হঠাৎ সর্দারের অন্তর্ধানে নূরী চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে ভীষণভাবে, বুঝতে পেরে জোবাইদা ভিতরে ভিতরে খুশিই হয়।
এমন দিনে ফিরে এলো সর্দার সুস্থ সবল দেহে।
নূরী সংবাদ পেয়ে ছুটে এলো বনহুরের পাশে; খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তার মুখমন্ডল।
বনহুর এগিয়ে আসতেই মনি এসে জাপটে ধরলো–বাপি।
বনহুর মনিকে তুলে নিলো কোলে, গালে মৃদু চাপ দিয়ে আদর করে বললো–কেমন আছ মনি?
মনি কিছু বলবার পূর্বেই হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি চলে গেলো দরজার দিকে–সূতীক্ষ্ণধার একখানা ছোরা হস্তে দাঁড়িয়ে আছে জোবাইদা, দরজার একপাশে আড়ালে।
বনহুর মনিকে কোল থেকে নামিয়ে দিলো, তারপর বললো–নূরী, যাও মনিকে খেলা দাও গে।
হঠাৎ বনহুরের গম্ভীর অন্যমনস্ক ভাব লক্ষ্য করে নূরী আর কোন কথা বলেনা মনিকে কোলে করে বেরিয়ে যায় সে।
মনি আর নূরী চলে যেতেই বনহুর দরজার আড়াল থেকে জোবাইদার হাত ধরে টেনে বের করে আনে–দক্ষিণ হস্তে তার তীক্ষ্ণ ধার ছুরি। মশালের আলোতে জোবাইদার হাতে ছোরাখানা ঝকমক করে উঠে।
বনহুর বুঝতে পারে–জোবাইদা তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যেই তার কক্ষের দরজার আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছিলো। নূরী বা মনিকে হত্যা তার মনোভাব হলে সে অনেকভাবে তাদের। হত্যা করতে পারতো আর এভাবে লুকিয়ে থাকার তার প্রয়োজন ছিলো না।
বনহুরের সম্মুখে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইলো জোবাইদা।
সত্যই সে আজ বনহুরকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এখানে এইভাবে আত্মগোপন করেছিলো। আজ অনেকদিন থেকে জোবাইদা নিজের মনের সঙ্গে দ্বন্দ করেছে। স্মরণ হয়েছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, অতীত হাতড়ে দেখতে পেয়েছে–বনহুরের উপেক্ষা ছাড়া কোনদিন এতোটুকু প্রীতি সে পায়নি। অনুগ্রহের কাঙ্গাল সে নয়, সে চায় বনহুরের হৃদয়ের এতোটুকু নিবিড় অনুভূতি। কিন্তু যা জোবাইদা চেয়েছে তা কোনদিনই পায়নি, পাবেও না জীবনে। সমস্ত অন্তর দিয়ে সে চেয়েছিলো বনহুরের একটুখানি ভালবাসা। নারী হৃদয় যেমনি কোমল তেমনি বিষময় হয়ে উঠে কখন, যখন সে তার কামনার বস্তু থেকে বিমুখ হয়। তখন সে হয়ে উঠে ভয়ঙ্করী। জোবাইদা তার সমস্ত আশা আকাঙ্খ থেকে হতাশ হয়েছে। বিষধর নাগিনীর মত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে সে। যা সে পাবেনা কোনদিন সে জিনিস অপরকেও দেবেনা ভোগ করতে, ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে পড়ে জোবাইদা এবং সেই কারণেই আজ সে বনহুরের কক্ষে প্রবেশ করে গোপনে লুকিয়েছিলো–বনহুরকে হত্যা করবে সে।
বনহুর জোবাইদার সম্মুখে দাঁড়িয়ে তার চোখে মুখে ক্রুদ্ধ ভাব নয় বা কোন রকম রাগান্বিত হয়নি বনহুর। স্বাভাবিক মুখভাব নিয়ে তাকিয়ে আছে জোবাইদার মুখের দিকে।
