকে তার দরবার কক্ষে আহ্বান জানালো।
সুউচ্চ আসনে উপবিষ্ট দস্যু বনহুর।
সমস্ত শরীরে তার জমকালো ড্রেস, দস্যুর পোশাক। মুখমন্ডল কঠিন গাম্ভীর্যপূর্ণ, চোখ দিয়ে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছে।
আসনের সম্মুখে সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান প্রত্যেকটা অনুচরের মুখোভাবে ফুটে উঠেছে একটা ভয়ার্তভাব।
বনহুর গর্জন করে উঠলো–জোবাইদাকে তোমরা কে হত্যা করেছো?
সমস্ত অনুচরগণ একবার মুখ তুলে তাকালো তাদের সর্দারের দিকে। আবার মাথা নত করে দাঁড়ালো সবাই, কারো মুখে কোন শব্দ বের হলো না।
বনহুর বুটের আঘাত করলো ভূতলে–জবাব দাও কে জোবাইদার জীবন নাশ করেছো? জবাব দাও?
সবাই এক সঙ্গে কম্পিত কণ্ঠে বললো–সর্দার, আমরা কেউ জোবাইদার জীবন নাশ করিনি।
একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলো নূরী, বনহুর একবার সকলের অলক্ষ্যে তাকিয়ে দেখে নিলো নূরীর মুখোভাব। তার পাশে দাঁড়িয়ে নাসরিন আর বৃদ্ধা দাইমা, মনিও দাঁড়িয়ে আছে নূরীর পাশে।
আজকের দরবারে আস্তানার কেউ বাদ যায়নি, এমনকি বৃদ্ধা দাইমা এবং মনিও উপস্থিত ছিলো।
বনহুর প্রত্যেকের মুখভাব লক্ষ্য করে দেখছিলো।
কিন্তু কারো মুখোভাবে কোন রকম সন্দেহজনক লক্ষণ বনহুরের দৃষ্টিতে ধরা পড়লো না।
