মনির, আমার মনির আবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। কি করে জানলি মনিরা। কি করে জানলি তুই?
সে ঐ পথে আসছিলো, তোমার-আমার সঙ্গে দেখা করতে।
মরিয়ম বেগম দু’হাতে মাথা ধরে মেঝেতে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বললেন– আবার একি হলো আল্লাহ। উঠে দাঁড়ালেন তিনি কোথায়? কোথায় আমার মনির একনজর ওকে আমি দেখবো মরিয়ম বেগম সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে চললেন।
সরকার সাহেবেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো, তিনি দড়বড় উঠে আসছিলেন, সিঁড়ির মুখে বেগম সাহেবকে এলোমেলো উন্মদিনীর ন্যায় কাঁদতে কাঁদতে নামতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ায় তিনি কিছু বুঝতে পারছেন না।
সরকার সাহেবকে দেখেই মরিয়ম বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন–সরকার সাহেব। মনিরকে আবার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। শীঘ্র যান শীঘ্র যান দেখুন, একবার আমাকে দেখতে দিন।
মরিয়ম বেগম বাইরে যাবার জন্য পা বাড়াচ্ছিলেন সরকার তাঁর পথরোধ করে বললেন– বেগম সাহেবা আপনি অপেক্ষা করুন আমি দেখছি।
সরকার সাহেব বেরিয়ে গেলেন।
ততক্ষণে বাইরের হট্টগোল কমে এসেছে অনেক। মাঝে মাঝে পুলিশ ভ্যানের ছুটাছুটির শব্দ শোনা যাচ্ছে।
অল্পক্ষণ পর ফিরে এলেন সরকার সাহেব মুখমণ্ডল তার বিষণ্ণ মলিন।
মরিয়ম বেগম ব্যস্তকণ্ঠে বলে উঠলেন–কি হলো সরকার সাহেব, কি হলো বলুন? আমার মনির–
হাঁ, সে পেছন প্রাচীর টপকে ভিতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলো। অমনি পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছে।
হায় হায়, একি হলো সরকার সাহেব? একি হলো? কোথায় আমার মনির, আমি ওকে একনজর দেখবো।
বেগম সাহেবা তাকে গ্রেপ্তার করার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মরিয়ম বেগম দু’হাতে মুখ চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
মরিয়ম বেগমের কান্নার শব্দ গিয়ে পৌঁছলো দোতলার কক্ষে মনিরার কানে। বুঝতে পারলো, তার স্বামী পুনরায় পুলিশের হাতে বন্দী হয়েছে।
মনিরা ধপ করে পড়ে গেলো খাটের পাশে কপাল কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়লো।
ঝি-চাকরের দল সবাই ব্যস্ত হয়ে কেউ ছুটে গিয়ে মনিরাকে তুলতে চেষ্টা করলো কেউ ছুটলো নিচে–আম্মা, আম্মা আপামনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।
মরিয়ম বেগম হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের মত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন।
সরকার সাহেব আর অন্যান্য চাকর-বাকর সবাই অনুসরণ করলো বেগম সাহেবাকে।
মরিয়ম বেগম মনিরার কক্ষে প্রবেশ করে দেখলেন মনিরা সংজ্ঞাহীন পড়ে আছে মেঝেতে রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে মেঝের কার্পেট।
সরকার সাহেব তাড়াতাড়ি মনিরার মাথাটা হাতের উপর তুলে নিয়ে ব্যস্তভাবে বললেন–পানি নিয়ে এসো, পানি। মনিরা অজ্ঞান হয়ে গেছে।
কে কোন দিকে ছুটলো ঠিক নেই। কেউ পানি নিয়ে দৌড়ে এলো, কেউ ছেঁড়া কাপড় নিয়ে
মরিয়ম বেগম তো মাথা কুটে বিলাপ শুরু করলেন।
সরকার সাহেব মনিরাকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিলেন, তারপর মাথায় ও চোখে মুখে পানির ছিটা দিতে লাগলেন।
অনেক চেষ্টা করেও জ্ঞান ফিরে এলোনা। সরকার সাহেব বললেন–এখনও মনিরার জ্ঞান ফিরছে না বেগম সাহেবা–উপায়?
মরিয়ম বেগম পাগলিনীর ন্যায় কাঁদছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন–ডাক্তার ডাকুন সরকার সাহেব ডাক্তার ডাকুন। আমার সব গেছে মনিরাও যদি চলে যায় তবে কি নিয়ে বাঁচবো। শীগগীর ডাক্তার ডাকুন–
নকীব পাখা নিয়ে মনিরার মাথায় বাতাস করছিলো আর বারবার গামছায় চোখ মুছছিলো সেও বলে উঠলো–ডাক্তার ডাকেন সরকার সাহেব নইলে আপামনিকে বাঁচানো যাবে না–
হাঁ, তাই ডাকছি। সরকার সাহেব তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে ফোন করলেন।
*
গভীর রাতে কোথা থেকে ফোন এলো। ডক্টর বোস সবেমাত্র একটা কঠিন কেস অপারেশন করে ফিরে এসেছেন। আজ তাঁর হসপিটাল থেকে ফিরতে রাত দুটো বেজে গিয়েছিলো। কেবলমাত্র খেয়ে দেয়ে শয্যা গ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন তিনি, অমনি টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো সশব্দে।
ডক্টর বোস অনিচ্ছাসত্বে রিসিভার হাতে তুলে নিয়ে কানে ধরলেন–হ্যালো স্পিকিং ডক্টর বোস। কে আপনি? কোথা থেকে বলছেন? চৌধুরীবাড়ি থেকে–কি বললেন চৌধুরী কন্যা হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছে? না না, এ আমাদের কর্তব্য, আচ্ছা আসছি।
ডাক্তার বোস চিরকুমার। বয়স যদিও চল্লিশের উপর তবু তাঁকে যুবক বলে ভ্রম হয়। শক্ত মজবুত গঠন স্বাভাবিক স্বাস্থ্য–খুব মোটা বা একেবারে ছিপছিপে নয়। অলসতা বলতে তাঁর নেই, রোগীর সেবা করাই তাঁর জীবনের ব্রত। কান্দাই শহরে ডাক্তার বোস একনাগাড়ে প্রায় পাঁচ বছর আছেন। হসপিটালে সার্জনের পোষ্টে আছেন তিনি। কান্দাইয়ের অনেকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। চৌধুরীবাড়ির সঙ্গেও তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি ঘটেছে। কারণ মরিয়ম বেগমের মাঝে মাঝে এটা-ওটা অসুখ লেগেই থাকে। ডাক্তার বোসই চিকিৎসা করেন। মনিরার জন্য তাঁকে প্রায়ই চৌধুরী বাড়িতে যেতে হতো কাজেই ডাক্তার বাসের চৌধুরীবাড়ি অপরিচিত নয়।
ডাক্তার বোস ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করলেন নাইট ড্রেস পাল্টানোর জন্য কিন্তু রুমে প্রবেশ করেই বিস্মিত হলেন–তিনি কিছু পূর্বে হসপিটাল থেকে ফিরে ড্রেস পাল্টে নাইট ড্রেস পরার সময় নিজ হাতে বাগানের দিকের শাসটিা বন্ধ করেছিলেন–মাত্র অর্ধঘন্টা আগের কথা, অথচ এখন শার্সটি সম্পূর্ণ খোলা দেখতে পেলেন। ফিরে তাকাতেই তাঁর চোখ ছানাবড়া হলো, পাশের দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক।
