.
সেদিন মনিরাকে তার চ্যাম্বারে বসিয়ে চোখ পরীক্ষা করে দেখছিলো জুলেখা। আগের চেয়ে এখন অনেকটা সতেজ মনে হচ্ছে মনিরার চক্ষুসংশ্লিষ্ট নার্ভগুলি।
জুলেখা খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠলো, ভুলে গেলো সে এটা তার চ্যাম্বার। শুধু মনিরাই নয় এখানে আরও অনেক রোগী রয়েছে, জুলেখা জড়িয়ে ধরলো মনিরাকে–মনিরা আমার সাধনা সার্থক হবে। মনিরা আমার প্রচেষ্টা সার্থক হবে…
ঠিক সেই মুহূর্তে চ্যাম্বারে প্রবেশ করে বনহুর। মনিরাকে জুলেখা বাহুর মধ্যে তখনও আকড়ে ধরে রেখেছে, চোখে-মুখে খুশির উৎস ফুটে উঠেছে তার।
বনহুর থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো জুলেখা আর মনিরার দিকে।
জুলেখা উচ্ছাসিত কণ্ঠে বললো–মঞ্জুর সাহেব, আমি মনিরার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হব বলে আশা করছি।
এই ঘটনার কয়েকদিন পর।
মনিরার চোখে আজ একটা ছোট্ট অপারেশন হবে। অপারেশন টেবিলে মনিরা শায়িত। জুলেখা নিজে অপারেশন করবে। তাকে সহায়তা করছে তার মহিলা সহকারিণী। পাশে দাঁড়িয়ে। মঞ্জুর চৌধুরী বেশে দস্যু বনহুর।
জুলেখা অত্যন্ত যত্ন সহকারে কাজ করছিলো।
বনহুরও জুলেখাকে সাধ্যমত সাহায্য করছিলো, জুলেখার পাশে থেকে।
অপারেশন শেষ হয়ে যায়, চ্যাম্বারে নতুন একটা পেসেন্টকে ঔষধ দেবার জন্য বেরিয়ে যায় জুলেখার সহকারিণী।
মনিরার চোখে তখন ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছিলো জুলেখা। বনহুর তাকে সাহায্য করতে লাগলো।
ব্যান্ডেজ শেষ করে যখন পিন-আপ করছিলো জুলেখা, বনহুরের হাতখানা তার হাত স্পর্শ করে। জুলেখার সমস্ত শরীরে একটা অনুভূতি নাড়া দিয়ে যায়। শিরায় শিরায় জাগে একটা শিহরণ।
জুলেখা মনিরার চোখের ব্যান্ডেজ পিন-আপ শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
বনহুর তখন মনিরার কপাল থেকে চুলগুলি সরিয়ে দিচ্ছিলো। ফিরে তাকাতেই বনহুরের দৃষ্টির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হলো জুলেখার!
জুলেখার চোখে-মুখে একটা আবেগভরা ভাব ফুটে উঠেছে। বনহুর চট করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারলো না।
মনিরা অস্ফুট কণ্ঠে বললো–বড্ড পিপাসা।
জুলেখার সম্বিৎ ফিরে আসে তাড়াতাড়ি পাশের টেবিল থেকে পানির গেলাসটা তুলে নিয়ে মনিরার মুখে ঢেলে দেয়।
মনিরা জুলেখার দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে–জুলেখা।
জুলেখা চট করে জবাব দিতে পারছিলো না, একটু কেশে গলাটা পরিস্কার করে নিয়ে বললো–কোন কষ্ট হচ্ছে?
