বনহুর বুঝতে পারলো–জুলেখার এবার নামতে কষ্ট হবে, হঠাৎ নিচে পড়ে গেলে আহত হবার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য বনহুরের কাছে এসব উঁচু-নীচু বা ঢালু কিছুই নয়। জুলেখাকে ইতস্ততঃ করতে দেখে বললো বনহুর –আমার হাত ধরুন।
জুলেখা জ্যোছনার আলোতে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে। সম্মুখে বনহুরের হাতখানা বাড়ানো রয়েছে।
জুলেখা হাত রাখলো বনহুরের হাতে।
বনহুর বললো আসুন এবার কোন ভয় নেই।
জুলেখার বুকের মধ্যে টিপ টিপ করছে, একটা অনুভূতি তার সমস্ত শিরায় শিরায় শিহরণ জাগালো। এমনি করে সে যদি যুগ যুগ ধরে পথ চলতে পারতো ওর হাতের মধ্যে হাত রেখে।
বনহুর বললো-কষ্ট হচ্ছে না তো?
উঁহু কোন কষ্ট হচ্ছে না, কিন্তু আপনাকে আমি বড় কষ্ট দিলাম।
হাসলো বনহুর–কি যেন বলেন, এটা আবার কষ্ট নাকি?
সত্যি মঞ্জুর সাহেব, আপনি আশ্চর্য মানুষ। বললো জুলেখা।
বনহুর বললো–কোন ব্যতিক্রম দেখছেন বুঝি আমার মধ্যে?
তা দেখেছি বই কি?
কি রকম?
সে কথা আজ বলবো না। কথার ফাঁকে তারা প্রায় এসে যায় ভীল পল্লীর নিকটে।
ভীল পল্লীর সর্দার রতন বনহুরকে জানতো কারণ তার একজন সঙ্গী বাংলোর বাগানের মালীর কাজ করে।
বনহুর জুলেখা আর মনিরা বাংলোয় এসে উঠলেই সর্দার নিজে গিয়ে দেখা করে এসেছিলো, আজকের উৎসবে আমন্ত্রণও জানিয়ে এসেছিলেন সর্দার নিজে।
বনহুর আর জুলেখাকে দেখে খুশিতে আত্মহারা হলো রতন সর্দার।
তাদের ভাল করে একটা উঁচু জায়গায় বসিয়ে ফলমূল এনে দিলো খেতে। কচি ডাব এনে। দিলো পানির পরিবর্তে।
বনহুর আর জুলেখাকে খেতে দিয়ে তাদের চারপাশে নাচ শুরু হলো। মশাল নাচ, জংলী –নাচ, ধিংকি নাচ আরও কতরকম নাচ দেখালো ভীল পুরুষ আর নারীগণ বনহুর আর জুলেখাকে।
জুলেখা কোনদিন এসব নাচ দেখেনি, চিরদিন শহরের মানুষ সে। জংলী বা ভীলদের সংস্পর্শে আসেনি কোনদিন। অবাক হয়ে এ সব দেখতে লাগলো জুলেখা।
মাঝে মাঝে বনহুরের মুখে তাকিয়ে হাসছিলো সে।
মশালের আলোতে জ্যোছনার আলো স্তিমিত হয়ে গিয়েছিলো সেখানে।
বনহুর নাচ দেখলেও মন তার চঞ্চল হয়ে পড়ছিলো বারবার না জানি মনিরা কি করে? তাকে বলে এসেছে তাড়াতাড়ি ফিরবে। কিন্তু রাত যে অনেক হয়ে চললো।
বনহুর হাতঘড়ির দিকে তাকালো–ইস রাত দশটা বেজে গেছে।
জুলেখা উঠে দাঁড়ালো–চলুন।
আবার সেই পথ।
জ্যোছনার আলোতে ঝলমল করছে পাথুরিয়া পথঘাটগুলো।
জুলেখার মুখে আজ আনন্দের উচ্ছ্বাস।
হেসে বললো জুলেখা–আজকের কথা চিরদিন স্মরণ থাকবে মঞ্জুর সাহেব।
বনহুর ছোট্ট একটু জবাব দিলো হু।
জুলেখা আবার বললো–অপূর্ব এ দৃশ্য; অপূর্ব এ রাত।
আবার সেই ঢালু পথ। বনহুরের হাতে হাত রেখে জুলেখা এগুতে লাগলো।
এবার জুলেখা ইচ্ছা করেই বনহুরের পাশে ঘনিষ্ঠভাবে চলছিলো যেন কতদিনের পরিচয় ওদের দুজনার মধ্যে।
বাংলোর নিকটবর্তী হতেই জুলেখা আর বনহুরের কানে ভেসে এলো বীণার সুরের অপূর্ব ঝঙ্কার।
বনহুর বললো–মনিরা এখনও জেগে আছে।
জুলেখা বললো–এতো রাত ঘুমায়নি–আশ্চর্য।
একা একা বেচারী—
বনহুরের কথায় জুলেখা কোন জবাব দেয়না।
*
বাংলোয় ফিরে সেদিন আর কোন কথা হয়না কারো মধ্যে। বনহুর নিজের কামরায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। সাঁওতাল পল্লী থেকে যে ফলমূল আর পানীয় পান করে এসেছিলো। তাতে খাবার আর প্রয়োজন হলো না তাদের।
জুলেখাও শয্যা গ্রহণ করলো।
মনিরা বললো–ভীলদের নাচ কেমন লাগলো বললিনা তো জুলেখা?
