মনিরা বললো– আমি তো আগেই দেখেছিলাম আর এখন কি দেখতে পাবো?
তবুও চল। মনিরার হাত ধরে জুলেখা অগ্রসর হলো।
বনহুর অনুসরণ করলো জুলেখাকে।
বাড়িটা সেকেলের তৈরি হলেও আধুনিক ছাঁচে তৈরি। বনহুর এ বাড়িতে আসেনি কোনদিন, ঘুরে ফিরে দেখতে লাগলো। নিচের কক্ষগুলিতে কেউ বাস না করলেও প্রত্যেকটা কক্ষ মূল্যবান আসবাবে সজ্জিত।
জুলেখা নিজ লেব্রটরী আর চ্যাম্বারও দেখালো। চ্যাম্বারের পাশের কামরায় প্রবেশ করে বললো জুলেখা- মনিরা, তুমি এ কক্ষেই থাকবে, একা নয়– আমিও থাকবো তোমার পাশের বেডে।
বনহুর হেসে বললো– তাহলে তো কোন অসুবিধা নেই। আপনি যখন ওর সমস্ত দায়ীত্বভার গ্রহণ করছেন।
কিন্তু আপনার যদি কোন অসুবিধা না থাকে তবে আমাকে মনিরার ব্যাপারে কিছুটা সাহায্য করতে পারেন। কারণ আমি যখন আমার অন্যান্য পেসেন্টদের নিয়ে ব্যস্ত থাকবো। তখন মনিরার পাশে থাকবার কেউ থাকবেনা। আসুন মঞ্জুর সাহেব, আপনার কক্ষ দেখিয়ে দি।
বনহুরকে অগত্যা জুলেখার কথায় রাজি হতে হলো।
মনিরার পাশের কক্ষেই বনহুরের থাকার জন্য সাব্যস্ত হলো।
জুলেখা সমস্ত কথা পাকাপাকি করে নিয়ে মনিরা ও বনহুরসহ চৌধুরী বাড়িতে গেলো এবং মরিয়ম বেগমকে সব কথা বুঝিয়ে বললো সে।
মরিয়ম বেগম আপত্তি করতে পারলেননা।
জুলেখা মনিরার মঙ্গলের জন্যই চিন্তা করছে, কাজেই এতে তার আপত্তি কি আছে বরং তিনি খুশিই হলেন।
মনিরা আর জুলেখা পাশের কক্ষে শুয়ে আছে পাশাপাশি বেডে। রাত বেশি না হলেও বাড়িটা নিশুতি হয়ে পড়েছিলো। জুলেখার আম্মা বাতের ব্যথায় ভোগা মানুষ, তিনি সন্ধ্যার পর চারটি খেয়ে নিয়ে লেপের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। বিশ্বাসী ঝি আর চাকরগুলো বাড়িটা চালিয়ে নেয় কোন রকমে। তাছাড়া উপাই বা কি আছে। ব্যাপারটা নতুন নয়, কাজেই গা সওয়া হয়ে গেছে সকলের।
নাসির শাহ বাড়ি ফেরে গভীর রাতে; কোন দিন রাত দুটো তিনটা বেজে যায়। টেবিলে তার খাবার ঢাকা থাকে, নাসির শাহ এলে তাদের পুরোন চাকর হবু এসে খাবার আগলা করে দেয়, দাঁড়িয়ে থাকে পাশে।
হবু এ বাড়িতে এসেছে আজ প্রায় বিশ বছর হলো। যুবক এসেছিলো–বুড়ো হয়েছে। নাসির শাহই নয়–এ বাড়িতে সবাই তার হাতে মানুষ হয়েছে। নাসির শাহর জন্য শুধু একদিন নয়, দুদিন নয়–যখন থেকে নাসির শাহ যুবক হয়েছে, তখন থেকে হবুকে এমনি রাতের পর রাত জেগে কাটাতে হয়েছে। একদিন যদি হবুর ঘুম ভাংতে বিলম্ব হয় বা কোনরকম অসুবিধায় আসতে না পারে তাহলে নাসির শাহ থালা বাসন ভেঙে একাকার করে ফেলে। আর যদি কোন দিন মাতাল অবস্থা বাড়ী ফেরে সেদিন খাবার টেবিলে না বসে সোজা বিছানায় গিয়ে ঢলে পড়ে। জুতো খুলবার সময় হয়না।
