তাহলে…তাহলে মনিরা তোমার বান্ধবীকে আমি নিজে অনুরোধ জানাবো। বনহুরের কণ্ঠে আকুলতা ঝরে পড়ে।
কিন্তু কি করে তা সম্ভব হবে? আমার বান্ধবীকে তুমি পাবে কি করে?
মনিরা ভয় পেওনা, দস্যু বনহুরের আসল রূপ, একমাত্র মিঃ জাফরী ও মিঃ আহম্মদ ছাড়া। কেউ চিনতে পারবেনা, আজ আমি ফিরে যাবোনা মনিরা।
সত্যি বলছো?
হাঁ, মনিরা।
কিন্তু।
বলো?
এ বাড়ির একমাত্র সরকার সাহেব ছাড়া তোমাকে কেউ দেখেনি কোনদিন। বাড়ির চাকর বাকর অন্যান্য সবাই আশ্চর্য্য হবে যে?
বলো আমার একজন বন্ধু বা আত্মীয়।
তাহলে চলো মামীমার কাছে যাই?
হুঁ এখন নয় — আরও পরে বনহুর মনিরাকে ঘনিষ্ঠভাবে টেনে নেয় কাছে।
মনিরা নিজেকে উজাড় করে দেয় বনহুরের মধ্যে।
সমস্ত কান্দাই শহর তখন ঝিমিয়ে পড়েছে। যান-বাহন চলাচলের শব্দও থেমে গেছে। পথচারীদের পদশব্দ আর শোনা যাচ্ছেনা। মাঝে মাঝে শুধু ভেসে আসছে পুলিশের বাঁশির সতর্ক ধ্বনি। আর আকাশে জেগে আছে তারার প্রদীপ।
*
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো মনিরার।
জেগেই অনুভব করলো মনিরা– তার দেহটা কোন শিথিল বাহুবন্ধনে আবদ্ধ রয়েছে। মনিরার অন্তরে একটা আনন্দের উৎস বয়ে গেলো। শিরায় শিরায় বয়ে গেলো তার এক জ্যোতির্ময় লহরী। মনিরা ঘুমন্ত স্বামীর হাত দু’খানা সরিয়ে দিতে পারলোনা। কত সাধনা, কত কামনার যেন। ঐ বাহু দুটি। মনিরা ভাবছে- সে তো স্বপ্ন দেখছেনা, সত্যি আজ সে স্বামীর বাহুর মধ্যে শায়িতা…. মনিরা যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেনা।
ধীরে ধীরে মনিরা স্বামীর বুকে-গলায় মুখে হাত বুলিয়ে অনুভব করছে– বাস্তব না কল্পনা।
বনহুরের ঘুম ভেঙে গেলো, মনিরাকে আরো নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরে বললো– মনিরা, কি করছো?
তোমাকে দেখতে পাচ্ছিনা, তাই অনুভব করছি– সত্যি তুমি আমার পাশে আছে কি না?
মনিরা।
বলো?
আমি শপথ করছি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য নিজের জীবন ত্যাগ করতেও কুণ্ঠা বোধ করবোনা। আমার জীবনের বিনিময়েও আমি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরে চাই মনিরা।
ছিঃ শপথ করতে নেই অমন করে।
বনহুর নীরব রইলো।
মনিরা বললো আবার– জুলেখা চোখ সম্বন্ধে ভালভাবে শিক্ষা লাভ করে এসেছে, আমার মনে হয় সে আমাকে আরোগ্য করতে আপ্রাণ চেষ্টা করবে।
আজ আমি তোমাকে নিয়ে যাবো তোমার বান্ধবীর ওখানে। যাও মনিরা, মাকে বলো সব কথা। ওঃ তুমি যাবে কি করে?
হাসলো মনিরা– অভ্যাস হয়ে গেছে। তুমি মুখ-হাত ধুয়ে এসো আমি মামীমাকে ডেকে আনছি।
মনিরা দেয়াল হাতড়ে এগুতে লাগলো।
বনহুর হাত ধরে এগিয়ে দিলো তাকে দরজা অবধি।
মরিয়ম বেগম নামাজ শেষে ছালাম ফিরছিলেন, মনিরাকে তার ঘরে প্রবেশ করতে দেখে তাড়াতাড়ি মোনাজাত শেষ করে উঠে গিয়ে ধরলেন মনিরাকে– মনিরা কি হয়েছে?
