হঠাৎ বনহুর তখন আনমনা হয়ে পড়েছিলো, অন্যমনস্কভাবে কি যেন চিন্তা করেছিলো। নূরীকে বাহুর মধ্যে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলো সে, কিন্তু পরক্ষণেই নূরী অনুভব করেছিলো– বনহুরের হাত দুটি ধীরে ধীরে যেন শিথিল হয়ে এলো।
নূরীকে বাহুবন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়ে বলেছিলো– তুমিও কি সমাজ আর অনুষ্ঠান মানো নূরী?
নূরী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলো– আমি না মানলেও নিয়ম মেনে চলাই শ্রেয়।
তাই বুঝি তুমি কাল পালিয়েছিলে আমার কাছ থেকে? হাঁ। গলাটা কেঁপে গিয়েছিলো নূরীর।
বনহুর হেসে বলেছিলো– বাধা-বন্ধনহীন বনহুর কোন নিয়মের দাস নয় নূরী।
অস্ফুট ধ্বনি করে উঠেছিলো নুরী বনহুর।
না, সেই নামে ডাকো, তোমার মুখে ঐ দু’টি অক্ষরে নামটা শুনবার জন্য আমি সর্বদা ব্যাকুল থাকি নূরী। বনহুর গভীর আবেগে নূরীকে টেনে নিয়েছিলো আবার বুকের মধ্যে।
নূরীর শিরায় শিরায় বয়ে গিয়েছিলো সুষমামন্ডিত এক অনুভূতি। কিছুতেই সে নিজকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে পারেনি দস্যু বনহুরের বলিষ্ঠ বাহুবন্ধন থেকে।
সব কথাগুলি এখন নূরীর মনের মধ্যে তোলপাড় করছিলো। সমস্ত অন্তরের কানায় কানায় অনুভব করছিলো সে বনহুরের হৃদয়ের অভূতপূর্ব এক আকর্ষণ।
নূরী মন্থর পদক্ষেপে বনহুরের শয্যার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। দক্ষিণ হাতখানা রাখলো সে বনহুরের চুলে।
সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেলো বনহুরের। চোখ মেলে নূরীকে শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পাশ ফিরে শুলো, কোন কথা বললোনা।
নূরী বুঝতে পারলো বনহুর অভিমান করেছে। একটু দুষ্টামি করতে ইচ্ছা হলো তার। বললো নূরী–ভোর হতে এখনও ঢের বাকি, তুমি ঘুমাও। আমি চললাম …
নূরী বেরিয়ে যাওয়ার ভান করলো, কিন্তু লুকিয়ে পড়লো খাটের আড়ালে।
বনহুর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিছানায় উঠে বসলো। মনে করেছে বনহুর নূরী বেরিয়ে গেছে।
শয্যা ত্যাগ করবে, এমন সময় তাকিয়ে দেখলো– খাটের পাশে তার জুতোটা নেই! একটু কিছু চিন্তা করে খালি পায়েই উঠে দাঁড়ালো- কি! আলনায় তার জামাও নেই, তাকালো ওদিকে গামছা বা তোয়ালেও নেই। হঠাৎ বনহুরের দৃষ্টি গিয়ে পড়লো সম্মুখের আয়নায়। আয়নার মধ্যে দেখতে পেলো খাটের পিছন দিকে হামাগুড়ি দিয়ে বসে আছে নূরী। বনহুর এবার বুঝতে পারলো সব দুষ্টামি নূরীর। মনে মনে হাসলো সে।
বনহুর এবার বাথরুমে প্রবেশ না করে খাটেই উঠে বসলো তারপর আপন মনে বললো আমার জুতো, তোয়ালে, ব্রাস– সব প্রাতঃভ্রমণে গেছেন, ফিরে আসুন তারা ততক্ষণ আর একটু ঘুমিয়ে নিই।
বনহুর সত্যি সত্যি চাদর টেনে শুয়ে পড়লো।
ঠিক সেই মুহূর্তে কক্ষে প্রবেশ করলো জোবাইদা, সর্দারকে তখনও ঘুমাতে দেখে ডাকলো- সর্দার!
