মনিরা হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের মত এগিয়ে চলেছে। চোখে সে দেখতে না পেলেও কানে শুনতে পাচ্ছে সমুদ্রে জলোচ্ছাসের শব্দ। সেই শব্দ লক্ষ্য করে এগুচ্ছে মনিরা।
*
দারোয়ানের উচ্চকণ্ঠে ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের, দড় বড় দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে।
দারোয়ান ব্যস্তকণ্ঠে বললো-হুঁজুর, ছোট মেম সাহাব দরিয়া কিনার মে চলা গিয়া—
দরিয়া কিনারে! অস্কুট ধ্বনি করলো বনহুর। কোন ছোটা মেম সাহেব দারোয়ান?
আন্ধা মেম সাহাব–
দারোয়ানের কথা শেষ হয়না, বনহুর স্লিপিং গাউনে বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে ছুটলো সমুদ্রতীর অভিমুখে।
মনিরা তখন ঠিক সমুদ্রতীরে উঁচু একটা স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, আর এক মুহূর্ত, তাহলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সমুদ্র বুকে।
ঠিক সেই ক্ষণে বনহুর ধরে ফেললো মনিরাকে–মনিরা।
মনিরা পাথরের মূর্তির মত স্তব্ধ নির্বাক হয়ে গেলো।
বনহুর পুনঃ পুনঃ তার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে বললো–মনিরা। কেননা তুমি এ কাজ করতে যাচ্ছিলে? বলো–বলো মনিরা কেনো তুমি সমুদ্রে জীবন বিসর্জন দিতে যাচ্ছিলে? মনিরা– মনিরা—
মনিরা এবার উচ্ছাসিতভাবে কেঁদে উঠলো–ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও আমাকে, মরতে দাও
কি হয়েছে তোমার? কি হয়েছে মনিরা,বলো? বনহুর মনিরাকে নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে।
আমি অন্ধ আমি দৃষ্টিশক্তিহীন আমি পঙ্গুতোমার উপযুক্তা আমি নই। আমাকে তুমি ত্যাগ করো, ওগো আমাকে তুমি ত্যাগ করো।
এবার বনহুর কঠিন গর্জন করে উঠলো–মনিরা।
না না, আমাকে তুমি মরতে দাও?
কেন মরতে এতো সখ বলবে তো?
মরবার সখ আমার নেই কিন্তু বাধ্য হচ্ছি আমি নিজকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলতে?
কেনো?
জুলেখাকে তুমি বিয়ে করো–
বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললো বনহুর-জুলেখাকে বিয়ে করব! গম্ভীর হয়ে পড়লো বনহুর মনিরাকে মুক্ত করে দিয়ে বললো সেকেনো?
মনিরা না বলে পারলো না; বললো এবার মনিরা–জুলেখা আর তোমার মধ্যে–থেমে পড়লো তারপর বললো সে–আমি অন্ধ হলেও অজ্ঞান নই–সব জানি, সব বুঝতে পারি।
এ সব কি আবোল-তাবোল বলছো মনিরা?
কিছুক্ষণ পূর্বেই তুমি আর জুলেখা গোপনে বাংলো থেকে বেরিয়ে যাওনি?
