ধন্যবাদ ডক্টর। জুলেখার কণ্ঠস্বর।
পরক্ষণেই জুতোর শব্দ শোনা যায়। বোধ হয় ডক্টর হামিদ জুলেখার নিকট বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসছেন।
তাড়াতাড়ি আড়ালে গা ঢাকা দিলো নাসির শাহ। জুলেখার বান্ধবী মনিরা অন্ধ হয়েছে। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো সে–মনিরা–সেই মনিরা একদিন যে মনিরাকে পাবার জন্য নাসির শাহ্ উন্মাদ হয়ে উঠেছিলো। মনিরাকে হাতের মুঠোয় পাওয়া তার পক্ষে কঠিন ছিলোনা কিছু, কিন্তু জুলেখাই সব পণ্ড করে দিয়েছে। মুখের শিকার হাতছাড়া করে দিয়েছে। বোন হলে কি হবে নাসির শাহ্ সেই থেকে জুলেখাকে কঠিন চোখে দেখতো। অবশ্য জুলেখাকে বুঝতে দিতো না সে কিছু কারণ জুলেখা তাদের সবার ছোট বোন।
নাসির শাহ জুলেখার কাছে ভিজে বিড়াল হয়ে থাকলেও জুলেখা চালাক মেয়ে ভাইয়ের মনের খবর সে জানতো। নিজ সহোদর হলে কি হবে, বিশ্বাস করতো না সে কোনো সময় তাকে।
নাসির শাহ মনিরাকে বিয়ে করার প্রস্তাবও করেছিলো জুলেখার কাছে। জুলেখা ক্রুদ্ধকণ্ঠে তিরস্কার করেছিলো তোমার মত লম্পটের হাতে মনিরার মত রত্ন শোভা পাবে না।
এরপর নাসির শাহ আর কোনদিন বোন জুলেখাকে এ সম্বন্ধে বলেনি। ভিতরে ভিতরে সে সব সময় জুলেখার প্রতি বিষাক্ত মনোভাব পোষণ করে এসেছে।
জুলেখার কথায় হতাশ হয়নি সেদিন নাসির শাহ। হতাশ হয়েছিলো যেদিন শুনেছিলো দস্যু বনহুরের সঙ্গে মনিরার সম্বন্ধ আছে।
নাসির শাহ যেমন চরিত্রহীন কুৎসিতমনা মানুষ, ভীতুও ছিলো তেমনি। দস্যু বনহুরকে চোখে কোনোদিন না দেখলেও ভয় করতো তাকে ভীষণ। অবশ্য বেশ কিছুদিন আগের ব্যাপার এসব।
এখন আর নাসির শাহ আগের সেই দুর্বলমনা নাসির নেই। আগের চেয়ে এখন তার দুরন্তপনা অনেক বেড়ে গেছে। অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনই তার পেশা আর নেশা মদ পান ও নারী।
সন্ধ্যার পর তার গোপন আস্তানায় মদ আর নারীর আমদানী চলে পুরো দমে।
নাসির শাহ্ তার শয়তান সহচর মদ আর নারীর মধ্যে ডুবে গেলো ধীরে ধীরে। মনিরার প্রতি আকর্ষণ কমে এলো অনেক শিয়াল ও দ্রাক্ষাফলের মতই হলো মনিরা আর তার সম্বন্ধ।
হঠাৎ আজ সেই মনিরার কথা তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করায় নতুন করে স্মরণ হলো মনিরাকে।
একটু পূর্বেই রেডিও ঘোষণা শুনেছে–দস্যু বনহুর পলাতক। নিশ্চয়ই সে এখন নিজের জীবন নিয়ে ত্রাহি ত্রাহি করছে। মনিরার সঙ্গে তার আর কোনো সম্বন্ধ নেই।
নাসির শাহর মাথায় দুষ্ট বুদ্ধির প্যাঁচ খেলে যায়। মনিরা এখন অন্ধ। সে গোপনে সন্ধান নিয়ে জেনেছিলো দস্যু বনহুর নাকি রাত্রিকালে মনিরার সঙ্গে দেখা করে থাকে মনিরার কক্ষে।
