বনহুর নুরীর হাত ধরে বলতো– চলো আমরা দু’জন সাঁতার দি।
নূরী আর বনহুর আবার নদীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তো।
জোবাইদা আর নাসরিন তাকিয়ে থাকতো। খিলখিল করে হাসতো নাসরিন, জোবাইদা মুখ ভার করে থাকতো অভিমানে।
নূরীর দিকে বনহুরের যে একটা আকর্ষণ ছিলো এটা অনেক পূর্ব হতেই জানতো জোবাইদা আর নাসরিন। নাসরিনের মনে ব্যাপারটা তেমন দাগ কাটতোনা, যেমন করে জোবাইদার হৃদয়ে। আঘাত করতো ওদের দু’জনার মিলামিশাটা।
বনহুর জোবাইদা আর নাসরিনের সঙ্গে গভীরভাবে না মিশলেও জোবাইদার সমস্ত হৃদয় জুড়ে রেখাপাত করেছিলো বনহুর। ওকে নিয়ে জোবাইদা মনে মনে একটা কল্পনার জাল বুনতো– স্বপ্নের রঙ্গিন নেশার মতই। কিন্তু কোন দিন জোবাইদার আশা পূর্ণ হবার নয়, একথাও সে জানতো এবং জানতো বলেই তার হৃদয়ের নিভৃত কোণে মাঝে মাঝে উঁকি দিতো একটা ঈর্ষান্বিত ভাব।
জোবাইদা তার অন্তরের গোপন বাসনা কোনদিন কারো কাছে প্রকাশ করেনি বা করবার সাহসী হয়নি। বয়স বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে বনহুরের মধ্যে একটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়েছিলো যা তাকে ভাবগম্ভীর করে তুলেছিলো। শুধু জোবাইদা কেনো, আস্তানার সকলেই বনহুরের কাছে সংকুচিত হয়ে পড়তো মুখ তুলে কথা বলতে সাহসী হতোনা কেউ।
জোবাইদা সমস্ত অন্তর দিয়ে বনহুরকে কামনা করে এলেও তাকে জানাতে পারেনি কোন দিন সে মনের কথা। সে সুযোগও আসেনি কোন দিন তার ভাগ্যে।
যখনই জোবাইদা বনহুরের সান্নিধ্য লাভের আশায় উন্মুখ হয়ে উঠেছে, অন্তরের আকর্ষণ ছুটে গেছে সে, কিন্তু দেখেছে ওদের দুজনাকে বনহুর আর নূরী পাশপাশি বসে কথা বলছে বা হাসছে কিংবা দু’জন তাকিয়ে আছে দু’জনার দিকে। কতদিন দেখেছে জোবাইদা বনহুরের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে নূরী। হয়তো বা বনহুর ওর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
এ দৃশ্য জোবাইদার মনে আগুন ধরিয়ে দিতো। সকলের অজ্ঞাতে অধর দংশন করতো সে, কিন্তু কি করবে নীরবে সয়ে যেতো একটা দীর্ঘশ্বাস গোপনে ত্যাগ করে।
বনহুর আর নুরীর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা আস্তানার সবাই স্বাভাবিক মনে করলেও জোবাইদা এটা মেনে নিলোনা, সে গোপনে গুমড়ে মরতো।
বনহুর যখন তাদের সর্দার পদে অধিষ্ঠিত হলো– সে আজ দশ বছর আগের কথা। বনহুরের বয়স তখন আঠার বছর, তরুণ যুবক সে। বয়স কচি হলেও তার সুন্দর দেহে বলিষ্ঠতার ছাপ পরিস্ফুটিত হয়ে উঠেছিলো মুখমণ্ডলে পরিলক্ষিত হচ্ছিলো দৃঢ় সঙ্কল্পের ছাপ।
