জুলেখা শান্ত কণ্ঠে বললো–বসুন না আর একটু।
এখানে এই নির্জন সাগর সৈকত আপনার পক্ষে নিরাপদ নয় মিস্ জুলেখা।
কোন ভয়ের সম্ভাবনা আছে নাকি মঞ্জুর সাহেব?
আছে বই কি? দস্যু বনহুরকে জানেন তো?
দস্যু বনহুর। গলাটা কেঁপে গেলো জুলেখার–কেনো বলুন তো? আর একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো সে বনহুরের পাশে।
দস্যু বনহুর হঠাৎ যদি এসে পড়ে এখানে? জানেন তো সে এখন মুক্ত রয়েছে।
দস্যু বনহুর এখানে আসবে?
তার অসাধ্য কিছু নেই।
সত্যি, দস্যু বনহুর দেশ ও দশের শত্রু।
কি করে বুঝলেন দস্যু বনহুর দেশ ও দশের শত্রু?
শুনেছি দস্যু বনহুর যে কোন মুহূর্তে যার তার উপরে হামলা করে তার সর্বস্ব লুটে নেয়। সমস্ত শহরের প্রতিটি নাগরিক তার ভয়ে সদা কম্পমান রয়েছে। নিরীহ জনগণের বুকে ছোরা বসিয়ে দিতে তার এতোটুকু বাধে না। এমন কি যে কোন যুবতী বা নারীকে সে দেখলে অপহরণ করে নিয়ে যায়–
এমন দস্যুর বাস যে দেশে সে দেশে গভীর রাতে নির্জন সাগর তীরে কখনই নিরাপদ নয় চলুন।
বনহুর অগ্রসর হলো।
জুলেখা অগত্যা ফিরে চললো তার সঙ্গে।
কোনো এসেছিলো কি বলতে চেয়েছিলো, কোন কথাই বলা হলোনা।
ওদিকে মনিরার ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো পাশের বিছানায় জুলেখার নিশ্বাসের শব্দ শোনা। যাচ্ছেনা কেননা। দৃষ্টি শক্তি নেই যে তাকিয়ে দেখবে সে। মনিরা নিজের নিশ্বাস বন্ধ করে কান পাতলো না, কিছুই শোনা যাচ্ছেনা। ডাকলো মনিরা এবার–জুলেখা,জুলেখা–
কোন সাড়া শব্দ নেই।
মনিরার বুকের মধ্যে টিপ টিপ করে উঠলো। তবে কি জুলেখা বিছানায় নেই মনিরা উঠে হাতড়ে হাতড়ে এগিয়ে গেলো জুলেখার বিছানার পাশে। বিছানায় হাত বুলিয়ে তার সন্দেহ সত্যে পরিণত হলো জুলেখা বিছানায় নেই শূন্য শয্যা পড়ে রয়েছে। মনিরার মনের মধ্যে একটা আলোড়ন শুরু হলো। কোথায় গেছে, কেননা গেছে–তবে কি–তবে কি তার স্বামীর কক্ষে জুলেখা–
ঠিক সেই মুহূর্তে শুনতে পেলো মনিরা বাংলোর বাইরে পুরুষ ও নারীকণ্ঠের হাস্যধ্বনি।
জুলেখার কণ্ঠে–গুড নাইট।
পরক্ষণেই তার স্বামীর কণ্ঠ স্পষ্ট শুনতে পেলো মনিরা–গুড নাইট—
মনিরার মাথাটা ঝিম ঝিম করে উঠলো। জুলেখা কক্ষে প্রবেশ করার পূর্বেই মনিরা নিজের শয্যায় এসে নিশ্চুপ শুয়ে পড়লো, নিস্পন্দ অসারের মত। একটু টু শব্দ সে করতে পারলো না। চোখে না দেখলেও অনুভব করলো– জুলেখা সন্তর্পণে শয্যায় এসে শুয়ে পড়লো।
পাশের কক্ষেও দরজা বন্ধ করার শব্দ কানে ভেসে এলো মনিরার। তার স্বামী দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লো বুঝতে পারলো সে। মনিরার সন্দেহ দৃঢ় হলো, নিশ্চয়ই জুলেখার সঙ্গে তার। স্বামীর গোপন প্রেম জন্মে গেছে।
মনিরার বুকের মধ্যে কে যেন লৌহ শলাকা বিদ্ধ করে দিচ্ছিলো অসহ্য সে যন্ত্রণা। মুখে কোন কথা না বললেও বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসছিলো তার।