জুলেখা চাদর মুড়ি দিতে দিতে বললো–অপূর্ব।
আজ যদি আমার দৃষ্টিশক্তি থাকতো, সত্যি কি আনন্দ করে ঘুরে বেড়াতাম। তোরা কত সুখী জুলেখা, আর আমি–
মনিরা যখন নিজের দৃষ্টিশক্তির জন্য দুঃখ করছিলো তখন জুলেখার মনে অন্য চিন্তার রেশ ঝঙ্কার তুলছিলো। মনের গহনে উপলব্ধি করছিলো কিছু পূর্বে মঞ্জুর সাহেবের সঙ্গে তার মধুময় মুহূর্তগুলি। জুলেখার অন্তরে অন্তরে এক অপূর্ব শিহরণ জাগছিলো।
মনিরা ঘুমিয়ে পড়ে।
জুলেখার চোখে ঘুম নেই।
এপাশ ওপাশ করছে জুলেখা।
পাশের ঘরে বনহুরের চোখেও ঘুম নেই। কিন্তু তার মনে জুলেখার চিন্তা নয়, মনিরার সান্নিধ্য লাভ তাকে চঞ্চল করে তুলেছে।
বনহুর শয্যা ত্যাগ করে উঠে দাঁড়ালো। মুক্ত জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো। সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের সীমাহীন জলরাশি। জ্যোছনার আলোতে ফেনিল জলরাশি ঝলমল করছে যেন একসঙ্গে অনেকগুলো তারার মালা দোল খেয়ে এগিয়ে আসছে সামনের দিকে।
বনহুর দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে।
অদূরস্থ ভাল পল্লীর উৎসব থেমে গেছে, মাদলের শব্দ আর এখন শোনা যাচ্ছেনা। ছবির মত ঝাপসা লাগছে দূরে থেকে পল্লীর ছোট ছোট কুঠিরগুলো।
বনহুর বাংলো ছেড়ে এগিয়ে চলে সমুদ্রের দিকে।
একটা পাথরখন্ডে বসে পড়ে বনহুর। সম্মুখে সমুদ্র। ছোট ছোট ঢেউগুলি ছুটে এসে আছড়ে পড়ছে তার পায়ের কাছে। ঠিক যেন কোন অভাগিনী নারী তার পদতলে মাথা কুটে কুটে কেঁদে মরছে।
বনহুর সিগারেটের পর সিগারেট নিঃশেষ করে চলেছে।
হঠাৎ কালো লঘু পদক্ষেপের শব্দে ফিরে তাকালো বনহুর। চমকে উঠলো সে, জ্যোছনার আলোতে স্পষ্ট দেখলো–জুলেখা তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। নির্বাক নিস্তব্দ পাথরের মূর্তির মত লাগছে তাকে।
বনহুর সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালো–আপনি!
জুলেখার ঠোঁট দু’খানা নড়ে উঠলো, কোন কথা বের হলোনা।
বনহুর বললো–চলুন বাংলোয় ফিরে যাই।
