চমকে ফিরে তাকায় বনহুর মায়ের মুখের দিকে মুখে-চোখে তার রাজ্যের বিস্ময় ফুটে উঠেছে।
ডাক্তার বাসের মুখমণ্ডলেও একরাশ বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ে তিনি হতভম্বের মত প্রশ্ন করে বসেন–দস্যু বনহুর গ্রেপ্তার হয়েছে।
এবার বললেন সরকার সাহেব–হাঁ ডাক্তার বাবু একঘন্টা পূর্বে আমাদের বাড়ির পেছন বাগানবাড়ির প্রাচীরের পাশে তাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। হঠাৎ ঐ সংবাদ শুনে মনিরা অজ্ঞান হয়ে পড়েছে– তারপর থেকে আর জ্ঞান ফিরেনি।
ডাক্তার বোস সকলের অলক্ষ্যে একবার চন্দনবেশী বনহুরের মুখে তাকালেন।
বনহুর বললো এবার–ডাক্তার, আমার মনে হচ্ছে দস্যু বনহুর গ্রেপ্তার সংবাদেই মিসেস মনিরা সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছেন। এখন কি করা দরকার?
ডক্টর বোস বললেন–ব্যাপার অত্যন্ত জটিল চন্দন। আমার মনে হচ্ছে মিসেস মনিরাকে সুস্থ করে তোলার ব্যাপারে তার স্বামীকে একান্ত প্রয়োজন। নইলে একে বাঁচানো দুষ্কর হবে।
মরিয়ম বেগম ধরাগলায় বললেন–কিন্তু কোনো উপায় নেই। ডাক্তার বাবু।
ডাক্তার বাবু তখন কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।
বনহুর বলে উঠলো উপস্থিত যেভাবে মিসেস মনিরার জ্ঞান ফিরে আসে সেই চেষ্টা করুন ডাক্তার।
হাঁ, আমি উপস্থিত মনিরার জ্ঞান ফিরে আনার চেষ্টা করছি। ডাক্তার বোস একটা ইনজেকশান দিলেন এবং নাকে একটা ওষুধ ধরলেন।
ব্যাকুল আগ্রহে সবাই তাকিয়ে আছে মনিরার মুখের দিকে। প্রতিটি ব্যক্তির চোখে মুখে সেকি আকুলতা।
ডাক্তার বোস পর পর ইনজেকশান ও নাকে ওষুধ ধরতে লাগলেন।
ভোর হবার কিছু পূর্বে জ্ঞান ফিরে এলো মনিরার। জ্ঞান ফিরতেই অস্ফুট কণ্ঠে বললো– মামীমা তুমি কোথায়? হাত বাড়ালো মনিরা সামনে।
মরিয়ম বেগম পাশেই ছিলেন সরে এসে ঝুঁকে পড়লেন এই যে মা আমি।
মনিরা বেদনাভরা কণ্ঠে পুনরায় বলে উঠলো–মামীমা, ওকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে? চলে গেছে পুলিশ ওকে নিয়ে?