কথাটা সে হাওয়ায় শোনার মতই শুনেছিলো একদিন, আজ সেই কথাই তাকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। জুলেখার চেম্বারে প্রবেশ না করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সে তার গোপন আড্ডা অভিমুখে।
সঙ্গীদের নিয়ে চলে তার আলোচনা।
মনিরাকে এখন কৌশলে চুরি করে আনা অতি সহজ ব্যাপার। দৃষ্টিশক্তিহীন মনিরাকে বনহুরের রূপ ধরে বাড়ির বাইরে আনতে হবে অদূরে অপেক্ষা করবে আমাদের গাড়ি ব্যাস তারপর আর মনিরার সন্ধান কে পায় দেখা যাবে।
নাসির শাহ্ যখন চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করে মনিরাকে চুরি করে নিয়ে ফিরে আসবে তখন যেন তারদলবল সবাই সাবধানে প্রতীক্ষা করে।
নাসির শাহ্ যেমন জঘন্য মনোবৃত্তির মানুষ ছিলো তেমন শয়তান ছিলো তার অনুচরবর্গ। নাসির শাহর ইংগিতে তারা যে কোনো কুকর্ম করতে কুণ্ঠিত হতো না।
নাসির শাহর মুখে নতুন একটা কুযুক্তি শুনে খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠলো তারা। কিভাবে মনিরাকে চুরি করা যায় এ নিয়ে নানাভাবে চললো তাদের মধ্যে আলোচনা।
শুধু আলাপ আলোচনা নিয়ে মশগুল থাকবার বান্দা নয় নাসির শাহর অনুচর ও দলবল। তারা রীতিমত মদ পান এবং নেশাও করলো।
নানা রকম ফুর্তি গান বাজনায় গোটা বিকেলটা কাটিয়ে দিলো।
নাসির শাহর একজন অন্তরঙ্গ বন্ধু বললো–কাজটা কিন্তু যত সহজ মনে করছো ঠিক। ততখানি সহজ নয়।
কেন? বললো নাসির শাহ।
সুচতুর বন্ধু বললো–চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করবে কি করে?
নাসির শাহ হেসে বললো–সে চিন্তা করেই কাজে নামছি বন্ধু।
কিভাবে কার্য সিদ্ধি করবে মনস্থ করেছো চাঁদ?
নাসির শাহর সাঙ্গপাঙ্গ আর বন্ধুর দল কেউ কেউ তাকে ঠাট্টা করে চাঁদ বলে ডাকতো।
নাসির শাহ বন্ধুদের কথায় খুশি হতো কি রাগ করতো ঠিক বোঝা যেতো না। নিশ্চুপই থাকতো তখন সে।
কিছুক্ষণ মৌন থেকে বললো নাসির শাহ–সব আমি মনের মধ্যে ঠিক করে রেখেছি বন্ধু। নাসির শাহ কাঁচা লোক নয়, বুঝেছো? একটা কুৎসিত হাসির রেখা তার মুখে ফুটে উঠে বিলীন হয়ে যায়।
ওদিকে জুলেখা যখন বান্ধবীর মঙ্গল চিন্তায় বিভোর এদিকে তার ভাই নাসির শাহ তখন কিভাবে তাকে নষ্ট চরিত্রা করবে এবং তাকে কিভাবে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসবে সেই চিন্তায় মগ্ন। রাত বেড়ে আসে নাসির শাহর গুপ্ত পরামর্শ শেষ হয়। সবাই উঠে পড়ে।
কিন্তু মদের নেশায় সবাই ঢুলু ঢুলু।
*
মনিরা আজ এক দণ্ডের জন্যও রেডিওর সুইচ অফ করেনি। রেডিও আঁকড়ে ধরে বসে আছে সে। রেডিওই আজ যে তার এক মাত্র আপন জন, অতি ঘনিষ্ঠ এবং পরম বন্ধু। বুকের মধ্যে যেন একটা ঝড়ের তাণ্ডব চলেছে। না জানি কোন মুহূর্তে রেডিও ঘোষণা করবে দস্যু বনহুর গ্রেপ্তার হয়েছে। এই সংবাদ যেন তাকে শুনতে না হয়, মনিরা খোদার কাছে বারবার প্রার্থনা করছে।
