*
পরদিন।
লেবরেটরী কক্ষে টেবিলে মাথা রেখে বসে আছে জুলেখা।
হঠাৎ জুলেখাকে খুঁজতে গিয়ে লেবরেটরী কক্ষে প্রবেশ করলো বনহুর–এই যে মিস জুলেখা, আপনি এখানে…
বনহুরের কণ্ঠস্বরে মুখ তুলে তাকালো জুলেখা, কোন জবাব দিলো না।
বনহুর টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, জুলেখার মুখে-চোখে নজর পড়তেই চমকে উঠলো সে, বললো–মিস্ জুলেখা, আপনি কি অসুস্থ?
না।
কিন্তু আপনার চোখ-মুখ স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না।
বনহুরের কথায় অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেকে সংযত করে নেবার চেষ্টা করলো জুলেখা।
বনহুর বললো–মিস্ জুলেখা, মনিরা আপনাকে ডাকছে।
উঠে দাঁড়ায় জুলেখা, বলে–চলুন।
বনহুর আর জুলেখা মনিরার কক্ষে প্রবেশ করলো।
পদশব্দে মুখ তুলে তাকালো মনিরা–কে, জুলেখা?
জুলেখা মনিরার পাশে এসে পিঠে হাত রাখলো।
বনহুর বললো–মনিরা, তুমি না তোমার বান্ধবীকে খুঁজেছিলে? বলো কি বলতে চাও তাকে।
জুলেখাই বললো এবার–কেমন লাগছে মনিরা?
ভাল না। আজ বড় অন্ধকার লাগছে সব।
জুলেখা কি যেন ভাবলো, তারপর বললো–এখানে তোর মন টিকছেনা তাই মন অস্থির লাগছে।
হাঁ জুলেখা, আমার মনে হচ্ছে কোথাও দূরে চলে যাই; কোন দূর দেশে…
মনিরা। অস্ফুট কণ্ঠে বললো জুলেখা।
বনহুর বললো এবার–মিস জুলেখা, আমার মনে হয় মনিরাকে কোন সমুদ্রতীরে মুক্ত জায়গায় নিয়ে গেলে ভাল হতো।
মনিরা যদি এমন কোন ইচ্ছা করে থাকে তবে আমার কোন আপত্তি নেই। কিন্তু এক সপ্তাহ। পর মনিরার চোখের ব্যান্ডেজ খুলে নতুনভাবে ঔষধ লাগাতে হবে।
মিস্ জুলেখা, আপনাকেও তাহলে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।
আমাকে!
হা। বললো বনহুর।
জুলেখা অন্যদিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললো–সম্ভব নয়।
মনিরা ব্যাকুল কণ্ঠে বললো–কেনো জুলেখা? কেননা সম্ভব নয়?
আমার রোগী, আমার লেবরেটরী ছেড়ে যাবো কি করে বল?
মনিরা অভিমান ভরা কণ্ঠে বললো–তাহলে আমাকে মেরে ফেল্। আমাকে মেরে ফেল জুলেখা…
মনিরা। জুলেখা মনিরার মাথায় হাত রাখলো।
মনিরা বললো আবার–তুই না গেলে আমি কোথাও যাবোনা– যাবোনা আমি।
বনহুর গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো– মিস্ জুলেখা, মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য চলুন। ফিরে এসে ওর চোখের বাধন মুক্ত করে দেবেন।
শেষ পর্যন্ত মনিরাকে হরিদ্রা সাগর সৈকতের ধারে নিয়ে যাওয়াই মনস্থ হলো, কান্দাই শহর ছেড়ে উত্তর দেশ হরিদ্রা। নির্জন সাগর তীরে ছোট্ট একটি বাংলো।
বনহুর মনিরা সহ এই বাংলোয় এসে উঠলো। জুলেখাকেও ধরে এনেছে তারা সঙ্গে করে।
জুলেখা মনিরার জেদ এড়াতে পারেনি, তাছাড়াও বনহুরের অনুরোধেও তাকে আসতে হলো তাদের সঙ্গে।
