ডাক্তার বোসের সঙ্গে বিদায় নিলো বনহুর।
যাবার সময় ইচ্ছা করেই একটা কথা বললো–মিসেস মনিরা, আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান। যা। শুনেছেন বা জেনেছেন–সব মিথ্যা।
কে, কে আপনি? মনিরা ব্যস্তকণ্ঠে প্রশ্ন করলো।
ডাক্তার বোস বললেন–চন্দন এসো, শীঘ্র বাসায় ফিরে যেতে হবে।
আর বিলম্ব না করে পা বাড়ালেন তিনি সিঁড়ির পথে।
ডাক্তার বোস ও তাঁর সহকারী বিদায় গ্রহণের পর মনিরা বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লো। বললো সে–মামীমা, ডাক্তার ছাড়া কে এসেছিলো আমার ঘরে?
মরিয়ম বেগম মনিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন–ডাক্তার বোসের সহকারী চন্দন সেন।
অস্ফুট কণ্ঠে বললো মনিরা–মামীমা, তুমি ভুল করেছো! তুমি ভুল করেছো মামীমা। চন্দন নয় মনিরার মুখমণ্ডল দীপ্ত হয়ে উঠলো–সে বন্দী হয়নি! সে বন্দী হয়নি।
মনিরা, তুই কি পাগল হয়ে গেলি মা?
না মামীমা, আমি পাগল হইনি। সে এসেছিলো, আমি শুনতে পেয়েছি তার কণ্ঠস্বর। তুমি চোখ থাকতেও তাকে চিনতে পারলে না, মামীমা…সে বন্দী হয়নি।
হাঁ, ঐ যে আমাকে বলে গেলো–যা শুনেছি, যা জেনেছি–সব মিথ্যা।
মামীমা, তোমার ছেলে বন্দী হয়নি…
সরকার সাহেব নিজে দেখে এসেছেন আমার মনিরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে…
না না না, সরকার সাহেব ভুল দেখেছেন…সেই কণ্ঠস্বর..সেই কণ্ঠস্বর–এ কি কোনো দিন। ভুলবার, আর কেউ না বুঝলেও আমি তাকে তার কণ্ঠস্বরে চিনতে পেরেছি…
মনিরার মুখমণ্ডলে একটা আনন্দের লহরী খেলে যায়।
মরিয়ম বেগম তাকিয়ে থাকেন অবাক হয়ে।
*
পথের শেষে বনাঞ্চলের ধারে একটা নিভৃত স্থানে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো বনহুর।
ডাক্তার বোসও পথে নেমে দাঁড়ালেন।
বনহুর ডাক্তার বোসের দক্ষিণ হাতখানা মুঠায় চেপে ধরে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ কন্ঠে বললো– ডাক্তার, আমি চিরকৃতজ্ঞ। অর্থ দিয়ে আপনাকে আমি ছোট করতে চাইনে। আমার হৃদয়ের
অফুরন্ত শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন।
ডাক্তার বোসের মুখেও ফুটে উঠেছে একটা দীপ্ত উজ্জল মধুর ভাব; তিনি বলে ওঠেন–দস্যু বনহুরের বন্ধুত্ব লাভ আমার জীবনের এক পরম সম্পদ হয়ে রইলো।
ডাক্তার বোস গাড়িতে উঠে বসলেন।
ডাক্তার বোস স্বয়ং গাড়ি ড্রাইভ করে এসেছিলেন, কাজেই ড্রাইভার ছিলো না, তিনিই গাড়ি ষ্টার্ট দিলেন।
বনহুর হাত নাড়তে লাগলো।
ডাক্তার বোসের গাড়ি যতক্ষণ পথের বাঁকে অদৃশ্য না হলো, ততক্ষণ স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে রইলো বনহুর সেইদিকে।
বনহুরকে এবার আস্তানায় ফিরে যেতে হবে।
নির্জন পথ ধরে অগ্রসর হলো সে।
পথ চলছে আর ভাবছে নানা কথা। আজ পথে কোনো পাহারা নেই। কাজেই নিশ্চিন্ত মনে এগুচ্ছে সে।
দু’ধারে বন আর তার মাঝখান দিয়ে পথ।