মামীমা, ও এসেছে।
সে, আমার মনির?
হাঁ, মামীমা। চলো তোমার জন্য প্রতীক্ষা করছে সে।
মরিয়ম বেগমের মুখমণ্ডল উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠলো, মনিরাকে আঁকড়ে ধরে বললেন চল, মনিরা–চল, নইলে আবার পালিয়ে যাবে ঠিক সেই মুহূর্তে মরিয়ম বেগমের সম্মুখে এসে দাঁড়ালো বনহুর। হেসে বললো না, আর পালিয়ে যাবোনা মা।
সত্যি, সত্যি বলছিস?
হাঁ, মনিরার চক্ষু চিকিৎসার জন্য আমাকে থাকতে হবে এখানে।
বাবা মনির! আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেন মরিয়ম বেগম। সন্তানকে সব সময়ের জন্য পাশে পাবেন– এ যেন তার পরম সৌভাগ্য।
বনহুরকে পেয়ে মরিয়ম বেগম যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। কিন্তু তাকে সব সময় সংযত হয়ে থাকতে হলো। বাড়ির সকলের নিকটে বলা হলো–মনির তার আত্মীয়ের ছেলে। দূর দেশে চাকরী করে–ছুটিতে কয়েক দিন থাকবে বলে এসেছে এখানে।
বাড়ির চাকর-বাকর এবং অন্যান্য সবাই কেউ বনহুরকে দেখে নাই কোনদিন, সকলেই বিশ্বাস করলো কথাটা।
একমাত্র সরকার সাহেব ছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে কেউ জানলো না কে এই যুবক- কি এর পরিচয়।
দিনের আলোতে এমন করে বনহুর কোন দিন এ বাড়িতে আসেনি বা থাকেনি। মরিয়ম বেগম বা মনিরা দিনের আলোতে কোন দিন দেখেনি তাকে।
পুত্রকে মরিয়ম বেগম প্রাণভরে দেখতে লাগলেন। শতবার দেখলেও যেন তৃপ্তি হচ্ছেনা।
বনহুর হেসে বললো– মা অমন করে কি দেখছো?
তোকে প্রাণভরে তোকে দেখছি বাছা।
মা। বনহুর মায়ের বুকে ছোট শিশুর মতই আশ্রয় নেয়।
মনিরা দাঁড়িয়েছিলো পাশে, মাতা-পুত্রের কথাগুলো তার হৃদয়ে মধু বর্ষণ করছিলো। যদিও দেখতে পাচ্ছিলোনা কিছু কিন্তু অন্তরে উপলব্ধি করছিলো সব।
মাতা-পুত্রের মিলন দৃশ্য মনিরার দৃষ্টিতে ধরা না পড়লেও সমস্ত মনের পর্দায় পরিস্ফুটিত হচ্ছিলো। মনিরার মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।
বনহুর আজ স্বাভাবিক নাগরিকের বেশে সজ্জিত। মূল্যবান কোট-প্যান্ট-টাই পরিহিত অবস্থায় রয়েছে।
সকাল বেলার চা-নাস্তা খাবার পর বনহুর মাকে জানালো- মা, আমি মনিরাকে তার বান্ধবী ডক্টর জুলেখার ওখানে নিয়ে যেতে চাই?
আতঙ্কগ্রস্ত মনে বললেন মরিয়ম বেগম–কিন্তু হঠাৎ যদি কেউ তোকে চিনে ফেলে বাবা?
হাসলো বনহুর– ভয় পেওনা মা। এ শহরে আমাকে কয়েকজন বিশিষ্ট পুলিশ অফিসার ছাড়া কেউ চেনেনা।
মরিয়ম বেগম পুত্রের কথায় সম্পূর্ণ আশ্বস্ত না হলেও আর অমত করলেন না। তিনি বললেন– যাও বাবা। যাও– সাবধানে যেও।
বনহুর মনিরাকে নিয়ে গাড়িতে চেপে বসলো।
