শত শত পুলিশ ফোর্স দাঁড়িয়ে রইলে। পথের ধারে দস্যু বনহুর ডাক্তার বোসের সাথে চৌধুরী বাড়িতে পৌঁছে গেলো।
চৌধুরীবাড়ির গাড়ি বারান্দায় ডাক্তার বোসের গাড়ি পৌঁছতেই সরকার সাহেব এগিয়ে। এলেন–আপনি এসে গেছেন ডাক্তার বাবু, মা মনির সংজ্ঞা এখনও ফিরে আসেনি।
ডাক্তার বোস গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালেন পরে নামলো চন্দন বেশী দস্যু বনহুর।
ডাক্তার বোস চন্দনকে লক্ষ্য করে বললেন–সরকার সাহেব এ আমার সহকারী চন্দন। রাতের ব্যাপার কিনা তাই সঙ্গে নিয়ে এলাম হঠাৎ যদি কোনো দরকার পড়ে।
খুব ভাল করেছেন ডাক্তার বাবু। চলুন আপনারা। সরকার সাহেব ব্যাগ হাতে নিলেন– চলুন।
ডাক্তার বোস ও চন্দন এগিয়ে চললো সিঁড়ি বেয়ে উপরে।
সরকার সাহেব আর দু’জন চাকর তারাও অনুসরণ করলো ডাক্তার বোস ও চন্দনকে।
ডাক্তার বোস কক্ষে প্রবেশ করতেই মরিয়ম বেগম মাথায় কাপড় টেনে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালেন, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন– ডাক্তার বাবু, মা এবার আর বাঁচবে না।
ডাক্তার বোস মনিরার পাশে এগুবার পূর্বেই চন্দন দ্রুত এগিয়ে গেলো খাটের পাশে। মনিরার ছিন্নলতার মত চেহারার দিকে তাকিয়ে নিজকে কিছুতেই সংযত রাখতে পারছিলো না সে। একি চেহারা হয়ে গেছে মনিরার! জীর্ণ হয়ে গেছে দেহ ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখমণ্ডল চোখ দুটো বসে গেছে কালো হয়ে গেছে চোখের নিচে। অতি কষ্টে নিজেকে সামলে রেখে বললো চন্দন বেশী বনহুর ডাক্তার আগে রোগী দেখুন।
ডাক্তার বোস মনিরাকে পরীক্ষা করে দেখতে লাগলেন।
মরিয়ম বেগম ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন আমার মা বাঁচবে তো ডাক্তার বাবু?
ডাক্তার বোস বেশ কিছুক্ষণ ধরে মনিরাকে পরীক্ষা করে সোজা হয়ে বসলেন, ললাটে গভীর চিন্তার ছাপ ফুটে উঠলো।
বনহুর ব্যাকুল আগ্রহে তাকাচ্ছিলো ডাক্তার বোসের মুখের দিকে কিন্তু বলতে পারছিলো না কিছু। মাঝে মাঝে সে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন মনে ভাবছিলো অপরাধী সন্তান আমি; তোমার পাশে দাঁড়িয়েও তোমাকে পরিচয় দিতে পারছিনে, আমাকে তুমি ক্ষমা করো মা।
ডাক্তার বোস যখন কিছু চিন্তা করছেন তখন মরিয়ম বেগম বলে উঠলেন–কেমন দেখলেন?
ডাক্তার বোস বললেন–অবস্থা খুব ভাল নয় অত্যন্ত উত্তেজিত বা কোনো দুশ্চিন্তার জন্য তার এমন হয়েছে। আচ্ছা বেগম সাহেবা, আমি আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করবো সঠিক। জবাব দেবেন?
বলুন ডাক্তার বাবু?