এটা কান্দাই শহর ছেড়ে অনেক দূর। এপথে কোনো যানবাহন চলাচল করে না। ক্কচিৎ কোনো যানবাহন নিতান্ত প্রয়োজনে আসে বটে কিন্তু অত্যন্ত সাবধান সহকারে। এপথ অতি দুর্গম। বন্য হিংস্র জন্তু ও ডাকাতের ভয় আছে বলে কান্দাইবাসী এদিকে আসতে চায় না।
দস্যু বনহুর এই পথেই অগ্রসর হচ্ছিলো।
হঠাৎ একটা মোটরের শব্দ বনহুরের কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো।
মুহূর্তে পাশের ঝোপের মধ্যে আত্মগোপন করলো সে। বিশেষ করে এ পথে মোটর গাড়ি আশ্চর্য বটে। বনহুর একটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে দৃষ্টি রাখলো পথের দিকে।
হাঁ, সত্য বটে একটা গাড়ি এদিকে দ্রুত আসছে। যদিও গাড়িটা তখনও বনের আড়ালে ছিলো, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো না, তবুও শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিলো।
বনহুর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখতে লাগলো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই বনহুরের দৃষ্টিপথে গাড়িখানা প্রকাশ পেলো। বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে দেখলো–একটা পুলিশ ভ্যান দ্রুত এগিয়ে আসছে। বারো-তেরো জন সশস্ত্র পুলিশ ভ্যানে দাঁড়িয়ে আছে। আরও অবাক হলো বনহুর পুলিশ বাহিনী গাড়িতে দাঁড়িয়ে জয়ধ্বনি করছে। খুশিতে যেন আত্মহারা তারা। ব্যাপার কি, হঠাৎ পুলিশ ভ্যান এদিকেই বা আসছে কেন, আর পুলিশরা আনন্দধ্বনিই বা করছে কেন।
বনহুর হাটু গেড়ে ঝোপটার পাশে বসে রইলো চুপ করে।
পুলিশ ভ্যান দ্রুত এগিয়ে আসছে।
বনহুর ততই অবাক হচ্ছে। ভ্যানের উপরে পুলিশরা দু’হাত উপরে তুলে আনন্দভরা চিৎকার করছে।
আরও অবাক হলো বনহুর, পুলিশ ভ্যানটা এসে যখন দাঁড়িয়ে পড়লো পথের এক পাশে জঙ্গলের কিনারে।
বনহুর স্তব্ধ নিশ্বাসে দেখছে।
ভ্যান থেকে পুলিশরা নেমে পড়লো লাফ দিয়ে পথের বুকে। ভ্যানের পাশে ওরা দাঁড়ালো গোলাকার হয়ে, তারপর আর একবার জয়ধ্বনি করে উঠলো গোলাকার হয়ে, তারপর আর একবার জয়ধ্বনি করে উঠলো সবাই একসঙ্গে–জয়…সর্দারের জয়। দস্যু বনহুরের জয় দস্যু বনহুরের জয়,
বনহুর হঠাৎ যেন আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো– এ যে তারই অনুচর দল। ভাল করে লক্ষ্য করতেই বনহুর চিনতে পারলো হাবিলদারের ড্রেসে রহমানকে।
খুশি যেন তাদের ধরছে না, ব্যাপার কি?
বনহুর আর একটু কান পেতে শুনতে চেষ্টা করলো।
রহমান বলছে–সর্দার কোথায় এখনও জানি না। যতক্ষণ তিনি আমাদের মধ্যে ফিরে না। এসেছেন ততক্ষণ আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত নই।
অন্য একজন বললো-ভাগ্যিস, তুমি এই ফন্দিটা বের করেছিলে দোস্ত। পুলিশ ভ্যান আটকিয়ে পুলিশদের বন্দী করে তাদের ড্রেস পরে একেবারে পুলিশ সেজে গিয়েছিলাম।
আর একজন বলে উঠলো–পুলিশ-সুপার পর্যন্ত আমাদের চিনতে পারেননি।
