পুলিশ অফিসে এক গাদা পুলিশ অফিসার ও আরও অন্যান্যদের সম্মুখে মাথা নত করে একটা চেয়ারে বসে ছিলো নাসির শাহ। চোখেমুখে তার লজ্জা-ক্ষোভ প্রতিহিংসা ফুটে উঠেছে। মুখ কালো করে বসেছিলো সে ইন্সপেক্টারের প্রশ্নে মুখ তুলে তাকালো নাসির শাহ, গম্ভীর কণ্ঠে বললো– দস্যু বনহুরকে বন্দীর উদ্দেশ্যেই আমি চৌধুরী বাড়ি গিয়েছিলাম।
অবাক কণ্ঠে বললেন মিঃ জাফরী– দস্যু বনহুরকে বন্দীর উদ্দেশ্যে আপনি চৌধুরী বাড়ির প্রাচীর টপকে ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন?
হাঁ, জানতাম সে ঐদিন শহরের যেখানেই থাক একবার চৌধুরী বাড়ি গমন করবেই।
হাসলেন মিঃ আহম্মদ– জানতেন না পুলিশ আপনার চেয়েও সতর্ক ও চৌধুরী বাড়ির। উপরে তাদের কড়া নজর আছে বা ছিলো?
জানতাম, তবু নিজে দস্যুকে গ্রেপ্তার করে…..
কৃতিত্ব লাভ করতে চেয়েছিলেন এই তো? মি জাফরী।
মিঃ আহম্মদ হেসে উঠলেন– সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী যাকে গ্রেপ্তারে হিমসিম খেয়ে যায় আর আপনি তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিলেন অস্ত্রহীন রিক্ত হস্তে! আপনার দুঃসাহস তো কম নয়। এবার কঠিন কণ্ঠে বললেন তিনি–কেননা আপনি আজ রাতে চৌধুরী বাড়িতে গিয়েছিলেন সত্য করে বলুন?
এবার সোজা হয়ে বসলো নাসির শাহ; দৃঢ় কণ্ঠে বললো সে–ঐশ্বৰ্য্য বা অর্থের লোভী আমি নই, কারণ, এসব আমার প্রচুর আছে। তাহলেই বুঝতে পারছেন, চুরি বা ডাকাতি করতে আমি যাইনি।
তাহলে কি জন্য আপনি গিয়েছিলেন–কোন্ অভিসন্ধি নিয়ে বলুন?
বললাম, আমি দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার আশায় গিয়েছিলাম, এবং আমি রিভলভার সঙ্গে নিয়েছিলাম বটে, কিন্তু পুলিশ যখন আমাকে গ্রেপ্তার করে ফেললো তখন আমি ভয়ে রিভলভার দূরে নিক্ষেপ করেছিলাম।
মিঃ জাফরী এবং মিঃ আহম্মদ আরও কিছুক্ষণ নাসির শাহকে জেরা করার পর মুক্ত করে দিলেন।
নাসির শাহ পুলিশ অফিস থেকে বেরিয়ে সহসা বাড়ি ফিরে যেতে পারলোনা, সে সোজা তার আড্ডায় গিয়ে হাজির হলো।
গত রাতের ব্যাপার নিয়ে চললো নাসির শাহ আর তার দলবলের মধ্যে গভীর আলোচনা। চৌধুরী-কন্যা মনিরাকে চুরি করতে গিয়েই তার জীবনে একটা কলঙ্কের রেখাপাত হলো। হাজত বাস নয়, একেবারে হাঙ্গেরী কারাগারে বন্দী হতে হলো তাকে।
ক্রুদ্ধ জন্তুর মত ফোঁস ফোঁস করেছিলো নাসির শাহ। দু’চোখে তার আগুন ঠিকরে বের হচ্ছিলো। ক্ষিপ্তের ন্যায় পায়চারী করছিলো আর বলছিলো সে চৌধুরী-কন্যা মনিরাকে আমার চাই। যেমন করে হোক আমি তকে হরণ করে আনবোই আনবো। হোক সে অন্ধ, হোক সে দৃষ্টিহীন….. আমি যতক্ষণ না মনিরাকে পেয়েছি ততক্ষণ আমার স্বস্তি নেই, শান্তি নেই..