মরিয়ম বেগম আঁচলে অশ্রু মুছলেন।
ডাক্তার বোস গম্ভীরভাবে একবার তাকালেন সহকারী চন্দনবেশী বনহুরের মুখের দিকে।
ডাক্তার বোস এবং বনহুর বুঝতে পারলো–পুলিশ দস্যু বনহুর ভ্রমে কাউকে গ্রেপ্তার করেছে এবং সেই সংবাদ শুনেই মনিরা সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলো।
বনহুর ভ্রুকুঞ্চিত করে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগলো, কে সেই লোক যে আজ গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু কে তার মনের প্রশ্নের জবাব দেবে।
মনিরা তখন চিৎকার করে বলছে–বলো বলো, মামীমা ওকে ধরে নিয়ে চলে গেছে? আমাকে একটিবার দেখতে দিলো না আমাকে একটি বার দেখতেও দিলো না ওরা–
ডাক্তার বোস মনিরাকে শান্ত হবার জন্য গম্ভীর কণ্ঠে বললেন–এত উত্তেজিত হলে খারাপ হবে। এখন ঘুমাতে চেষ্টা করো।
না না, আমি ঘুমাতে পারবো না ডাক্তার বাবু যতক্ষণ না জানবো সে মুক্ত।
বনহুর মনিরার পাশে ঝুঁকে কিছু বলতে যাচ্ছিলো।
ডাক্তার বোস কক্ষস্থ অন্যান্য সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে বনহুর কিছু বলবার পূর্বেই বলে। উঠলেন–মনিরা, সে মুক্তই আছে। বিশ্বাস করো আমার কথা–সে মুক্ত আছে।
ডাক্তার বাবু আমাকে আপনি মিথ্যা সান্ত্বনা দিচ্ছেন আমি–আমি নিজের কানে শুনেছি– সে এখানেই আসছিলো। আমার সঙ্গে দেখা করতে–
সরকার সাহেব মরিয়ম বেগমের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। মনোভাব–কথাটা ডাক্তার বাবু জেনে ফেললেন, এটা কি উচিৎ হচ্ছে–
মরিয়ম বেগম বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, তাঁর মুখভাবও কেমন ভয়ার্ত ফ্যাকাশে হয়ে উঠেছে।
ডাক্তার বোস সুচতুর ব্যক্তি তিনি সরকার এবং মরিয়ম বেগমের মুখোভাব লক্ষ্য করে বুঝতে পারলেন তারা বেশ ঘাবড়ে গেছেন। মনে করেছেন ডাক্তার তাঁদের ভিতরের রহস্য জেনে ফেললেন। কাজেই তিনি যেন কিছুই বুঝতে পারেননি এমনি ভাব দেখিয়ে বললেন মনিরার মনের। অবস্থা এখন স্বাভাবিক নয়। এখন তাকে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে দেওয়া দরকার। আমি একটা ঘুমের ওষুধ দিচ্ছি–খেলে ঘুমাবে।
ডাক্তার বোস দেখলেন তাঁকে এবার উঠতে হয়। তাঁর সঙ্গী সম্বন্ধে এখন তিনি বেশি চিন্তিত কারণ রাজপথ বেয়ে তাকে শহরের বাইরে যেতে হবে।
ডাক্তার বোস মনিরাকে ঘুমের ওষুধ দিলেন। এবং তাকে কোনো চিন্তা করতে বারণ করলেন।
ডাক্তার বোস উঠে দাঁড়ালেন, দেয়ালঘড়িটায় তখন ভোর ছটা ঘোষণা করলো।
বনহুর বিদায়কালে ব্যাকুল আঁখি মেলে তাকালো মনিরার মুখের দিকে মনিরা তাকে এত কাছে পেয়েও চিনতে পারেনি, মায়ের চোখে চশমা নেই, হয়তো তাই তিনি চিনতে পারলেন না।
বনহুরের মুখে আজ কোনো মেকাপ করা দাড়ি গোঁফ ছিলো না তবে মাথায় ক্যাপ ছিলো একটু অন্য ধরনের আর চোখে ছিলো কালো চশমা।
মনিরা যে দৃষ্টি শক্তি হারিয়েছে এ কথা বনহুর এখনও জানে না। অসুস্থ মনিরা যখন মামীমাকে বলছিলো–মামীমা তুমি কোথায়? তখন বনহুর কিছুটা বিস্মিত হয়েছিলো বটে কিন্তু পরক্ষণেই ভেবেছিলো হঠাৎ সংজ্ঞা লাভের পর ঐ রকমই হয় বা হয়ে থাকে। কাজেই সে জানতে পারলো না তার মনিরা সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন।
মনিরা সংজ্ঞালাভের পর বনহুর কোনো কথা বলেনি। কথা বললে তার কণ্ঠস্বর নিশ্চয়ই চিনতে পারতো মনিরা। মরিয়ম বেগমের মনেও যে বনহুরের কণ্ঠস্বর একটা আলোড়ন জাগায়নি তা নয়। কিন্তু ডাক্তার বোস যাকে নিজ সহকারী বলে পরিচয় দিলেন তার সম্বন্ধে অন্য কোনো রকম চিন্তা করা অবান্তর।