না, কিন্তু কেমন ভয় হচ্ছে আমার।
জুলেখার দৃষ্টি নিজের অজ্ঞাতে আর একবার চলে গেলো বনহুরের মুখে।
বনহুর তখনও তাকিয়ে আছে জুলেখার দিকে।
আবার উভয়ের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় হলো।
মনিরা বললো–আমাকে নিজের ঘরে নিয়ে চলো।
জুলেখা বললো–চলো তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।
অপারেশনের পর মনিরার চোখ দুটো তুলো আর ব্যান্ডেজ দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একেই সে দুনিয়ার কিছু দেখতে পায় না, তারপর আরও যেন সব গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। সব কেমন জমাট অন্ধকারে ভরা, পৃথিবীর কোথাও যেন এতোটুকু আলো নেই।
নিজের বিছানায় শুয়ে ছটফট করছিলো মনিরা, স্বামীকে পাশে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলো সে। মাথায়-চুলে হাতখানা বুলিয়ে একটু সান্ত্বনা ভরা কথা বলবে। কিন্তু এতো কাছে থেকেও কত দূরে,–অসহ্য লাগছিলো মনিরার।
বনহুরও পাশের কামরায় মনিরার সান্নিধ্য লাভের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলো, কিছুতেই নিজকে স্থির রাখতে পারছিলো না। মনিরার জন্য নানা রকম দুঃশ্চিন্তার ঝড় বইছিলো তার মনের মধ্যে। সত্যি কি মনিরা আবার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। সত্যি কি মনিরা আবার তাকে দেখতে পাবে। দেখতে পাবে সমস্ত পৃথিবীটাকে।
বনহুর নিজের কক্ষে পায়চারী করছিলো। রাত তখন অনেক হয়ে গেছে।
ঘুমিয়ে পড়েছে মনিরা।
কিন্তু এখনও পাশের বিছানায় জেগে আছে জুলেখা। অনেক চেষ্টা করেও চোখের পাতা দুটো বন্ধ করতে পারছে না। মনের মধ্যে একটা আলোড়ন তাকে করে তুলেছে উন্মত্ত। কয়েক দিন পূর্বেও মনিরার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার চিন্তা তাকে অহরহঃ অস্থির করে তুলেছিলো। তার সাধনা, তার প্রচেষ্টা সফল করে তোলার জন্য হয়ে উঠেছিলো উন্মাদ। রাতের পর রাত চক্ষু চিকিৎসা সম্বন্ধে বইগুলি খুলে গভীর মনোযোগ সহকারে ঘাটাঘাটি করেছে। কেমন করে বান্ধবীকে সে আরোগ্য করবে, কেমন করে ফিরিয়ে আনবে তার চোখের আলো। বান্ধবীর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে না পারলে তার বিদেশে শিক্ষা লাভ সব পণ্ড হয়ে যাবে। তার সাধনা সগ্রাম সব ব্যর্থতায় পূর্ণ হবে। বান্ধবীর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনা তার চাই…
কিন্তু আজ জুলেখার চিন্তার মোড় ফিরে গেছে অন্যদিকে। তার মনে এখন দ্বন্দ্ব চলেছে। মনিরার দৃষ্টিশক্তি ফিরে এলেই হারাবে সে মঞ্জুর সাহেবকে। মঞ্জুর চৌধুরীকে সে নিজের অজ্ঞাতে ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু সে যে ডাক্তার…ডাক্তারের কর্তব্য রোগীকে আরোগ্য করে তোলা, রোগীকে রোগমুক্ত করা কিন্তু মনিরার দৃষ্টি ফিরে এলে কি করে তা সম্ভব হবে যা সে চায়। জুলেখা চায় মঞ্জুর চৌধুরীকে নিজের করে পেতে।
জুলেখা কিছুতেই মনকে সুস্থির করতে পারছেনা। একদিকে বান্ধবীর চক্ষুদান অন্যদিকে মঞ্জুর চৌধুরীকে হারানোর ভয়। সত্যিই যদি মনিরার দৃষ্টিশক্তি আর কোন দিন ফিরে না আসে, তাহলে–তাহলেই মঞ্জুর চৌধুরী সরে পড়বে তার পাশ থেকে। অন্ধ নারীকে কোন পুরুষ কোনদিন জীবন-সঙ্গিনীরূপে গ্রহণ করতে পারে না। হাঁ, জুলেখা তাই করবে! জুলেখা তাই করবে, ভুলে যাবে সে কর্তব্য।
