সেদিন আরও বলেছিলো নূরী– বনহুর শুধু পবিত্রই নয়– নির্মল, নিষ্পাপ..
কথাটা জোবাইদার মনে মুহূর্তের জন্য একটা সান্ত্বনার খোরাক বয়ে এনেছিলো বটে কিন্তু স্থায়ী হয়নি বেশিক্ষণ। অবিশ্বাসের স্রোত ভেসে গিয়েছিলো নূরীর উক্তিগুলো। যার সঙ্গে এতো নিবিড় ঘনিষ্ঠতা, যার সঙ্গে এতো ঐকাত্ম কি করে বিশ্বাস করবে জোবাইদা তার কথা। বনহুর সৌম্য-সুন্দর বলিষ্ঠ পুরুষ আর নূরী সুন্দরী চঞ্চলা যুবতী। কিছুতেই জোবাইদা বিশ্বাস করতে পারে না, ওদের মধ্যে নেই কোন অবৈধ সম্বন্ধ।
জোবাইদা চায় নূরী থেকে সরে থাকবে বনহুর– যেমন রয়েছে তাদের সান্নিধ্য থেকে অনেকে দূরে। শত আরাধনা করেও কোন দিন তারা বনহুরের পদ স্পর্শ করতে সক্ষম হয়নি। জোবাইদার গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলো আজ বনহুর, আর বিস্মিত হয়েছিলো তার কণ্ঠস্বরে। বনহুরের কানে বার বার প্রতিধ্বনি হচ্ছিলো জোবাইদার দৃঢ় কণ্ঠের উক্তিগুলি…. সর্দার, নূরীর স্পর্ধা দিন দিন চরমে উঠেছে। নূরীর অসংযত ব্যবহার আমাদের সকলের মনে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। আমরা তাকে ক্ষমা করবো না… আমরা তাকে ক্ষমা করবো না… আমরা তাকে ক্ষমা করবো না।…
বনহুর ধীর কণ্ঠে বললো– নূরীর অপরাধ?
জোবাইদা কোন জবাব দিতে পারলোনা, একবার চোখ তুলে তাকালো বনহুরের মুখের দিকে।
বনহুর মেঝেতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো–জোবাইদা।
বলো নূরীর অপরাধ কি?
সর্দার, আমি দাইমাকে ডেকে আনছি সেই বলবে। না, তোমাকেই বলতে হবে।
আর একবার জোবাইদা চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে নিলো বনহুর আর নূরীকে।
ঠিক সেই সময় কক্ষে প্রবেশ করলো বৃদ্ধা দাইমা!
বনহুর ফিরে তাকিয়ে তাকে একবার দেখে নিলো।
দাইমা বললো এবার– বনহুর, তুমি এখন আমাদের সর্দার দলপতি। বাবা, তোমাকে আস্তানার সবাই যেমন সম্মান করে তেমনি করে ভয়। সবাই চায় তাদের সর্দার হবে সবদিকে আদর্শ সত্যবান..
জোবাইদা যা বলতে চাচ্ছিলো, শুনতে চাই।
সে কথা আমি বলবো বাবা।
তবে ভূমিকা না করে বলো। আমি সর্দারের যোগ্য নই?
না, সে কথা না বনহুর।
ভ্রুকুঞ্চিত করে তাকায় বনহুর দাইমার মুখের দিকে।
দাইমা বলে এবার–বনহুর, তোমার বয়স হয়েছে, নূরীও এখন বয়স্কা যুবতী। তোমার আর নূরীর সধ্যে মিলামিশা নিয়ে একটা–
থেমে পড়ে দাইমা, বনহুরকে সেও ভয় করতো ভীষণভাবে।
বনহুর অবশ্য কোন দিন দাইমাকে অশ্রদ্ধা করেনি বা কঠিন কথা বলেনি।
দাইমা কালু খাঁর এখানে দাসী হিসাবেই এসেছিলো। প্রচুর অর্থের লোভেই সে এসেছিলো, সেকথা অবশ্য মিথ্যা নয়।
কিন্তু বনহুর দাইমাকে কোন হীন বা তুচ্ছ নজরে দেখেনি। বনহুর নিজেও বৃদ্ধাকে দাইমা বলে ডাকতো, অন্য সবাই তাকে দাই-ই বলতো।
বনহুর দাইমাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখলেও দাইমা কোনদিন বড় একটা বনহুরের সামনে আসতো না। অবশ্য এটা দাইমার নিজস্ব মনোভাব। বনহুর এখন সর্দার, কাজেই দাইমাও তাকে সমীহ করে চলতো।
দাইমা থেমে পড়তেই বনহুর বললো– কানাঘুষা চলছে।
হ বাবা।
সে জন্য কি নূরী অপরাধী?
