মরিয়ম বেগম বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলেন– নিষ্ঠুর এলোই যদি তবে পরিচয় না দিয়ে চলে গেলো কেনো? ওর প্রাণ কি একটুও কাঁদেনি? ঐ হতভাগার জন্য আর তোর এ অবস্থা। পাষণ্ড তোকে..
মামীমা, সে পাষণ্ড নয়, সে নিষ্ঠুর নয় নিরুপায় হয়েই গেছে ও। জানোনা, তাকে গ্রেফতারের জন্য অহরহঃ পুলিশ সতর্ক পাহারা দিচ্ছে? পরিচয় দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা মামীমা। ডাক্তারের সহকারীর রূপ নিয়ে কৌশলে সে এসেছিলো আমাদের সন্ধান নিতে! পরিচয় দেবার সুযোগ তার হয়নি। মনিরা কথাগুলো বলতে গিয়ে ফুলে ফুলে কেঁদে উঠছিলো।
মরিয়ম বেগম সস্নেহে মনিরার পিঠে হাত রেখে বললেন মা মনিরা তোর এই অবস্থার জন্য আমিই দোষী– আমিই দায়ী। আজ যদি ওর সঙ্গে তোর বিয়ে না দিতাম তাহলে আজ তুই অন্ধ হতিস না মা, অন্ধ হতিস না…
মামীমা, এ সব তুমি বলছো? ওকে পেয়ে আমি নিজকে ফিরে পেয়েছি, মামীমা। আমার নারীত্ব সার্থক হয়েছে। অন্ধ হলেও আমার সান্তনা– আমি যার স্ত্রী সে সাধারণ মানুষ নয়, সে অসাধারণ পুরুষ। বলো বলো মামীমা, কোন নারী এমন স্বামী পেয়ে অসুখী হবে? আমার কিছু না থাক, তবু খোদা ওকে মঙ্গলে রাখুন। এই দোয়া তুমি আমাকে করো মামীমা, আমি যেন তার কোলে মাথা রেখে মরতে পারি।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করলেন সরকার সাহেব, চোখে-মুখে তার খুশির উচ্ছ্বাস, দক্ষিণ হস্তে কান্দাই পত্রিকা। আনন্দ ভরা কণ্ঠে বললেন তিনি– বেগম সাহেবা, দেখুন এই দেখুন– পত্রিকা খানা এগিয়ে দেন সরকার সাহেব বেগম সাহেবার হাতে।
মরিয়ম বেগম পত্রিকাখানা হাতে নিয়ে দৃষ্টি বুলান, তার চোখে সব ঝাপসা লাগে। চশমা ছিলনা সে খেয়াল নেই। এবার বলেন তিনি সরকার সাহেব, আপনি পড়ুন, আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা।
সরকার সাহেব পত্রিকাখানা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন– “গতকল্য সোমবার ভোর রাত্রিতে কান্দাই শহরে চৌধুরী মাহমুদ খান সাহেবের বাড়ির পিছন হইতে পুলিশ বাহিনী দস্যু বনহুর ভ্রমে যে ব্যক্তিকে গ্রেফতার করিয়াছে সে ব্যক্তি দস্যু বনহুর নহে।
রাত্রির অন্ধকারে তাহোকে পুলিশ চিনতে পারেনি।
অদ্য পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আহম্মদ ও মিঃ জাফরী হাঙ্গেরী কারাগারে গমন করিয়া বন্দীকে সনাক্ত করিয়াছেন। তাঁহারা বলিয়াছেন, যাহাকে দস্যু বনহুর বলিয়া গ্রেফতার করা হইয়াছে, সে কান্দাই শহরের কোন এক বিশিষ্ট ব্যক্তি।”
মনিরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলে উঠলো– মামীমা, আমি বলেছিলাম– সে গ্রেফতার হয়নি। গ্রেফতার সে আর হয়নি।
