*
রাত বারোটায় ফিরে এলো নাসির শাহ মদের নেশায় চুর চুর হয়ে। টলতে টলতে কক্ষে প্রবেশ করতেই জুলেখা তার সম্মুখে দাঁড়ালো, রাগত কণ্ঠে বললো সে ভাইয়া, তুমি কি দিন দিন অমানুষ হয়ে পড়লে?
অমানুষ! কেনো?
ছিঃ তোমার সঙ্গে কথা বলাও পাপ। কি ছাই পাস খেয়েছো বলতো?
জুলেখা, তুই কি বুঝবি বোন! কথা বলতে বলতে ঢেকুর তুলছিলো নাসির শাহ।
জুলেখা আর দাঁড়াতে পারলোনা বা কোন প্রশ্ন তাকে করলোনা বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
শত চিন্তা করেও জুলেখা ভাইকে সৎপথে আনার কোন উপায় খুঁজে পেলোনা।
কিন্তু নাসিরের চিন্তায় বেশিক্ষণ ভাবার সময় ছিলোনা জুলেখার। তার সাধনা রোগীর সেবা করা। যত কঠিন রোগই হোক, জুলেখা চায় সেই রোগকে তার চিকিৎসায় আরোগ্য করে তোলা।
সারাটা দিন যে সব রোগীদের মধ্যে তাকে কাটাতে হয়, রাতে শয্যা গ্রহণের পরও তাদের নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে সে। শুধু সে ডাক্তারই নয়– মানুষের বিভিন্ন শারীরিক দিক নিয়েই সে বিদেশ থেকে শিক্ষা লাভ করে ফিরে এসেছে। তার কর্তব্য দেশের জনগণকে রোগমুক্ত করা। সে যে কোন রোগই হোক তাকে সারিয়ে তোলাই তার জীবনের ব্রত।
জুলেখা যখনই তার রোগীদের নিয়ে ভাবতে বসে তখনই প্রথমে ভেসে উঠে মনিরার কথা তার মন জুড়ে। যেমন করে হোক মনিরার দৃষ্টি শক্তি তাকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। জুলেখা শুধু ডাক্তারই নয়- আইজ স্পেশালিস্টও। মনিরার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে না পারলেই তার সাধনাই ব্যর্থ যাবে।
জুলেখা মনিরাকে নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে। রাতের পর রাত চক্ষু চিকিৎসা সম্বন্ধে মোটা মোটা ডাক্তারী বইগুলো নিয়ে পাতা উল্টে চলে। যেমন করে হোক মনিরাকে স্বাভাবিক করতেই হবে। গোটা রাত কাটিয়ে দেয় জুলেখা অনিদ্রায়।
মনিরা শুধু বান্ধবীই নয়, জুলেখার জীবনের একমাত্র সঙ্গিনী।
জুলেখা কেনো যেন সব চেয়ে বেশি ভালবাসতো মনিরাকে যদিও মনিরা জুলেখার শিশুকালের সঙ্গী নয়। স্কুল জীবনে ওদের দুজনার পরিচয় ঘটেছিলো, তারপর কলেজ জীবন।
মনিরা বিশ্বাস করতো যেমন জুলেখাকে, জুলেখাও তেমনি মনিরাকে নিজের জীবনের চেয়েও ভালবাসতো। মনিরার অমঙ্গল চিন্তা করতে পারতোনা কোনদিন জুলেখা। মনিরাও ছিলো ঠিক বান্ধবীর মতই, এক প্রাণ এক মন ছিলো ওদের দু’জনার।
এই ঘটনার পর কয়েকদিন কেটে গেছে। শহরবাসীদের মন থেকে দস্যু বনহুরের পলায়ন স্মৃতি সম্পূর্ণ অন্তর্হিত না হলেও একটা আতঙ্ক ভরা ভাব যা এ ক’দিন শহরের স্বাভাবিক গতিকে অস্বাভাবিক করে তুলেছিলো, আপাতত সেটা অনেকটা কমে এসেছিলো।
শহরের যান-বাহন চলাচল এবং পথচারীদের অবাধ গতি একেবারে সচ্ছ না হলেও কিছুটা সহজ হয়ে এসেছে।