কক্ষে তখন চৌধুরীবাড়ির চেনা-অচেনা অনেকে রয়েছে। বনহুর হঠাৎ কোনো কথা বলতেও পারছে না, এদিকে মনের চলঞ্চলতা কিছুতেই যেন চেপে রাখতে পারছে না। মনিরার মাথায় হাত রাখবার জন্য মনটা তার অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু সে যে অপরাধী নিজেকে প্রকাশ করার নেই কোনো উপায়।
ডাক্তার বোস বুঝতে পারলেন–বনহুর, চৌধুরী-কন্যার অবস্থা সঙ্কটাপন্ন লক্ষ্য করে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছে। তবু তিনি মরিয়ম বেগমকে বললেন–হঠাৎ আজ এভাবে অজ্ঞান হয়ে যাবার কারণ কি? নিশ্চয়ই এমন কিছু ঘটেছে বা ঘটেছিলো যা তার মনে ভীষণ আঘাত করেছে?
মরিয়ম বেগম সন্দিগ্ধভাবে তাকালেন চন্দনের ছদ্মবেশী বনহুরের দিকে।
ডাক্তার বোস বললেন–সে অপরলোক নয়, আমার সহকারী চন্দন সেন। আপনি সমস্ত খুলে বলনু?
মরিয়ম বেগম বললেন এবার পর পর কয়েকটা দুর্ঘটনা মনিরার জীবনে ঘটেছে যা অত্যন্ত। বেদনাদায়ক। সব কথা বলা যায় না সবার কাছে।
কিন্তু আপনি ভুল করছেন বেগম সাহেবা, ডাক্তার আর উকিলের কাছে কোনো কথা গোপন করা উচিত নয়। কারণ তা করলে ডাক্তার রোগীর আসল রোগ সম্বন্ধে সঠিক চিকিৎসা করতে সক্ষম হন না। আর উকিল বা ব্যারিষ্টারের নিকটে যদি আসল কথা গোপন রেখে সাজানো কাহিনী বলেন এতে উকিল বা ব্যারিষ্টার কোনো সময় সঠিক পথে অগ্রসর হতে পারবেন না। কাজেই আপনি বুঝতে পারছেন আপনার কন্যা মনিরার জীবন এখন সঙ্কটাপন্ন। তাকে সঠিক চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলতে হবে।
মরিয়ম বেগম অনেক চিন্তা করে বললেন–আজ সকাল থেকে মনিরার মনের অবস্থা খুব খারাপ ছিলো। সমস্ত দিন কিছুই মুখে দেওয়াতে পারিনি।
কিন্তু আসল কথা আপনি চেপে যাচ্ছেন, সংক্ষেপে বলুন ব্যাপারটা?
মরিয়ম বেগম কি ভাবে আসল কথা বললেন সে কথা যে কাউকে বলবার নয়। কেন যেন বিবর্ণ হয়ে উঠলেন তিনি, ঢোক গিলে বললেন এবার ডাক্তার বাবু আমার মনিরার বিয়ে হয়েছে। সে বিবাহিত।
ডাক্তার বোস কিছুমাত্র অবাক না হয়ে বললেন–বলুন?
বিয়ের পর ওর স্বামী কোনো কারণবশতঃ দূরে বহু দূরে চলে গেছে, যেখান থেকে আসার কোনোই সম্ভাবনা নেই।
ডক্টর বোস তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন মরিয়ম বেগমের মুখের দিকে।
মরিয়ম বেগম বললেন আবার–জানেন তো ডাক্তার বাবু, মেয়েদের স্বামীই সর্বস্ব। মনিরা সেই কারণেই সদা বিষণ্ণ থাকে। লোকে জানে মনিরার এখনও বিয়ে হয়নি।
হুঁ বুঝলাম মনিরার বিয়ে আপনারা গোপনে সমাধা করেছিলেন।
হাঁ ডাক্তার বাবু।
স্বামীর বিরহ-বেদনা মেয়েদের জীবনের চরম এক পরাজয়। কথাটা বললেন ডাক্তার বোস।
মরিয়ম বেগম বললেন–আজ রাত দুটো কিংবা আড়াইটা হবে যখন আমাদের বাড়ির পাশ থেকে দস্যু বনহুরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়, ঐ সময় হঠাৎ মনিরা সংজ্ঞা হারিয়ে– বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে মরিয়ম বেগমের কণ্ঠস্বর।