মরিয়ম বেগমের চোখে-মুখে আনন্দদ্যুতি ফুটে উঠলো। এতক্ষণে তিনি যেন নিশ্চিন্ত হলেন। উপরের দিকে হাত দুটি তুলে ধরে বললেন- পাক পরওয়ার দেগার, তুমি আমার মনিকে রক্ষা করেছো। তুমিই তাকে হেফাযতে রেখো।
মাতৃহৃদয়ে অভূতপূর্ব পুত্রস্নেহ জেগে উঠলো তিনি দুচোখ মুদিত করে কিছু ভাবতে লাগলেন। হয়তো তার মনের আকাশে ভেসে উঠেছে পুত্রের মুখখানা। অনাবিল একটা শান্তির ধারা তার। সমস্ত অন্তরকে প্লাবিত করে দিলো।
একটু পূর্বেই যে পুত্রকে মরিয়ম বেগম তিরস্কার করছিলেন, যার জন্য তাঁর মনে সদাসর্বদা তুষের আগুন জ্বলছিলো, এক্ষণে সেই পুত্রের কুশল-সংবাদে খুশিতে ভরে উঠলো মাতৃহৃদয়। মনির তাহলে পুনঃ গ্রেফতার হয়নি নিশ্চয়ই সে ভাল আছে– কুশলে আছে।
এখানে মাতা যখন পুত্রের মঙ্গল চিন্তায় আত্মহারা, তখন নিজ আস্তানায় দস্যু বনহুর তার দুগ্ধ-ফেননিভ শুভ্র বিছানায় গভীর নিদ্রায় মগ্ন।
কান্দাই পর্বতের কন্দরে ভূগর্ভে দস্যু বনহুরের আস্তানা।
সূর্যের আলো এখানে প্রবেশ করতে সক্ষম নয়। অহরহ বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা এখানে। কৌশলে হাওয়া প্রবেশের পথ তৈরি করে নেওয়া হয়েছে। সময় নির্ধারণের জন্য আস্তানায় বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে ঘড়ি টাঙ্গানো রয়েছে।
নূরী দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো, বেলা দশটা বেজে পঁচিশ মিনিট হয়েছে– এখনও বনহুরের নিদ্রা ভাংলোনা।
নূরী সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখে নিলো, আশেপাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে চললো বনহুরের কক্ষের দিকে।
অতি সন্তর্পণে কক্ষে প্রবেশ করে থমকে দাঁড়ালো।
শয্যায় নিদ্রামগ্ন বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো, মুগ্ধ নয়নে সে দেখতে লাগলো বনহুরকে। আজ থেকে কত বছর সে দেখে আসছে ঐ মুখখানা, কিন্তু আজও নূরীর তৃপ্তি হয়না। যত সে দেখে ততই ইচ্ছা হয় আরও তাকিয়ে থাকতে আশা যেন মেটেনা নূরীর।
নূরী এক্ষণে বনহুরকে জাগাতে এসেছিলো, কিন্তু পারলোনা। চিত্রার্পিতের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলো। স্মরণ হতে লাগলো গতকালকের বনহুরের কথাগুলো কি অন্যায় আমি করেছি, বলো–জবাব দাও নুরী?
অন্যায় তুমি করোনি, করেছি আমি।
নূরী।
হুর, তুমি আমাকে স্পর্শ করোনা।
কেনো?
না না, বলতে পারবোনা, বলতে পারবোনা সে কথা আমি।
বনহুর ওকে নিবিড়ভাবে টেনে নিয়েছিলো কাছে, গভীর আবেগে বলেছিলো সে– বলতে হবে তোমাকে।
সে কথা না শোনাই তোমার পক্ষে মঙ্গল বনহুর।
নূরী, তুমি আমার কাছে কিছু গোপন করবেনা, আমি সেই আশাই করি।
হুর, জানো তোমার–আমার মধ্যে কত বড় বাধার প্রাচীর রয়েছে?
বাধার প্রাচীর?
হাঁ, আমাদের মুসলমান ধর্মে যতক্ষণ না লোকসমাজে অনুষ্ঠান করে বিয়ে হয় ততক্ষণ…
