বনহুর মনিরার আনন্দে তৃপ্তি লাভ করে। মনিরার দিকে তাকিয়ে হাসে বনহুর।
হঠাৎ ফিরে তাকায় বনহুর জুলেখার মুখে, জুলেখা নির্বাক নয়নে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
জুলেখার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই, জুলেখা দৃষ্টি নত করে নেয়।
এক সময় ওরা তিন জনা ফিরে আসে বাংলোয়।
বাংলোর বারেন্দায় পাশাপাশি তিনখানা সোফায় বসে পড়ে ওরা তিন জনা।
সমুদ্রের মুক্ত হাওয়া আর মিষ্টি মিষ্টি রৌদ্র ওদের মনে।
নতুন সুর জাগায়।
বনহুর বয়কে আদেশ দেয় চা আনতে।
চা পান করতে করতে অনেক কথা চলে ওদের মধ্যে।
হাসি-গল্প নিয়ে মেতে উঠে ওরা, বিশেষ করে মনিরাকে আনন্দ দেবার জন্য বনহুর অনেক হাসির গল্প বলে। মনিরার মুখে হাসি ফুটাবার আপ্রাণ চেষ্টা বনহুরের।
বনহুর যখন অন্যমনস্কভাবে কথা বলে চলে, জুলেখা তখন চিত্রার্পিতের মত তাকিয়ে থাকে বনহুরের হাস্য-উজ্জল সুন্দর মুখমন্ডলের দিকে। যতই দেখে ততই যেন আর দেখবার বাসনা উন্মুখ করে তোলে, মনের গোপন ইচ্ছা কিছুতেই গোপন রাখতে পারে না জুলেখা। প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে যেন স্বপ্নময় হয়ে উঠছে। একটা অগভীর আকর্ষণ নিয়ে হৃদয়ে উপলব্ধি করছে সে।
জুলেখা জানে, মঞ্জুর সাহেব মনিরাকে ভালবাসে এবং ভবিষ্যতে তাকে বিয়ে করাই হয়তো তার বাসনা ছিলো? তাই মঞ্জুর সাহেব চায় মনিরাকে আরগ্য করে তুলতে। তার দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে আনতে। জুলেখা বেশ বুঝতে পেরেছে, মঞ্জুর সাহেব আর মনিরার মধ্যে গভীর একটা সম্বন্ধ লুকানো আছে। কিন্তু জুলেখা এখন জানেনা কি তাদের সম্বন্ধ। জানলে হয়তো নিজকে এতোখানি ছেড়ে দিতে পারতো না সে মঞ্জুর সাহেবের দিকে। এটুকুই জানে জুলেখা ওদের মধ্যে একটা গভীর প্রেম বা প্রীতি রয়েছে, কিন্তু তা সম্ভব হচ্ছে না যতক্ষণ না মনিরা দৃষ্টিলাভে সক্ষম হয়। আপন মনে হাসে জুলেখা, মনিরার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা এখন তার আয়ত্বের মধ্যে।
বনহুর বললো- মিস্ জুলেখা, কি ভাবছেন?
না, কিছু না। চলো মনিরা ভিতরে যাই। জুলেখা মনিরা সহ বাংলার কক্ষে প্রবেশ করলো।
বনহুর একাই বসে রইলো সেখানে, ভাবতে লাগলো জুলেখার এই অন্যমনষ্কতার কথা। জুলেখার মনোভাব আজকাল স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। সব সময় সে বেশ ভাবাপন্ন এবং অন্যমনস্ক হয়ে থাকে। বনহুর বুদ্ধিহীন নয় সে বুঝতে পারে জুলেখার অন্তরের কথা। একটা ক্ষীণ। হাসির রেখা তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে মিলিয়ে যায়।
*
জ্যোছনা প্লাবিত রাত।
অদূরস্থ ভীল পল্লী থেকে ভেসে আসছে মাদলের আওয়াজ। সাঁওতালদের কোন উৎসব আছে হয়তো আজ।
বনহুর নিজ কামরায় শুয়ে গভীরভাবে জুলেখার সম্বন্ধেই চিন্তা করছিল। জুলেখা ছাড়া মনিরার দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কাজেই জুলেখার মনে কোন রকম অসন্তুষ্টির সৃষ্টি না হয় সেদিকে তাকে সতর্ক থাকতে হবে।
বনহুরের চিন্তাস্রোতে বাধা পড়লো, বয়ের কণ্ঠস্বর–স্যার, ও ঘরে ডাকছেন।
বনহুর মুখ তুলে তাকালো কোন ঘরে?