বনহুর এবার সব বুঝতে পারে, কিছু আগে জুলেখা ও তার আগমন টের পেয়েই মনিরা এমনভাবে ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েছে।
মনিরার মনে সন্দেহ জেগেছে তার এবং জুলেখার উপর।
বনহুর হেসে উঠলো হো হো করে তারপর হাসি থামিয়ে বললো–এ জন্যই তুমি প্রাণ বিসর্জন দিতে যাচ্ছিলে? মনিরা তুমি বিশ্বাস রেখো তোমার স্বামীকে–
মনিরা বনহুরের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে।
বনহুর বলে–মনিরা, কোনদিন আমার উপর তুমি বিশ্বাস হারিও না।
ওগো আমাকে তুমি ক্ষমা করো। আমাকে তুমি ক্ষমা করো—
*
এই ঘটনার কয়েকদিন পর বনহুর মনিরা আর জুলেখা ফিরে এলো কান্দাই শহরে। এক সপ্তাহ তারা কাটিয়ে এসেছে হরিদ্রা সাগর সৈকতে।
হরিদ্রা নির্জন সাগর তীরে বাংলোয় মনিরা আর জুলেখার মধ্যে যে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিলো সেটা বনহুর সামলে নিয়েছিলো অত্যন্ত সাবধানে। কারণ এখন জুলেখাকে তাদের একান্ত প্রয়োজন। মনিরার চক্ষুর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনবার জন্য জুলেখা আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বনহুর মনিরার জন্য সব ত্যাগ করে পড়ে আছে এখানে। ওদিকে আস্তানায় তার দলবল না জানি কি করছে। নূরী হয়তো কেঁদে কেঁদে সারা হলো। কাউকেই বলে আসেনি বনহুর। ভিতরে ভিতরে সে আস্তানার জন্য অত্যন্ত চিন্তিত ছিলো কিন্তু সব চিন্তার চেয়ে তার মনে আঘাত হানছিলো মনিরার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ার চিন্তা। মনিরার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে না পারলে তার সব ব্যর্থ হয়ে যাবে।
কান্দাই ফিরেই বনহুর আস্তানায় ফিরে যাবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলো। জুলেখার নিকট বললো সে–আমি কয়েকদিনের জন্য দেশে যেতে চাই। আপনি মনিরার দিকে লক্ষ্য রাখবেন।
জুলেখার নিকটে কথাটা আনন্দদায়ক বলে মনে হলোনা।
মঞ্জুর সাহেবের মনিরার প্রতি অনুরাগ দেখে মনের মধ্যে একটা অহেতুক ঈর্ষা জাগছিলো। অন্ধ মনিরার জন্য তার এতো প্রাণের টান কেননা ভেবে পায়না জুলেখা।
বনহুরের কথায় জবাব দেয় সে–আপনি চলে গেলে সত্যি আমি মনে ব্যথা পাবো মঞ্জুর সাহেব।
জুলেখার কণ্ঠস্বরে আবেগ মাখানো ছিলো, বনহুর গম্ভীর হয়ে কি যেন চিন্তা করতে লাগলো। তারপর হেসে বললো–মিস্ জুলেখা আমিও আপনাদের সান্নিধ্য ছেড়ে বেশিদিন বিলম্ব করতে পারবোনা। বিশেষ করে আপনার মধুময় ব্যবহার আমার সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।
জুলেখা বনহুরের কথায় আত্মহারা হয়ে যায়। নিজকে যেন হারিয়ে ফেলে সে বনহুরের হাতের উপর হাত রেখে–সত্যি বলছেন?
সত্যি।
বনহুর এরপর আর বিলম্ব করেনি জুলেখার লেবরেটরী কক্ষে। মনিরার কাছে বিদায় নিয়ে বনহুর ফিরে এলো তার আস্তানায়।
*
রহমান এবং অন্যান্য সবাই দস্যু বনহুরের অনুচরগণ তাদের সর্দারের অকস্মাৎ অন্তর্ধানে ভয়ানকভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো। রহমান গোপনে শহরে অনুসন্ধান নিয়েও সর্দারের কোন সন্ধান পায়নি। চৌধুরী বাড়ি গিয়েও দেখা পায়নি সে মনিরার। সে তবে নকীরের মুখে শুনেছিলো মনিরার চক্ষু চিকিৎসার জন্য তাকে কান্দাই এর কোন এক চক্ষু চিকিৎসকের নিকটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে–এর বেশি রহমান জানতে পারেনি কিছু।
নূরীর মন অত্যন্ত খারাপ ছিলো, লোকে যে যাই বলুক বনহুরকে সমস্ত অন্তর দিয়ে সে ভালবাসে। বনহুরের জন্য সব সময় আনমনা থাকে সে। শত বাধা বিঘ্নও নূরীকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবেনা বনহুরের চিন্তা থেকে। যদিও মনিকে নিয়ে নূরী সকল সময় ব্যস্ত থাকতো তবু বিমর্ষ হয়ে কাটাতো সর্বক্ষণ।
