হঠাৎ কাঁচের শাশটিা আবার যেন নড়ে উঠলো একটু।
এবার কিন্তু মনিরা চমকালো না, যেমন বসেছিলো তেমনি রইলো। মনে করলো সে দমকা হাওয়া আবার বুঝি নাড়া দিলো কাঁচের শার্শটিায়।
পরক্ষণেই মনিরার ভুল ভেঙে গেলো, এবার পূবালি হাওয়া নাড়া দেয়নি। কেউ যেন সন্তর্পণে প্রবেশ করলো জানালা দিয়ে কক্ষমধ্যে। মনিরার হৃদয়ে একটা আনন্দের উচ্ছ্বাস আলোড়ন জাগালো। তবে কি সে এসেছে, যার প্রতীক্ষায় মনিরা জেগে আছে আজ ক’টি রাত। কিন্তু সে তো দেখতে পায়না, বিষ পানে তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গেছে। উঃ তবে কি আর কোন দিন ওকে দেখতে পাবেনা। না না, সে কি করে সহ্য করবে কি করে সহ্য করবে এই অসহ্য অন্ধকার।
মনিরার মুখে উচ্ছাসিত আনন্দের লোহরী ফুটে উঠেছে। কিন্তু মনিরা এখনও নিশ্চুপ বসে আছে খাটের উপর।
বনহুর কক্ষে প্রবেশ করে মনিরাকে খাটে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়, কই তাকে দেখতে পেয়েও মনিরা অমন নিশ্চুপ বসে রইলো কেনো! বনহুরের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠলো, কয়েক পা এগিয়ে কঠিন কণ্ঠে ডাকলো–মনিরা।
মনিরা স্বামীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে অধীর আনন্দে অস্কুট ধ্বনি করে উঠলো– তুমি এসেছো! পর মুহূর্তে খাটের উপর থেকে নেমে ছুটে গেলো সে যেদিক থেকে ভেসে এসেছিলো বনহুরের গলার আওয়াজ।
কিন্তু সোফার সঙ্গে আঘাত পেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো মেঝেতে।
বনহুর স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো, মনিরার আচরণে বিস্মিত হলো। একি! মনিরা তাকে দেখতে পাচ্ছেনা?
তাড়াতাড়ি মনিরাকে ধরে তুলে নিলো বনহুর।
মনিরা স্বামীর স্পর্শে আত্মহারা হয়ে পড়লো, দুই হাত দিয়ে বনহুরের বুকে-মুখে মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে বললো তুমি এসেছে।
বিস্ময়ের চরম সীমায় পৌঁছে গেছে বনহুর, কিছুক্ষণ তার মুখ দিয়ে কোন কথা উচ্চারণ হলোনা। মনিরার এই অদ্ভুত ব্যবহারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো সে। বনহুর বললো– মনিরা, তুমি এমন করছো কেননা! মনিরা..
ওগো, আমি যে তোমায় দেখতে পাচ্ছিনা।
বনহুর প্রায় চিৎকার করে উঠলো– মনিরা।
হাঁ, আমি অন্ধ হয়ে গেছি। আমি অন্ধ হয়ে গেছি… স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদে উঠে মনিরা।
চিত্রার্পিতের মত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বনহুর।
এই মুহূর্তে তার মস্তকে আকাশ ভেঙে পড়লেও বুঝি এতোখানি মর্মাহত হতোনা বনহুর।
মনিরা স্বামীর জামার আস্তিন চেপে ধরে ঝাঁকুনি দেয়– ওগো তুমি কথা বলছো না কেনো? ওগো তুমি কথা বলছো না কেনো?
বনহুরের জীবনে বহু ঘাত-প্রতিঘাত এসেছে। বৈচিত্রময় তার জীবনের প্রতিটি ধাপ– কিন্তু একি পরিণতি এলো তার জীবনে।
সহসা বনহুরের কণ্ঠ দিয়ে কোন কথা বের হলোনা। অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করে নিয়ে বললো– মনিরা, কেমন করে তোমার এ অবস্থা হলো?