জুলেখা ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু মনিরার চোখে আর ঘুম আসে না। আজ যেন সে তার যথাসর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছে। অন্ধ হয়েও তার মনে এতো দুঃখ ছিলো না, আজ তার জীবনের সবকিছু যেন শূন্যতায় ভরে উঠেছে। জুলেখার প্রেম বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে তার স্বামী–মনিরা আর ভাবতে পারে না। অন্ধ হলেও তার মনের পর্দায় দেখতে পায়–বনহুর আর জুলেখা, ওরা দু’জনা পাশাপাশি পথ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে উঁচু-নীচু পথ বনহুর জুলেখার দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে জুলেখা হাসছে ওর হাতে হাত রেখে সন্তর্পনে চলছে। হাসছে ওরা দুজনে দু’জনের দিকে তাকিয়ে! মনিরা দুই হাতে চোখ ঢেকে ফেলে কিন্তু মন থেকে তো মুছে ফেলতে পারে না। দৃশ্যের পর দৃশ্য ভেসে উঠে একটির পর একটি করে–সাঁওতাল পল্লী বনহুর আর জুলেখা বসে আছে পাশাপাশি। সম্মুখে নাচ দেখাচ্ছে ভীলবালাগণ। বনহুর আর জুলেখা দু’জন তাকাচ্ছে হাসছে উভয়ে। মনিরা আর ভাবতে পারে না, দুই হাতে মাথা টিপে ধরে শক্ত করে।
তারপর মনিরা আর নিজকে ধরে রাখতে পারে না, শয্যাত্যাগ করে নেমে দাঁড়ায় নিচে। অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চলে হাতড়ে হাতড়ে।
পাশের বিছানায় জুলেখার নাসিকার শব্দ হচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়েছে। জুলেখা।
মনিরা দেয়াল হাতড়ে এগুতে লাগলো। অতি ধীরে ধীরে দরজার খিল খুলে ফেললো মনিরা, বেরিয়ে এলো বাইরে। সমস্ত পৃথিবী আলোর বন্যায় ঝলমল করছে কিন্তু মনিরার চোখে সব অন্ধকার।
মনিরা এগিয়ে চললো বাংলোর বারান্দা বেয়ে সম্মুখের দিকে।
দেয়াল ধরে ধরে এগুচ্ছে মনিরা। কোন দিকে ওর খেয়াল নেই। বাড়ির সিঁড়ির ধাপ বেয়ে বাংলোর বারেন্দা থেকে নেমে পড়লো। হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলো একবার আবার উঠে দাঁড়ালো। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো পিঠের উপর। আঁচলটা খসে লুটোপুটি খেতে লাগলো মাটির মধ্যে। মনিরা এলোপাথারী অগ্রসর হচ্ছে। কানে ভেসে আসছে সমুদ্রের জলরাশির উচ্ছল কল কল শব্দ।
মনিরা সমুদ্রের দিকে এগুতে লাগলো। জীবনের উপর তার একটা ধিক্কার এসে গেছে। কি হবে এ জীবন রেখে যার সব গেছে–সব নিঃশেষ হয়ে গেছে। যার দৃষ্টি শক্তি নেই। নেই যার সম্বল বলতে কিছু–কি হবে তার জীবন রেখে। মনিরা সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে আত্মবিসর্জন দেবে।
উঠছে পড়ছে, আবার এগুচ্ছে সম্মুখের দিকে। কখনও পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে ভূতলে! মাথার একস্থানে পাথরের আঘাত লেগে কেটে গেলো অনেকটা। দর দর ধারায় রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