জোবাইদা আবার চোখ তুলে তাকাতে বাধ্য হলো।
দাইমা কি বলবে ভাবছে বোধ হয়।
বনহুর এবার গর্জন করে উঠলো– নুরীর সঙ্গে আমার মিলামিশা যদি দোষণীয় হয়ে থাকে সে জন্য নূরী দায়ী নয়, দায়ী আমি… কারণ নূরীকে আমিই প্রশ্রয় দিয়েছি, আমিই মিশেছি তার সঙ্গে অপরাধ যদি থাকে সেজন্য আমিই অপরাধী–নূরী নয়। বিচার যদি চাও আমাকে দণ্ড দেবে, আমি তোমাদের দেওয়া শাস্তি মাথা পেতে গ্রহণ করবো। কিন্তু এর পর যদি দ্বিতীয় বার নূরী সম্বন্ধে আমার আস্তানায় কেউ কোন কুৎসিৎ-ইংগিৎ করে, আমি তাকে আস্তানা থেকে বের করে দিতে বাধ্য হবে। …
বনহুরের কথায় জোবাইদা ফোঁস করে উঠলো বিষধর সর্পের মস্তকে আঘাত করলে যেমন সে ভীষণ হয়ে উঠে। জোবাইদা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে একবার নূরীর দিকে তাকালো, তারপর দ্রুত। প্রস্থান করলো সে ঐ স্থান হতে।
দাইমাও ধীরে ধীরে কক্ষ ত্যগ করে বেরিয়ে গেলো।
জোবাইদা আর দাইমা বেরিয়ে যেতেই, নূরী ছুটে এসে বনহুরের পায়ে পড়লো। তার অশ্রু দিয়ে সিক্ত হতে লাগলো বনহুরের পা দুটি।
বনহুর ওকে তুলে নিলো গভীর স্নেহে।
নূরী বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠে কেঁদে উঠলো উচ্ছ্বসিতভাবে।
বনহুর বললো– নূরী, কেঁদো না। নিজের হাত দিয়ে ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিতে লাগলো বনহুর।
নূরী শিশুকাল মাতৃহারা, পিতাকেও সে হারিয়েছে অতি ছোট বেলায়, এ দুনিয়ায় তার আপন বলতে কেউ নেই। দস্য কালু খাঁনকেই আপন জন মনে করে জানতো নূরী কিন্তু সেও যখন চলে গেলো তখন বনহুরকেই সাথী রূপে পাশে পেয়েছিলো নূরী। তারপর থেকে বনহুরই তার ধ্যান জ্ঞান-স্বপ্ন-সাধনা।
বনহুরের মধ্যে নিজকে বিলিয়ে দিতে পারলেই শান্তি। এ দুনিয়ায় তার কিছুই যেন কামনার নয়– একমাত্র বনহুর ছাড়া। তাই আজ নূরী বনহুরের বুকে মুখ লুকিয়ে প্রাণ ভরে কেঁদে নিলো।
বনহুর আজ বাধা দিলো না নূরীকে।
কেঁদে কেঁদে এক সময় নূরী শান্ত হয়ে এলো।
বনহুর বললো- নূরী, তুমি কারো কথায় কান দিও না। আমি তোমার, চিরদিনই তোমার থাকবো–
হুর!
নূরী! আমার লক্ষ্মীটি।
*
পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আহম্মদ নাসির শাহকে জিজ্ঞাসা করলেন– আপনি কেনো চৌধুরী বাড়ির প্রাচীর টপকে ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন, বলুন? জবাব দিন?
