সমস্ত দিন আজ মনিরা পানি বিন্দু মুখে করেনি। মরিয়ম বেগম অনেক সাধ্য সাধনা করেছেন–মা, খোদা ওর সহায়। তুই এবার কিছু মুখে দে–মা।
না, মামীমা, আমি এখন মুখে কিছুই দিতে পারবো না, যতক্ষণ না জানবো–সে নিশ্চিন্ত।
সেই সংবাদ তুই কেমন করে পাবি মা?
আমার মন বলবে। আমার মন বলবে মামীমা। ঐ যে শোনো শোনো মামীমা এখন পুলিশ বাহিনী সমস্ত শহর চষে ফিরছে। দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য উপযুক্ত পুরস্কার ঘোষণা করছে।
রেডিও ঘোষণা তখন স্পীডে হচ্ছিলো।
মনিরার চোখে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। রেডিও আঁকড়ে ধরে কান পেতে শুনতে থাকে সে।
সমস্ত দিনটা কেটে গেলো।
দেয়াল ঘড়ি সন্ধ্যা সাতটা ঘোষণা করলো। মনিরা চোখে দেখতে পায় না, কানে শুনতে পায়। সন্ধ্যার প্রাকৃতিক দৃশ্য সে অন্তরে অন্তরে অনুভব করে। এই রাতের প্রতীক্ষায় মনিরা অপেক্ষা করছে।
মনিরা বললো–মামীমা দেখো তো বাইরে সূর্যের আলো নিভে গেছে কি?
হাঁ মনিরা সূর্যের আলো বিদায় নিয়েছে।
অন্ধকার হয়নি এখনও?
তেমন করে হয়নি।
মামীমা, আজ পৃথিবীটা কি অন্ধকার হতে জানে না?
মরিয়ম বেগম কোনো জবাব দেন না মনিরার কথায়। তিনি বুঝতে পারেন মনিরা কেন। বারবার আজ রাত্রির আগমন প্রতীক্ষা করছে। পুলিশের হাত থেকে মনির পালাতে সক্ষম হয়েছে বটে কিন্তু এখন সে মুক্ত নয়। শহরের কোনো নিভৃত কোণে হাতে-হাতকড়া দেহে শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় আত্মগোপন করে আছে। না জানি কত কষ্ট হচ্ছে তার। সারাটা দিন পেটে কিছু পড়েছে কিনা কে জানে।
ক্রমে রাত বেড়ে আসে।
সমস্ত পৃথিবী অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়। শহরে জ্বলে ওঠে অসংখ্য আলোর বন্যা। আজ অন্যান্য দিনের মত শহরে জনগণের ভীড় নেই। কেমন যেন নীরব থমথমে ভাব সমস্ত শহরটাকে আচ্ছন্ন। করে রেখেছে। দু’চার জন পথিক অতি সন্তর্পণে পথ চলছে মাত্র। কোন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তারা বাইরে বেরিয়েছে বলে মনে হয়না। পথ চলতে গিয়েও ভীতভাবে চারিদিকে লক্ষ্য করছে। তাদের ভয়ের একমাত্র কারণ দস্যু বনহুর।
গোটা শহরে যানবাহন চলাচল করলেও সংখ্যায় অন্যান্য দিনের চেয়ে আজ অনেক কম। নিতান্ত কাজের চাপে তারা হয়তো গন্তব্য স্থানে চলেছে।
শুধু পুলিশ ভ্যান আর পুলিশ ফোর্স।
শহরের পথে পথে আজ পুলিশ ভ্যানের ছুটাছুটি চলেছে। অগণিত অসংখ্য পুলিশ সমস্ত শহরে ছড়িয়ে আছে বিক্ষিপ্তভাবে।
সবাই সতর্কভাবে পাহারায় নিযুক্ত আছে।
পুলিশ বাহিনীর ভারী বুটের আর মাঝে মাঝে হুইসেলের তীব্র আওয়াজ কানে এসে পৌঁছুচ্ছে।
মনিরা পাথরের মূর্তির মত বসে আছে খাটের পাশে। মরিয়ম বেগম নামাজ পড়লেন নিজ ঘরে।
রাত ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে।
