ড্রাইভ করে চললো বনহুর নিজেই।
মনিরা ড্রাইভিং আসনে পাশে বসে রয়েছে, আজ তার মনে অফুরন্ত আনন্দ। স্বামীর পাশে সে বসে রয়েছে–এযে তার কত কামনার কত সাধনার, কত প্রতীক্ষার।
মনিরা অন্ধ হলেও জুলেখার বাড়ির ঠিকানা তার জানা রয়েছে। বনহুর মনিরার কাছে জুলেখার বাড়ির পথের নির্দেশ নিয়ে উপস্থিত হলো সেখানে।
জুলেখা সবেমাত্র মনিরার ওখানে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, এই মুহূর্তে মনিরাও তার সঙ্গে একটি যুবককে দেখে বিস্মিত হলো। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে এগিয়ে এলো জুলেখা– হ্যালো মনিরা, তুমি এসে গেছো?
জুলেখা মানিরাকে জড়িয়ে ধরলো, কিন্তু বনহুরের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই একটু সংকুচিতভাবে সরে দাঁড়ালো।
মনিরা বললো-জুলেখা, তোর কাছে এলাম। হাঁ, আগে তোর সঙ্গে ওর পরিচয় করিয়ে দি।
বনহুর মনিরার পিঠে হাত রেখে কিছু ইংগিত করলো।
মনিরা হেসে বললো–আমার দূর সম্পর্কে ভাই হন। সম্প্রতি বিদেশ থেকে ফিরে এসেছে, আমাদের ওখানে থাকবে কয়েক দিন। আর এ হচ্ছে আমার প্রিয় বান্ধবী জুলেখা– ডক্টর এবং আইজস্পেশালিস্ট।
বনহুর ও জুলেখা ছালাম বিনিময় করলো।
নিজের অলক্ষ্যে জুলেখার দৃষ্টি বার বার চলে যাচ্ছিলো বনহুরের মুখের দিকে। মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত অনুভূতি নাড়া দিচ্ছিলো তার। বললো জুলেখা–উর নাম তো বললিনা মনিরা?
ওঃ ভুল হয়ে গেছে, প্রথম নাম বলাই উচিৎ ছিলো…
মনিরা বলার পূর্বেই বললে বনহুর আমার নাম মঞ্জুর চৌধুরী। মঞ্জুর বলেই ডাকবেন, চলুন ভিতরে গিয়ে বসি।
সরি, এতোক্ষণ আপনাদের দাঁড় করিয়ে রেখেছি। চলুন।
জুলেখা মনিরার হাত ধরে নিয়ে চললো। বনহুর এগুলো পিছনে পিছনে।
হলঘরে এসে বললো জুলেখা বসুন আপনি। মনিরা, বস্ ভাই। আমি কিন্তু তোর ওখানেই যাচ্ছিলাম।
জুলেখা আর মনিরার মধ্যে উভয়ে উভয়কে কখনও তুমি’ কখনও তুই’ বলে সম্বোধন করতো।
জুলেখার কথায় বললো মনিরা– তাহলে ভালই হতো।
না, তোমরা এসেছো খুব ভাল হয়েছে। আচ্ছা তোমরা একটু বসো আমি তোমাদের জন্য চা আনতে বলি।
জুলেখা চলে গেলো।
বনহুর মনিরার হাতের উপরে হাত রেখে চাপা কণ্ঠে বললো- সতর্কভাবে কথা বলবে মনিরা তোমার বান্ধবী যেন বুঝতে না পারে তোমার আমার গোপন সম্বন্ধ।
আচ্ছা, তুমি যেভাবে বলবে, আমি তাই করবো।
ফিরে এলো জুলেখা, পিছনে বয়ের হাতে চায়ের সরঞ্জাম।
বনহুর আর মনিরার সম্মুখে চায়ের ট্রে নামিয়ে রেখে সরে দাঁড়ালো বয়।
জুলেখা পাশের একটা সোফায় বসে চা তৈরি করে বনহুর ও মনিরাকে সম্মুখে বাড়িয়ে দিলো।
প্রথম মনিরার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে, পরের কাপটা এগিয়ে ধরলো বনহুরের দিকে নিন।
বনহুর জুলেখার হাত থেকে কাপটা নিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে বললো–ধন্যবাদ।
চা পান করতে করতে আলাপ শুরু হলো বনহুর, জুলেখা আর মনিরার মধ্যে।
মনিরার চক্ষু চিকিৎসা নিয়েই আলোচনা চললো।
জুলেখা বললো– আমি যেমন করে হোক আমার বান্ধবীর দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করবো।
বনহুর আগ্রহ ভরা কণ্ঠে বললো– মিস্ জুলেখা, আপনার কি মনে হয় মনিরার দৃষ্টিশক্তি পুনঃ ফিরে আসবে?
