ইতিপূর্বে একে কোথাও দেখেছেন বলে মনে হলো না, কিন্তু মুখটা পরিচিত লাগছে যেন।
ডাক্তার বোস অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন যুবকের দিকে। সুন্দর বলিষ্ঠ চেহারা চোখ দুটিতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রেখা। হাত দুটিকে বুকের সঙ্গে রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে।
ডাক্তার বোস বলে উঠলেন কে আপনি?
হাসলো যুবক ম্লান এক টুকরো হাসি, তারপর বললো–আমার পরিচয় দেবো পরে। আগে বলুন–সরে এলো যুবক ডাক্তার বোসের পাশে–আগে বলুন আমার কথা রাখবেন?
যদি রাখবার মত হয় রাখবো কিন্তু আমি প্রথমে জানতে চাই আপনি কি উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন? আর কে আপনি?
শেষ প্রশ্নের জবাব পাবেন পরে কিন্তু প্রথমে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। আমি এখানে কোনো মন্দ উদ্দেশ্যে আসনি। এইমাত্র আপনি আলাপ করছিলেন যেখানে যাবার জন্য, সেখানে আমাকেও নিয়ে যেতে হবে।
চৌধুরীবাড়িতে? বললেন ডাক্তার বোস।
হাঁ, আমাকে সেখানে যেতে হবে–জরুরি।
কিন্তু আপনার পরিচয় না পাওয়া পর্যন্ত আমি আপনার কোনো কথা শুনতে রাজি নই। তাছাড়া আমি ডাক্তার, চৌধুরীবাড়ি যাবো আমি রোগী দেখতে।
ডাক্তার আপনার কর্তব্যের চেয়ে আমার কর্তব্য কোনো অংশে কম নয়, মনিরা আমার স্ত্রী।
আপনি—
আমি দস্যু বনহুর।
আপনি দস্যু বনহুর। চৌধুরী কন্যা মনিরা আপনার বিবাহিতা স্ত্রী?
হাঁ ডাক্তার। এ কথা বাইরের কেউ জানে না, আজ আপনাকে না বলে পারলাম না। ডাক্তার জানি আপনি একজন মহান ব্যক্তি। দেশ ও দশের জন্য নিজকে বিলিয়ে দিয়েছেন। নিজের জন্য আপনি কোনো সময় ভাবেন না। সত্যি আপনার মহৎ জীবনকে আমি অভিনন্দন জানাই।
বনহুর যখন কথাগুলো বলছিলো, তখন ডাক্তার বোস দু’চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছিলেন তার দিকে। ওকে প্রথম দেখেই কেমন ধোঁকা লেগেছিলো মনে। প্রথমে সন্দেহ হয়েছিলো চোর বা দুষ্টলোক বলে। কিন্তু চেহারা দেখে সন্দেহ তার সীমাবদ্ধ হয়নি। চোর বা দুষ্ট লোক হলে সে ওভাবে প্রকাশ্যে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না। মনের কোণে একবার জেগেছিলো ডাক্তার বোসের দস্যু বনহুর পলাতক আছে। তবে কি সেই? সমাধান খুঁজে পাবারপূর্বেই বনহুর নিজের পরিচয় দিয়েছিলো।
ডাক্তার বোসকে তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে বনহুর বললো আবার ডাক্তার আপনি জানেন আজ বেলা আটটায় আমি পুলিশ ভ্যান থেকে তাদের সতর্ক পাহারার বেষ্টনী ভেদ করে পালাতে সক্ষম হয়েছি। সমস্ত শহরে পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তারের জন্য ছুটাছুটি করে বেড়াচ্ছে। রেডিওতে বারবার সাবধান বাণী প্রচার করা হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও আমি আপনার বাগানে এসে আত্মগোপন করে ছিলাম, এ শহরে একমাত্র আপনার উপর আমার বিশ্বাস–আমি আপনার সাহায্য পাবো।
এতগুলো কথা বলে থামলো বনহুর।
ডক্টর বোস নিশ্চুপ বনহুরের কথাগুলো শুনে যাচ্ছিলেন এবং গভীরভাবে কি যেন চিন্তা করছিলেন। তিনি বললেন–কি সাহায্য আপনি আমার কাছে কামনা করেন?