স্যার, ও ঘরে।
যা, আসছি। বনহুর উঠে পড়লো। বেশি রাত হয়নি তো কাজেই এখনও তারা রাতের খাবার খায়নি। বনহুর মনে করলো বোধ হয় খাবার জন্য ডাক পড়েছে।
মনিরা আর জুলেখা যে কক্ষে থাকতো সেই কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর।
মনিরা বললো–এসেছো?
হাঁ, কেনো?
শুনতে পাচ্ছো কিছু?
পাচ্ছি।
কি?
সাঁওতালদের কোন উৎসব হচ্ছে।
ইস কি সুন্দর মাদলের বাজনা।
যাবে ওখানে?
আমি কি যেতে পারব? শোন, জুলেখাকে নিয়ে যাওনা একটু, কোন দিনও সাঁওতালদের উৎসব দেখেনি।
বনহুর তাকালো জুলেখার দিকে।
জুলেখা বসে বসে কি যেন একটা কাঁটা দিয়ে বুনছিলো।
বলল সে– থাক, উনার অসুবিধা হবে।
বনহুর বললো– না, না আপনি যদি যেতে চান তাহলে আমার কোন অসুবিধা বা আপত্তি নেই, কিন্তু মনিরা, তুমি একা একা…।
হেসে বললো মনিরা– বাংলোর দারওয়ান আছে, বয় আছে তাছাড়া আমার বীণা আছে– জুলেখা আমার বাণীটা দিয়ে যাও আমার কাছে।
জুলেখা হাতের কাটা এবং উল-সূতার গুটিটা ওপাশে রেখে উঠে দাঁড়ালো–চল্ আমি তোকে হাত ধরে ধরে নিয়ে যাবো।
মাফ কর জুলেখা, যা উঁচু-নীচু জায়গা….
জুলেখা বীণা খানা এগিয়ে দেয় মনিরার হাতে।
মনিরা আসবার সময় বীণাখানা ছেড়ে আসেনি। নির্জন সাগর সৈকতে এটাও তার একজন সঙ্গী।
মনিরা বললো–বেশ ঠাণ্ডা পড়ে গেছে, ওভারকোট পরে নিও তোমরা।
জুলেখা ওভারকোট পরে নিলো।
বনহুর পাশের কক্ষ থেকে ওভারকোটটা গায়ে পরতে পরতে এসে দাঁড়ালো, মনিরাকে উদ্দেশ্য করে বললো–এক্ষুণি ফিরে আসবো মনিরা, বাইরে দারওয়ানকে বলে যাচ্ছি।
জুলেখা আর বনহুর বেরিয়ে যায়।
মনিরা বীণা খানা টেনে নেয় কোলের উপর।
বাংলোর বাইরে বেরিয়ে এলো ওরা দু’জনা– জুলেখা আর বনহুর। আজ পূর্ণিমা রাত্রি, আকাশে কোন মেঘের বালাই নেই। জ্যোছনা স্নাত পৃথিবী, কোথাও এতোটুকু যেন অন্ধকার নেই, নেই কোন মলিনতা।
উঁচুনীচু টিলার উপর দিয়ে পাশপাশি এগুচ্ছিলো বনহুর আর জুলেখা। বাংলোর কিছু দূরে ভীলপল্লী, মাদলের শব্দ আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তার সঙ্গে শোনা যাচ্ছে ভীলবালাদের কণ্ঠের অদ্ভুত গীত।
বাংলোর আশে পাশে খানিকটা জায়গা সমতল হলেও কিছুটা চলার পর শুধু টিলা আর টিলা ছোট ছোট খাদও আছে।
এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালো তারা। জায়গাটা বেশ ঢালু হয়ে নেমে গেছে নিচের দিকে।
