রহমান বললো এবার–আমি মনে করেছিলাম, নিশ্চয়ই সর্দার আজ চৌধুরীবাড়ি যাবেন। তাই এমনভাবে ডিউটি বেছে নিয়েছিলাম একটাও আসল পুলিশ সেখানে থাকতে দেইনি। ভাগ্য, সর্দারের রূপ নিয়ে কোনো বেটা আজ গিয়েছিলো, তবেই তো নিশ্চিন্ত হতে পেরেছি কতকটা। দস্যু বনহুর বলে গ্রেপ্তার করে হাঙ্গেরী কারাগারে পৌঁছে দিয়েছি। এখন পথের পুলিশ পাহারা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই সর্দার এই সুযোগে শহর থেকে সরে পড়তে পারবেন। রাখে আল্লা মারে কে। সরদারকে আল্লাহ রক্ষা করবেন।
বনহুরের কাছে এবার সব পরিস্কার হয়ে এলো। রহমান দলবল নিয়ে তাকে উদ্ধারের চেষ্টায় পুলিশ সেজেছিলো। কিন্তু কে সে যে এখন দস্যু বনহুরের রূপ নিয়ে হাঙ্গেরী কারাগারে বন্দী হয়েছে?
বনহুর আর নিজেকে আত্মগোপন করে রাখতে পারলো না। এবার সে মাথার ক্যাপ খুলে বেরিয়ে এলো ঝোপের আড়াল থেকে, গম্ভীর কণ্ঠে ডাকলো– রহমান।
এক সঙ্গে পুলিশ ড্রেস পরিহিত তার অনুচরবর্গ বিস্ময়ে চমকে উঠলো।
রহমান অস্কুট আনন্দধ্বনি করে উঠলো–সর্দার!
বনহুর তার বিশ্বস্ত অনুচরগণের মাঝখানে এসে দাঁড়ালো। উজ্জ্বল দীপ্ত তার মুখমণ্ডল, হাসিভরা মুখে বললো বনহুর রহমান, সত্যিই রাখে আল্লা মারে কে– আমি তার কাছে হাজার শুকরিয়া করছি।
পুলিশ ভ্যান রাস্তায় পড়ে রইলো। বনহুর তার দলবল নিয়ে গহন বনে প্রবেশ করে।
*
আস্তানায় ফিরে আসতেই একটা আনন্দের বন্যা বয়ে চললো অনুচরগণের মধ্যে।
সমস্ত অনুচর দস্যু বনহুরকে অভিনন্দন জানালো নতুন করে। নানা রকম উৎসব আর আনন্দ শুরু হলো আস্তানায়।– বনহুর অবাক হলো একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে। সবাই এসে বনহুরকে কুর্ণিশ জানিয়ে গেলো, কিন্তু নূরী তো এলো না!
বনহুর কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না। কেমন একটা অস্থির ভাব তাকে চঞ্চল করে তুলেছে। নূরীর সাক্ষাৎ না পাওয়ায় তার মনে এ অশান্তি।
সন্ধ্যায় একটা বড় রকম উৎসবের আয়োজন করেছে রহমান। সর্দার জয়ী হয়ে ফিরে এসেছে, এটা যে তাদের কত বড় খুশির বিষয় তারা অন্তরে অন্তরে উপলব্ধি করেছে।
বনহুর প্রতি মুহূর্তে নূরীর আগমন প্রতীক্ষা করেছে কিন্তু কোথায় নূরী। এত বড় একটা বিপদ থেকে সে উদ্ধার লাভ করে এলো, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলো সে, অথচ নূরী একটি বার এলো না তার কাছে।
বনহুর রহমানকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলো আস্তানায় ফিরে–নূরীকে দেখছিনা কেন রহমান! ও ভাল আছে তো?