সমস্ত বাড়িটা এক সময় সুপ্তির কোলে ঢলে পড়লো। মরিয়ম বেগম কখন যে জায়নামাজে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন নিজেই টের পাননি।
সরকার সাহেব নিচের তলায় তাঁর নিজের বিশ্রাম কক্ষে শুয়ে নাক ডাকাচ্ছেন। আজ ক’দিন তাঁর নানা রকম ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছে। পর পর এটা না ওটা বিপদ চলেছেই চৌধুরীবাড়িতে। বিশেষ করে মনিরার বিষ পান ও তার অন্ধ হয়ে যাবার পর সব সময় বাড়িতে ডাক্তার আর ডাক্তার লেগেই রয়েছে।
সারাদিন সরকার সাহেবকেই নানাদিকে সামলিয়ে চলতে হয়, বিশ্রাম করবেন কখন।
বয়স তো তাঁর কম নয়, পঞ্চাশের উপর হবে। মজবুত গঠন তাই এখন তিনি শক্ত এবং সুস্থ আছেন অন্যান্য সঙ্গী সাথীর চেয়ে। ক’দিন পর আজ সরকার সাহেব একটু নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছেন।
মরিয়ম বেগমের অবস্থাও তাই, আজ কদিন হলো এক নাগাড়ে ঘুম জেগেছেন। ক্লান্তি আর অবসাদে দেহমন সবই ভেঙে পড়েছে, তিনি নামাজের বিছানায় একটু গড়িয়ে নিতে গিয়ে গভীর নিদ্রায় মগ্ন হয়েছেন।
দেয়াল ঘড়িটা রাত দুটো ঘোষণা করলো। মনিরা তখনও জেগে বসে আছে চিত্রার্পিতের মত খাটের এক পাশে।
মনিরার বুকের মধ্যে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে যাচ্ছে না জানি ভোরের সংবাদ তার কানে কি সংবাদ পৌঁছাবে।
মনিরা কিছুতেই আজ নিজকে সুস্থির করতে পারছে না। মনের মধ্যেও অন্ধকার, বাইরেও অন্ধকার দুনিয়াটাই বুঝি সম্পূর্ণ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। একটু আলো একটু আলোর জন্য লালায়িত হয়ে উঠলো মনিরা।
ঠিক এমন সময় নিচে শোনা গেলো পুলিশের বিক্ষিপ্ত বাঁশির শব্দ সঙ্গে সঙ্গে একটা শোর হাঙ্গামা।
চমকে উঠলো মনিরা, তাড়াতাড়ি উঠিপড়ি করে এগিয়ে গেলো পেছনের জানালার পাশে, দেখতে সে কিছু পাচ্ছেনা তবু বুঝতে পারলো।
পুলিশের বাঁশির শব্দ আর লোকজনের কলকণ্ঠ শুনে মনিরা সংজ্ঞা হারার মত হয়ে পড়লো। নিশ্চয়ই তার স্বামী এ পথে আসছিলো তার সঙ্গে দেখা করতে। হায় কি হলো মনিরা আর্তনাদ করে ডাকলো মামীমা, মামীমা সরকার সাহেব সরকার সাহেব—
মনিরার আর্তকণ্ঠে মরিয়ম বেগমের ঘুম ছুটে গেলো। শুধু তারই নয় মনিরার কণ্ঠস্বরে চাকর বাকরের দল তারাও জেগে উঠলো।
মরিয়ম বেগম ছুটে গেলেন মনিরার কক্ষে।
ততক্ষণে চাকর বাকরের দলও যে যেদিক থেকে পারে ছুটে এলো। ব্যাপার কিছু বুঝতে না পেরে সবাই হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
মরিয়ম বেগম এগিয়ে গিয়ে মনিরাকে চেপে ধরলেন–কি হয়েছে মনিরা কি হয়েছে? ব্যস্ত কণ্ঠস্বর তাঁর।
মনিরা কাঁদো কাঁদো গলায় বললো–শুনতে পাচ্ছো না মামীমা, ওকে আবার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