মনিরা কোন কথা বললো না।
বনহুর মনিরাকে নিয়ে খাটে এসে বসলো, মনিরার মুখখানা তুলে ধরে বললো– মনিরা, কেমন করে তোমার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হলো?
মনিরা তবু নীরব।
বনহুর ব্যাকুল কণ্ঠে বললো.. বলবেনা তুমি?
মনিরা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বললো তোমার মৃত্যু সংবাদ আমার কানে পৌঁছবার পূর্বে। আমি মরতে চেয়েছিলাম…
মনিরা!
আমি– আমি বিষ পান করেছিলাম।
বিষ!
হাঁ, ডাক্তার বোস নানা চেষ্টায় আমাকে মৃত্যুর কবল থেকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন কিন্তু আমি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছি…
বনহুর তার বলিষ্ঠ হাতের মধ্যে মনিরার হাত দুটি দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে– এ তুমি কি করেছো মনিরা? এ তুমি কি করেছো?
ওগো, আর কোনদিন আমি তোমাকে দেখতে পাবোনা? আমার কোন আর দুঃখ নেই ব্যাথা নেই শুধু তোমাকে দেখতে পাবোনা, এই দুঃখ আমার অন্তরটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। তোমার ঐ সৌম্য-সুন্দর দীপ্ত চোখদুটো আর আমি দেখতে পাবোনা!
বনহুর গভীর আবেগে মনিরাকে বুকে আঁকড়ে ধরে মনিরা।
মনিরা স্বামীর মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে অনুভব করতে চেষ্টা করে তাকে।
হঠাৎ মনিরার হাত দু’খানা বনহুরের গণ্ডে পড়তেই বুঝতে পারে সে, বনহুর কাঁদছে।
মনিরা বলে উঠে– তুমি কাঁদছো।
বনহুরের চোখের পানি ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পরে মনিরার মাথায়। কেঁদোনা লক্ষ্মীটি। তোমার মনিরার আর কোন দুঃখ নেই। ব্যথা নেই, নেই কোন অনুতাপ। জানো– আজ আমি কত সুখী– তুমি আছো– এটাই আমার জীবনের পরম সৌভাগ্য। আমি নিজে নিঃশেষ হয়ে যাবো, তবু তুমি বেঁচে থাকো….
মনিরা, তুমি এভাবে নিজকে ধ্বংস করবে, কোনদিন কল্পনাও করতে পারিনি। একটা দীর্ঘশ্বাস বনহুরের বুক চিরে বেরিয়ে এলো।
বনহুর বললো আবার তোমাকে এভাবে দেখবার পূর্বে আমার মৃত্যু হলেও মঙ্গল ছিলো।
মনিরা তাড়াতাড়ি বনহুরের মুখে হাত-চাপা দিলো–না না, ও কথা বলো না। ও কথা বলোনা তুমি।
মনিরা, তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছিলে। কেননা, কেনো তুমি বিষ পান করেছিলে মনিরা, কেনো তুমি বিষ পান করেছিলে…
মনিরাকে বাহুর মধ্যে টেনে নিয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কথাগুলো বললো বনহুর।
বনহুর বললো এবার মনিরা, কিছুদিন পূর্বে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখেছিলাম সম্প্রতি লণ্ডন থেকে একজন মহিলা ডক্টর এসেছেন। তিনি শুধু ডাক্তারই নন একজন আইজুস্পেশালিস্টও।
হাঁ, সে আমার একজন অন্তরঙ্গ বান্ধবী, নাম ওর জুলেখা।
সে তোমাকে দেখেছে?
দেখেছে। আমাকে নিয়ে সে গম্ভীরভাবে চিন্তা করেছে।
সত্যি?
আমার অন্ধত্ব বান্ধবীদের মধ্যে তাকেই বেশি আঘাত করেছে।