জবাবে বলেছিলো রহমান সর্দার, নূরী এ কদিন সব সময় আপনার জন্য কাঁদাকাটি করেছে, এমন কি আহার নিদ্রা তার ছিলো না।
এত যার ব্যথা তার জন্য এখনও সে এলো না কেন? বনহুর নিজ বিশ্রামকক্ষে চিন্তিতভাবে পায়চারী করছিলো।
বনহুর নূরীকে না দেখলেও নূরী তাকে দেখেছিলো গোপন স্থান থেকে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলো তার হুর ফিরে এসেছে বলে। অতি কষ্টে নিজকে সামলে রেখেছিলো নূরী কোনোরকমে। লাখো লাখো শুকরিয়া করেছিলো সে খোদার দরগায়।
নূরী এবার শিশু মনিকে কোলে করে বনহুরের বিশ্রাম কক্ষের দরজায় এসে দাঁড়ালো, মনির কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো-মনি, যাও তোমার বাপি এসেছে।
মনি খুশিতে ডগমগ হলো, নূরীর কোল থেকে নেমে ছুটে গেলো কক্ষে। বনহুর মনির পদশব্দে ফিরে তাকাতেই মনি জড়িয়ে ধরলো তাকে–বাপি!
বনহুর তুলে নিলো কোলে, চুমোয় চুমোয় মনির মুখ ভরিয়ে দিয়ে বললে–তোমার আম্মি কোথায় মনি?
নূরী তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিলো, বনহুরের কথাটা কানে যেতেই অনাবিল একটা শান্তিতে ভরে উঠলো তার মন। খুশিতে উজ্জল হলো তার চোখ দুটো, কিন্তু গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দু’ফোঁটা অশ্রু।
মনি তখন বলছে বাপি, আম্মি ঐ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বনহুর তাকালো দরজার দিকে।
নূরী সেই মুহূর্তে সরে যাচ্ছিলো, বনহুর মনিকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে দ্রুত সরে এসে নূরীর দক্ষিণ হাতখানা খপ করে চেপে ধরলো।
নূরী মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ালো, কোনো কথা বললো না বা বনহুরের মুখের দিকে তাকালো না।
বনহুর নূরীর মুখখানা তার নিজের দিকে টেনে নিয়ে বললো–এ কি, তোমার চোখে আজ পানি কেন নুরী?
নূরীর ঠোঁট দু’খানা কেঁপে উঠলো শুধুমাত্র কোনো কথা সে বলতে পারলো না। বনহুর মনিকে লক্ষ্য করে বললো–যাও, খেলোগে মনি।
মনি একবার নূরী আর বনহুরের মুখের দিকে তাকিয়ে চলে গেলো।
বনহুর নূরী সহ কক্ষে প্রবেশ করলো, দক্ষিণ হাতে নূরীর চিবুক ধরে উঁচু করে বললো–কি হয়েছে তোমার বলো না?
হঠাৎ নূরী দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
বনহুর নূরীকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিয়ে বললো– কি অন্যায় আমি করেছি, বলো? জবাব দাও নূরী?
অন্যায় তুমি করোনি, করেছি আমি।
নূরী!
হুর, তুমি আমাকে স্পর্শ করো না।
কেন?
না না, বলতে পারবো না। বলতে পারবো না আমি।
আমিও কিছুতেই ছাড়বো না তোমাকে…বনহুর নূরীকে আরও নিবিড়ভাবে টেনে নেয় কাছে।
নূরী কোনো কথাই বলতে পারে না, বনহুরের প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে।
বনহুর সস্নেহে হাত বুলিয়ে দেয় নূরীর মাথায়-পিঠে।
নূরী ভুলে যায় কিছুক্ষণ পূর্বে জোবাইদার সঙ্গে তার কথাগুলো, ভুলে যায় বনহুরের সঙ্গে তার বিয়ে হয়নি। ভুলে যায় সমস্ত পৃথিবীটাকে, ভুলে যায় সে নিজের অস্তিত্ব…
২.০৩ অন্ধ মনিরা
মামীমা, আমি জানি সে বন্দী হয়নি। সে এসেছিলো আমি তার গলার আওয়াজ শুনতে পেয়েছি। মামীমা আমি শুনতে পেয়েছি তার কণ্ঠস্বর। আমার মনে যে গেঁথে রয়েছে সেই আওয়াজ। সে ছাড়া আর কেউ নয়, মামীমা…