বনহুর এবার ফিরে তাকাতে বাধ্য হলো, শয্যায় উঠে বসে বললো– জোবাইদা, আমার ঘরে কি চোর প্রবেশ করছিলো?
অবাক কণ্ঠে বললো জোবাইদা চোর।
হাঁ, আমার জুতো, তোয়ালে, ব্রাস কিছুই দেখছিনা।
সর্দার!
আমার মনে হচ্ছে, চোর প্রবেশ করেছিলো।
অসম্ভব। এখানে কি করে চোর প্রবেশ করবে, সর্দার?
এই দেখো আমি চোরকে তোমার সম্মুখে হাজির করছি। বনহুর খাটের ওপাশে গিয়ে নূরীর হাত ধরে টেনে তুললো।
সঙ্গে সঙ্গে জোবাইদার মুখমণ্ডল কালো হয়ে উঠলো। এতে করে বলা সত্ত্বেও আবার। সর্দারের কক্ষে নূরী এসেছে।
বনহুর নূরীর হাত থেকে জুতো নিয়ে পায় পরলো আর তোয়ালেটা হাতে নিয়ে হেসে বললো বনহুর–এবার চোখের সাজা কি জানো?
জোবাইদা গম্ভীর কণ্ঠে বললো– সর্দার।
জোবাইদার কণ্ঠস্বরে বনহুর অবাক হয়ে তাকালো তার মুখের দিকে।
জোবাইদা বললো এবার সর্দার নূরীর স্পর্ধা দিন দিন চরমে উঠেছে। নূরীর অসংযত ব্যবহার আমাদের সকলের মনে একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে, আমরা তাকে ক্ষমা করবো না।
জোবাইদার দৃঢ় কণ্ঠে বনহুর বিস্মিত হলো।
নূরী আর জোবাইদা সমবয়সী, আস্তানায় তারা সব ব্যাপারে সমান অধিকারী। নূরী যেমন দস্যু কালু খাঁর একজন বিশ্বস্ত অনুচর কন্যা, তেমনি জোবাইদা ও নাসরিনও। বনহুরের সমবয়সী এরা না হলেও কয়েক বছরের ছোট হবে।
বনহুর যুবক। নূরী, নাসরিন, জোবাইদা–এরাও যুবতী। বনহুরের খেলার সাথী শুধু নূরী। একাই ছিলনা, নাসরিন আর জোবাইদাও সহচরী ছিলো বনহুরের অবশ্য বনহুর আর নূরীর মধ্যে যেমন গভীর একটা যোগাযোগ ছিলো ততটা ছিলোনা জোবাইদা আর নাসরিনের মধ্যে।
বনহুর আর নূরী যখন এক সঙ্গে খেলা করতো, ঘুরে বেড়াতো, বনে বনে জীবজন্তু শিকার করতো, তখন জোবাইদা আর নাসরিন তাদের সঙ্গী হতে পারতো না। দূর থেকে দেখতো আর বলতো- ওরা দু’জন বড় স্বার্থপর। রাগ করতো, খেলা করতে যেতোনা আর তাদের সঙ্গে!
কিন্তু সদা হাস্যময়ী নূরীর কাছে বেশিক্ষণ জোবাইদা আর নাসরিন অভিমান করে থাকতে পারতোনা। ওদের হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতো বনহুরের পাশে।
বনহুর তীর-ধনুক দিয়া গাছ থেকে ফল পেড়ে দিতো– যেটা চাইতো।
নূরী, জোবাইদা আর নাসরিন হাততালি দিয়ে হাসতো, বাহাদুর বলে আখ্যা দিতো ওরা বনহুরকে।
বনহুর আর ওরা তিন জন নদীতে সাঁতার দিতো– কে আগে ওপারে যেতে পারে। সবাইকে ছাড়িয়ে বনহুর ওপারে গিয়ে উঠলো, তখন নূরী, নাসরিন আর জোবাইদা নদীর মাঝখানে পড়ে রয়েছে।
কোন কোন দিন বনহুর ফিরে এসে এদের এক এক জনকে নিয়ে যেতো ওপারে।
তিন সখী মিলে হাসিতে ভরে উঠতো।