পুলিশ পথে, আনাচে-কানাচে নিয়মিত পাহারায় রত থাকলেও এ ক’দিনের মত সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে প্রতিটি নাগরিকদের লক্ষ্য করছেন না বা প্রত্যেকটি গাড়ি পরীক্ষা করে দেখছেনা।
কারণ কান্দাই এর মত মস্ত বড় একটা শহরকে সম্পূর্ণ পুলিশের আয়ত্বের মধ্যে রেখে অনুসন্ধান চালানো কয়েক দিন সম্ভব হলেও সকল সময়ের জন্য সম্ভব ছিলনা। শুধু পুলিশ বাহিনীই নয়, সবাই জানতে পেরেছিলো–দস্যু বনহুর এখন শহরে বসে নাই।
নাগরিকগণ স্বাভাবিকভাবে পথ চলাচল করলেও একেবারে নির্ভয় হতে পারছিলোনা। যত কাজই থাক, তারা রাত দশটার পর আর শহরের মধ্যে আনাগোনা করতে সাহসী হচ্ছিলোনা।
রাত বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কান্দাই শহরে জনমুখর রাজপথ জনশূন্য হয়ে আসে। যান বাহন চলাচল একেবারে বন্ধ না হলেও কমে আসে অনেক। বিশেষ প্রয়োজন না হলে কেউ গাড়ি নিয়ে বের হতে চায় না।
দস্যু বনহুরের অন্তর্ধানের পর নগরবাসীর মনে যে একটা তীব্র আতঙ্ক ভাবের সৃষ্টি হয়েছিলো তা এখনও সমূলে নির্মূল হয়ে যায়নি।
কান্দাই শহর এখন বেশি রাত্রিতে একেবারে নিশ্চুপ নীরব হয়ে যায়। শুধু পুলিশদের হুইসেলের শব্দ আর দু’চারটি মোটরের হর্ণ ছাড়া কিছুই শোনা যায় না।
সমস্ত শহর যখন সুপ্তির কোলে ঢলে পড়েছে, পাশের কক্ষ থেকে ভেসে আসছে নাসির শাহর নেশায় ভরপুর নাসিকার গর্জন ধ্বনি। জুলেখা তখনও তার চক্ষু বিষয়ক ডাক্তারী বইগুলি নিয়ে। মনোযোগ সহকারে দেখে যাচ্ছিলো।
এক সময় জুলেখার আঁখি দুটি বন্ধ হয়ে আসে, নিদ্রা দেবী আসন গাড়ে তার চোখের পাতায়।
ঘুমিয়ে পড়ে জুলেখা।
চৌধুরী বাড়িতে রাত জাগা প্রহরীর মত মনিরা বসে আছে নিজ শয্যায়। আজ নয়, সেদিনের পর থেকে মনিরার চোখের নিদ্রা অন্তর্হিত হয়েছিল চিরতরে যেদিন মনিরা সংজ্ঞালাভের পর ক্ষণিকের জন্য শ্রবণ করেছিলো সেই দীপ্তগম্ভীর কণ্ঠস্বর।
মনিরা প্রতি মূহুর্তে কামনা করে আসছে স্বামীর। দেখতে সে পায়না এখন কিন্তু কানে শুনতে পায় তো। হঠাৎ যদি এসে ফিরে যায় কিংবা আবার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে ফেলে তখন চোখে না দেখলেও কানে শুনতে পাবে তো।
কক্ষ মধ্যে একটু শব্দ হলেই মনিরার চোখ দুটো উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠে। স্বর্গীয় এক প্রতিভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে তার মুখমণ্ডল। ব্যাকুল কণ্ঠে কত দিন মনিরা প্রশ্ন করে বসেছে– কে, তুমি এসেছো? ওগো তুমি এসেছো?
কোন সাড়া নেই শব্দ নেই। বাতাস কখন নিঃশব্দে চলে গেছে জানালার শাশীতে মৃদু আঘাত করে। মনিরা বিফল হৃদয়ে আবার বালিশটা আঁকড়ে ধরে। বুঝতে পারে– যার জন্য ব্যাকুল সে, তার সেই প্রতীক্ষিত ব্যক্তির আগমন শব্দ এ নয়। মনিরার ব্যথিত হৃদয় মুষড়ে পড়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে গণ্ড বেয়ে।