আমার মনে হয় আসবে।
বনহুরের চোখ দুটো খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
জুলেখা শান্তভাবে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললো আমি আজ কদিন থেকে মনিরাকে নিয়ে ভাবছি। একটা উপায় খুঁজে পেয়েছি। মনে হয় ওর দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে আনতে সমর্থ হবো। কিন্তু…মনিরাকে আমার এখানে থাকতে হবে।
মনিরা বললো এবার তোর এখানে?
হাঁ, কারণ তোর চোখের নার্ভ শিথিল হয়ে গেছে! আমাকে নানাভাবে চেষ্টা নিতে হবে– প্রতি এক ঘন্টা পর পর তোর চোখে ঔষধ লাগিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে হবে, কাজেই তোকে ছেড়ে দিলে চলবেনা। আমি এ জন্যই একটু আগে তোদের ওখানে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু…. কিছু বলতে গিয়ে থেমে পড়লো মনিরা।
জুলেখা বলে উঠলো–কোন কিন্তু নয় মনিরা, যতই হোক আমি তোকে ছেড়ে দেবোনা।
মনিরার আজ দেখবার ক্ষমতা নাই, তাহলে স্বামীর মুখভাব লক্ষ্য করে দেখতো। বললো আবার মনিরা–মামীমার কাছে কথাটা পেড়ে দেখবো তিনি কি বলেন।
মনিরার কথা শেষ না হতে বললো বনহুর উনি নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে অমত করবেন না মনিরা, কারণ এখন তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আনার জন্য সব কিছুতেই রাজি হবেন।
মনিরা বনহুরের কথায় বুঝতে পারলো এ ব্যাপারে অমত নেই তার। জুলেখা বলে উঠলো– ঠিক বলছেন মঞ্জুর সাহেব, মনিরার চোখে দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি আমার এখানে থাকতে অমত করতে পারেন না।
কথার ফাঁকে চা পান শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
বনহুর প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট কেসটা বের করে একটা সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করলো।
জুলেখা বললো– মামীমাকে আমি গিয়ে সব বলে আসবো।
বনহুর এক মুখ ধোয়া ছুঁড়ে সোফায় ঠেস দিয়ে বসে বললো তাহলে আমার ছুটি কেমন?
মনিরা কিছু বলতে যাচ্ছিলো কিন্তু তার পূর্বেই বলে উঠলো জুলেখা– আমার বাড়িতে জায়গার কোন সংকীর্ণতা নেই দেখছেন তো। এতো বড় বাড়িটায় মাত্র আমরা তিনটি প্রাণী। আমার আম্মা, আমার বড় ভাই, আর আমি। আম্মা উপরেই থাকেন– নীচে নামেন না। বড় ভাই সব সময় তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অনেক রাতে ফেরেন। তিনিও উপরে থাকেন। আমিও উপরে শুই। আর এই যে নীচের কামরাগুলো সব ফাঁকা পড়ে থাকে, থাকবার লোক নেই। হলঘরের ওদিকেরটা আমার লেব্রটরী, পাশেরটা চ্যাম্বার। আসুন না আমার সঙ্গে দেখবেন– আয় মনিরা। জুলেখা উঠে দাঁড়িয়ে মনিরার হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিলো।