জুলেখা কয়েক দিনের জন্য তার পেসেন্টদের দায়িত্বভার সহপাঠি মিঃ হামিদের হাতে সঁপে দিয়ে এলো। মিঃ হামিদকে সহায়তা করবে তার অভিজ্ঞ সহকারিণী মিস রীণা রায়।
কাজেই এ ব্যাপারে কতকটা নিশ্চিন্ত হয়েছে জুলেখা।
সাগর তীরের উচ্চ একটা টিলার উপরে সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি বাংলো।
পাশাপাশি দুটো কামরায় ওরা উঠলো।
একটি বনহুর দ্বিতীয়টিতে জুলেখা আর মনিরা। বাংলোর সম্মুখে কিছুটা দূরে সমুদ্র। চারিদিকে শুধু জল আর জল, প্রচণ্ড প্রচণ্ড ঢেউগুলি উচ্ছলভাবে ছুটে এসে আছড়ে পড়ছে বাংলোর পাদমূলে পাথরগুলির উপরে।
বাংলার অদূরে কতকগুলি ভীল পল্লী। এছাড়া কোন সভ্য লোকের বসবাস নেই এ অঞ্চলে।
বাংলোটা বেশ নীরব নির্জন সব সময়ের জন্য।
বনহুরের কাছে খুব ভাল লাগলো জায়গাটা।
জুলেখা সব সময় মনিরার পাশে পাশে থাকে, যখন মনে করে হাত ধরে নিয়ে যায় সমুদ্রতীরে। ঘুরে বেড়ায় ওরা। বনহুরও সঙ্গে থাকে ওদের।
সমুদ্র সৈকতের অপরূপ সৌন্দর্য লক্ষ করে মুগ্ধ হয় বনহুর আর জুলেখা! মনিরার দৃষ্টিশক্তি নেই, তবু আবহাওয়াটা তার মনে একটা অনাবিল আনন্দ এনে দেয়।
বলে মনিরা– কি সুন্দর হাওয়া, তাই না জুলেখা?
হ্যাঁ। ছোট জবাব দেয় জুলেখা।
বনহুর বলে উঠে চলো মনিরা, সাগরের তীরে গিয়ে দাঁড়াই। আসুন মিস জুলেখা, ওকে আমরা সাগরতীরে নিয়ে যাই।
চলুন।
জুলেখা মনিরার হাত ধরে, কিন্তু উঁচুনীচু টিলা বেয়ে নিচে নামতে মনিরার খুব অসুবিধা হচ্ছিলো।
বনহুর মনিরার আর একটি হাত ধরে বললো চলো।
সমুদ্র সৈকতে আসার পর দু’দিন কেটে গেছে, এ দু’দিনের মধ্যে স্বামীর স্পর্শ মনিরা একবারও পায়নি। স্বামীর হাতে হাত রেখে মনিরা স্বর্গের শান্তি হৃদয়ে অনুভব করে।
বনহুর মনিরাকে নিয়ে অতি সাবধানে এগুচ্ছিলো।
জুলেখাও সাহায্য করছিলো মনিরাকে।
সাগরতীরে এসে দাঁড়ালো ওরা তিন জন।
যে স্থানে এসে দাঁড়ালো সে স্থানে শুধু সোনালী বালুকা রাশি ভোরের সূর্যের আলোতে চিকমিক করছে।
মনিরা, জুলেখা আর বনহুর দাঁড়াতেই ছোট ছোট ঢেউগুলি আছড়ে এসে পড়লো তাদের পায়ের উপরে।
মনিরা দেখতে না পেলেও খুশিতে আত্মহারা হলো। ছুটোছুটি করে বেড়াতে ইচ্ছা হলো, জুলেখা আর বনহুরের পাশ থেকে আপন মনে সরে গেলো। হাঁটু গেড়ে বসে ঢেউগুলি ধরবার জন্য হাত বাড়ালো।
জুলেখা বললো– জামা-কাপড় ভিজে গেলো মনিরা।
যেতে দাও জুলেখা, সব ভিজে যেতে দাও। ইস কি আনন্দ, কি আনন্দ! সত্যি, খুব আনন্দ লাগছে, না?
বনহুর আর জুলেখা ব্যথাভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মনিরার মুখে।
মনিরার প্রাণভরে ঢেউগুলিকে আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করছে। উচ্ছ্বসিত আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছে সে।