দস্যু কালু খাঁ তখন কার্যক্ষম না হলেও বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। বয়স বৃদ্ধি হবার সঙ্গে সঙ্গে মনেও এসেছিলো ভাটা, হঠাৎ কখন কি হয় না হয় মানুষের জীবন পদ্মপত্রে নীরের মত। কাজেই কালু খাঁ বনহুরকে যে উদ্দেশ্যে গড়ে তুলছিলো নিজের মনোমত করে, সেই উদ্দেশ্য সফল। আশায় উন্মুখ হয়ে উঠলো। একদিন সমস্ত অনুচরদের ডেকে কালু খাঁ বনহুরকে তার আসনে প্রতিষ্ঠিত করলো।
সেদিনের কথা আজও মনে আছে জোবাইদার।
সমস্ত আস্তানায় একটা আনন্দের উৎস বয়ে গিয়েছিলো– দস্যু কালু খাঁর অনুচরগণ সসম্মানে গ্রহণ করেছিলো তাদের তরুণ সর্দার দস্যু বনহুরকে।
সব জোবাইদার মনে গাঁথা হয়েছিলো থরে থরে সাজানো মুক্তার মালার মত একটি পর একটি করে।
বনহুর সর্দার হবার পর আস্তানার সবাই তাকে সর্দার বলে সম্মান করতো। শুধু সম্মানই নয়– ভয়ও করতো সবাই তাকে। দস্যু কালু খাঁ বনহুরকে সর্দারের উপযুক্ত হিসাবেই তৈরি করে নিয়েছিলো।
একদিন নয়–বনহুর দস্যু কালু খাঁকে তিনবার পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিলো অস্ত্রযুদ্ধে।
কালু খাঁ সেদিন তরবারী নিক্ষেপ করে বনহুরকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলো, আনন্দ ভরা কণ্ঠে। বলেছিলো– সাবাস!
গর্বে স্ফীত হয়ে উঠেছিলো কালু খাঁর বুক। হৃদয়ের অফুরন্ত উচ্ছ্বাস ফুটে উঠেছিলো তার দুটি চোখে।
একটু দূরেই অন্যান্যদের মধ্যে দাঁড়িয়েছিলো জোবাইদা, নাসরিন আর নূরী। সকলেরই মুখভাবে খুশি উচ্ছ্বাসে ভরপুর।
বনহুর ছুটে এসে নূরীর হাত দুটি চেপে ধরে বলেছিলো–নূরী, আমি সাফল্য লাভ করেছি।
ঠিক সেই মুহূর্তে জোবাইদার মুখ কালো হয়ে উঠেছিলো। এতোগুলি প্রাণী তারা দাঁড়িয়ে, অথচ বনহুর তার আনন্দ বার্তা জানালো। দারুণ একটা অভিমান ভরে উঠেছিলো সেদিন তার মনে। আর দাঁড়াতে পারেনি সরে গিয়েছিলো জোবাইদা সেখান থেকে।
আজ জোবাইদার মনে সেই ক্ষোভ দানা বেঁধে বেঁধে জমাট হয়ে উঠেছে। ঈর্ষা পরিণত হয়েছে হিংসায়। মনোভাব প্রকাশ না করলেও সে কিছুতেই নিজকে সচ্ছ রাখতে পারছিলোনা। আজ থেকে দশটি বছর সে নীরবে সহ্য করে এসেছে, বনহুর আর নূরীর মধ্যে গভীর একটা যোগাযোগের তীব্র জ্বালা তার হৃদয়কে দগ্ধীভূত করে দিয়েছে। জোবাইদা এখন তার অন্তরের। ব্যথায় জুড়াতে চায়, বনহুর আর নূরীকে বিচ্ছিন্ন করতে না পারলে তার যেন স্বস্তি হচ্ছে না।
তাই সে আস্তানায় গোপনে এ সব ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করে। ক্ষেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করে সবাইকে। এমন কি তাদের বৃদ্ধা দাইমাকেও এ বিষয় নিয়ে উত্তেজিত করে জোবাইদা।
সেদিন যখন জোবাইদা নূরীকে এই কথা নিয়ে বলেছিলো– নূরী, সর্দারকে বলো কলেমা পাঠ করে বিয়ে করতে, না হলে তোমাদের এ মেলামেশা শুধু পাপ নয় জঘন্য।
কিন্তু নূরী জানিয়েছিলো বনহুরের সঙ্গে তার এমন কোন অস্পৃশ্য সম্বন্ধ ঘটেনি যা তাদের জীবনকে কুলষিত করে তুলতে পারে।