বনহুর বুদ্ধিহীন নয়–সে জোবাইদার মনোভাব অনেক দিন লক্ষ্য করেছে। ছোট বেলার সাথী হিসাবে বনহুর কোনদিন জোবাইদাকে অবহেলা করেনি। যতটুকু পেরেছে সমীহ করে চলেছে, স্নেহ মায়া মমতা দিতে কার্পণ্য করেনি কোনদিন, কিন্তু জোবাইদা এতে খুশি হয়নি। বনহুর নিভতে ভেবেছে কতদিন–শুধু জোবাইদার কথা নয়, এমনি আরও কত নারীর প্রেমাই তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। নিজকে সংযত রাখতে গিয়েও মাঝে মাঝে বিচলিত হয়ে পড়েছে, কিন্তু পদঙ্খলন ঘটেনি তার কোনদিন।
বনহুর জোবাইদার মনোভাব বুঝতে পেরেই রাগান্বিত বা ক্রোধান্বিত হতে পারলনা। এই মুহূর্তে যদি তার অনুচরগণের কেউ জানতে পারে, জোবাইদা সর্দারকে হত্যার উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে, তাহলে জোবাইদাকে প্রাণ নিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে হবে না। শুধু হত্যাই করবেনা, তাহার সমস্ত দেহে আগুন জ্বালিয়ে দেবে।
বনহুর বললো–জোবাইদা তুমি যে কারণে এখানে আত্মগোপন করেছিলে, আমি বুঝতে পেরেছি। বেশ, তুমি আমাকে হত্যা করে যদি সুখী হও তবে তাই হোক। আমাকে তুমি হত্যা করো। শোন আমাকে হত্যা করার পর নিশ্চয়ই তুমি নিজকে গোপন রাখতে পারবেনা, হয়তো ধরা পড়ে যেতে পারো। তখন রহমান বা আমার অনুচরগণ তোমাকে কিছুতেই ক্ষমা করবেনা। তাই আমি তোমাকে একটা গোপন পথের সন্ধান বলে দেবো, যে পথে তুমি আমাকে হত্যা করার পর অতি নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হবে। আমার আস্তানার দক্ষিণ পশ্চিম কোণে দেয়ালে একটি ছোট চাকার মত চাবি আছে। খুব ভাল করে লক্ষ্য করলে এই চক্রাকার চাবিটি তোমার দৃষ্টিতে ধরা পড়বে, তুমি সেই চাবিটি দক্ষিণ দিকে একটু চাপা দিলেই ছোট্ট একটা সুড়ঙ্গ পথ বেরিয়ে আসবে সেই পথে তুমি ফিরে যেতে পারবে পৃথিবীর বুকে। যেখানে খুশি চলে যেও আর কেউ তোমার সন্ধান পাবেনা। করো, হত্যা করো আমাকে–বনহুর বুক পেতে দেয় জোবাইদার। সম্মুখে।
জোবাইদা নত দৃষ্টি তুলে তাকায় বনহুরের মুখে।
সৌম্য-সুন্দর অপরূপ একখানা মুখমুদিত দুটি আঁখি। জোবাইদার মনের মধ্যে একটা আলোড়ন শুরু হলো,হস্তস্থিত ছোরাখানা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে লুটিয়ে পড়লো বনহুরের পায়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তে একখানা ছোরা এসে বিদ্ধ হলো জোবাইদার পিঠে। তীব্র আর্তনাদ করে মুখ ধুবড়ে পড়ে গেলো জোবাইদা বনহুরের পায়ের উপর।
বনহুর বিস্ময় ভরা চোখে তাকালো প্রথমে জোবাইদার লুষ্ঠিত দেহের দিকে পরক্ষণেই ওদিকের মুক্ত জানালার দিকে দৃষ্টি পড়লো। একখানা হাত দ্রুত সরে গেলো জানালার পাশ থেকে। বনহুর দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দেয়ালের একস্থানে চাপ দিলে সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত আস্তানায় একটা সংকেতসূচক শব্দ ধ্বনিত হতে লাগলো।