হবু ওর জুতো খুলে দেয়। মাথাটা তুলে বালিসে রাখে, চাদরটা টেনে দেয় গায়ে।
কাজেই নাসির শাহর আগমন কোন দিন সন্ধ্যা-রাতে হয়না।
বাড়ির চাকর-বাকর সবাই খেয়ে-দেয়ে নাক ডাকাচ্ছে। হবু অবশ্য জেগে আছে,. তবু বসে বসে ঝিমুচ্ছিলো নাসিরের প্রতীক্ষায়।
জুলেখা আর মনিরা পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে গল্প করছিলো। পাশের কক্ষে বনহুর একটা সোফায় বসে বই পড়ছে। দক্ষিণ হস্তে বইখানা ধরা রয়েছে তার চোখের সম্মুখে। বাম হস্তের আংগুলের ফাঁকে জলন্ত সিগারেট। বনহুরের দৃষ্টি বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ। অত্যন্ত গভীর মনোযোগের সঙ্গে বইখানা পড়ছিলো সে। কোন অনুবাদ কাহিনী হবে।
হঠাৎ হাসির শব্দে বনহুরের মনোযোগ সহকারে বই পড়ার ব্যাঘাত ঘটলো। দৃষ্টি বইএর পাতায় সীমাবদ্ধ থাকলেও কান সজাগ হলো এবার!
পাশের কক্ষ থেকে ভেসে আসছে, জুলেখা আর মনিরার হাসির শব্দ, খিল খিল করে হাসছে ওরা দুজনা। হাসি থেমে গেলো, শুনতে পেলো বনহুর এবার জুলেখার কণ্ঠ–সত্যি করে বলছিস ওর সঙ্গে তোর কোন…
মনিরার কণ্ঠ–বললাম তো ওর সঙ্গে আমার কোন সম্বন্ধ নেই। তাছাড়া আমার কি অতো বড় ভাগ্য হবে?
জুলেখার গলার আওয়াজ শোনা গেল এবার–উনি কিন্তু তোকে বড্ড ভালবাসেন।
মনিরা বললো–ভালবাসা নয় জুলেখা–অনুগ্রহ করেন।
কিন্তু আমার যেন মনে হয়, তোর দিকে মঞ্জুর সাহেবের গভীর একটা আকর্ষণ আছে।
কেমন করে তোর মনে হলো?
না হলে সে সব ছেড়ে তোর জন্য এখানে রয়ে গেলো। সত্যি মনিরা, উনাকে আমার বড় ভাল লাগে।
সত্যি নাকি?
সত্যি।
বলবো নাকি কিছু?
খবরদার, তাহলে তোর চুল ছিঁড়ে দেবো কিন্তু…
মনিরার কণ্ঠ––উঃ ছেড়ে দাও সত্যি বলবোনা। আঃ বড় জোরে ধরেছিস কিন্তু আমার চুলগুলো।
আচ্ছা ছেড়ে দিলাম কিন্তু ওকে যেন কোন কথা বলিসনে।
না না, আমি কি অবুঝ খুকী।
জুলেখা, আপন মনে বললো এবার–অদ্ভুত মানুষ!
কে?
মঞ্জুর সাহেব।
কি করে বুঝলি সে অদ্ভুত?
তার চাল-চলনে। আজ কদিন তুই আমার এখানে এসেছিল। উনিও এসেছেন–এতো সুন্দর মধুর স্বভাব আমি কোন পুরুষের মধ্যে দেখতে পাইনি।
বনহুর পাশের কক্ষে সোফায় বসে সব শুনছিলো, বই রেখে উঠে দাঁড়ালো সে।
কিছুক্ষণ পায়চারী করলো সে নিজের কক্ষে, তারপর শয্যায় এসে বসলো।
আজ কদিন থেকে মনিরার চক্ষু চিকিৎসা চলেছে। এক ঘন্টা পর পর মনিরার চোখে ঔষধ। লাগাতে হয়। মাঝে মাঝে ইনজেকশানও দেয় জুলেখা মনিরার বাহুতে।
পাশের চ্যাম্বারে অন্যান্য পেসেন্টদের ভীড়েও জুলেখা ভুলে যায়না তার কর্তব্য। জুলেখা নিয়মিতভাবে মনিরার চিকিৎসা করে চলে।