নাসির শাহের সাঙ্গ-পাঙ্গ অর্থলোভে সব সময় তার আসর সরগরম করে থাকতো, কাজেই কুবুদ্ধির জন্য তাকে আর ভাবতে হতোনা। গোটাদিন ধরে চললো শারাব পান আর নানারকম আলোচনা।
*
নাসির শাহ দস্যু বনহুর গ্রেপ্তারে গিয়ে বন্দী হয়েছে, কথাটা এক সময় বোন জুলেখার কানে এসে পৌঁছলো। ভাই এর জন্য সে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লো, এতোবড় দুঃসাহস কি করে হলো তার–যার সব সময় নিজ স্বার্থ ছাড়া কোনদিকে তাকাবার সময় নেই, সেই ভাই গিয়েছিলো রাতের অন্ধকারে দস্যু বনহুরকে পাকড়াও করতে! সবাই বিশ্বাস করলেও জুলেখা কথাটা সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে পারলোনা।
আজ নয়, আরও কতদিন নাসির শাহ এমনি মিথ্যা কথা বলে লোক-সমাজকে বঞ্চনা করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। জুলেখা বুঝতে পারলো, নিশ্চয়ই কোন কুমতলব নিয়ে সে গিয়েছিলো চৌধুরী বাড়িতে।
অনেক রাত ধরে জেগে কাটালো জুলেখা ভাই-এর প্রতীক্ষায়। হাজার হলেও ভাইতো। মা অসুস্থ মানুষ– শাহ বাড়ির কোন অমঙ্গল হলে সেটা সবার আগে জুলেখাকেই আঘাত করবে বেশি করে। কারণ জুলেখা এখনও অবিবাহিত; এ সংসারই তার আপন এবং নিজের।
আজকাল জুলেখা যদিও নিজের রোগী-পত্তর আর লেটারী নিয়ে ব্যস্ত থাকে তবুও সংসারের খোঁজ-খবরও না রেখে তার চলে না।
নাসির শাহ আজ গৃহলক্ষ্মী ঘরে আনেনি। বিয়ে করলে তার জীবনটা নাকি এক ঘেয়েমিতে পূর্ণ হয়ে উঠবে। তখন দূর্বিসহ জীবনটা বয়ে নিয়ে যাওয়া তার পক্ষে নাকি এক দূরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। কাজেই নাসির শাহ নিজের জীবনটাকে সীমাবদ্ধ করতে চায় না। মুক্ত বিহঙ্গের মত এখন যে দিকে খুশি বিচরণ করে ফিরছে, তখন সেটি উপায় থাকবে না– এটাই হলো তার বিয়ে না করার একমাত্র কারণ।
জুলেখাও এ নিয়ে বড় একটা কিছু বলতোনা নাসির শাহকে জানতো, বলে শুধু বাক্যব্যয় ছাড়া কোন ফল হবেনা। নীরব থাকাই সমীচীন মনে করতো সে।
তবু আপন সহোদর তো, জুলেখার হৃদয়ে নাসির শাহর এই অমানুষিকতা চরম আঘাত হানলেও ভিতরে ভিতরে গুমড়ে কেঁদে উঠতো তার মন। বড় ভাইটিকে সংশোধন সংকল্পে আপ্রাণ চেষ্টা করতো জুলেখা অন্তরাল থেকে।
কিন্তু কথায় বলে, কুকুর লেজে রশি বেঁধে টানলেও কোন দিন সোজা হয় না। তাই জুলেখাও ভাইকে সৎ পথে আনবার বহু চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো সর্বদিকে।
আজ যখন জুলেখা জানতে পারলো, নাসির শাহ পুলিশ হস্তে বন্দী হয়েছে, তখন তার বুকে কে যেন একটা তীর-ফলা বিদ্ধ করলো সকলের অলক্ষ্যে। জুলেখা ব্যস্ত হলো না বটে কিন্তু উদ্বিগ্ন হলো। সারাটা দিন মনোকষ্ট আর দুর্ভাবনায় কাটিয়ে দিয়ে রাতেও জেগে রইলো ভাইয়ের আগমন প্রতীক্ষায়।