বনহুর যেন অনেকটা আস্বস্ত হলো, বললো সে–এ শহরে প্রতিটি রাস্তায় এখন পুলিশ কড়া পাহারা দিচ্ছে। আমি আপনার এখানে অনেক চেষ্টায় এসে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছি। আমি যে মুহূর্তে আপনার বাগান বাড়ির পেছনে এসে দাঁড়িয়েছি ঠিক সেই দণ্ডেই আপনি চৌধুরীবাড়ি থেকে ফোন পেলেন। ডাক্তার, আপনি আমাকে চৌধুরী বাড়ি নিয়ে চলুন।
কি করে তা সম্ভব?
ডাক্তার, আপনার সহকারী বলে পরিচয় দেবেন। তাছাড়া আপনার গাড়ি পুলিশদের অতি পরিচিত; কোথায় কখন রোগী দেখতে যাচ্ছেন–সে কথা কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। পুলিশ বাহিনী আপনার চিহ্ন করা গাড়ি দেখলেই ছেড়ে দেবে।
কিন্তু হঠাৎ যদি—
গ্রেপ্তার হই?
হাঁ, কেউ যদি চিনে ফেলে?
সে জন্য দায়ী আপনি নন। ডাক্তার দস্যু বনহুর নিজে মরতে প্রস্তুত আছে, তবু হিতাকাঙ্ক্ষীকে সে কোনো দিন মরতে দেবে না। কিন্তু ছলনাকারী বা অবিশ্বাসীকে ক্ষমা করতে জানে না দস্যু বনহুর। ডাক্তার আপনি যদি আমার সঙ্গে কোনো রকম চাতুরি করেন তাহলে মৃত্যু আপনার অনিবার্য। শেষ অংশের কথাগুলো দাঁতে দাঁত পিষে বললো বনহুর। চোখে মুখে জেগে উঠলো তার পৌরুষ ভাব। দক্ষিণ হাত মুষ্টিবদ্ধ হলো।
ডাক্তার বোস মুগ্ধ হলেন।
দস্যু বনহুরের নামই তিনি এতদিন শুনে এসেছেন, আজ সেই দুর্ধর্ষ দস্যু তার সামনে দণ্ডায়মান। কল্পনার দৃষ্টি দিয়ে এতদিন এই দস্যু সম্বন্ধে তাঁর যে একটা মনোভাব জন্মেছিলো নিমিষে তা মুছে গেলো। দস্যু হলেও বনহুর মানুষের মত একজন মানুষ যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় উক্তি করতে কিছুমাত্র কুণ্ঠা বোধ করেনা।
ডাক্তার বোস দস্যু বনহুরের পিঠে হাত রাখলেন–আমি শপথ করলাম, আপনাকে আমি যথাসাধ্য সাহায্য করবো।
ধন্যবাদ ডাক্তার, ধন্যবাদ।
ডাক্তার বোস নিজের পরিচ্ছদ পাল্টে নিলেন, এবং দস্যু বনহুরকে তাঁরই অন্য এক সেট ড্রেস পরবার অনুমতি দিলেন।
*
ডাক্তার বোস এবং তাঁর সহকারী ডাক্তার চন্দনের বেশে দস্যু বনহুর গাড়িতে চেপে বসলো।
কান্দাইয়ের পথ ধরে ডাক্তার বোসের গাড়ি দ্রুত এগিয়ে চললো চৌধুরী বাড়ি অভিমুখে। ডাক্তার বোসের গাড়িতে হসপিটালের চিহ্ন অঙ্কিত ছিলো কাজেই পুলিশবাহিনী প্রতিটি রাস্তায় সতর্ক পাহারায় নিযুক্ত থাকলেও এ গাড়িটিকে কোনো রকম বাধা দিলো না তারা।
