বেগম সাহেবার এতক্ষণে যেন হুশ হলো তাই তো সেই যে সাত সকালে একটু নাস্তা আর এক কাপ চা খেয়ে বেরিয়েছিলেন। বাইরের জিনিস খাবার অভ্যাসও নেই তাঁর। বেগম সাহেবা হাঁকলেন–বাবুর্চি, টেবিলে সাহেবের খাবার দাও।
সুফিয়া পিতার কোটটা গুছিয়ে রাখতে রাখতে বললো আম্মা, তুমি যাও একটু দেখোগে। আব্বার খাবারগুলো বাবুর্চিকে বলো যেন গরম করে দেয়।
তুই কোটটা আলমারীতে রেখে দে সুফিয়া। কথাটা বলে উঠে দাঁড়ালেন বেগম সাহেবা।
মিঃ কাওসার আহমদ বললেন–সাবধানে রেখো মা সুফিয়া, কোটের পকেটেই চাবি দুটো আছে কিন্তু।
আমাকে অত করে বুঝিয়ে বলতে হবে না আব্বা। তুমি খেতে যাও, আমি সব ঠিক করে রাখছি।
পুলিশ সুপার এবং সুপার গৃহিণী কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
সুফিয়ার চোখ দুটো জ্বলে উঠলো খুশিতে এমনভাবে সুযোগ এসে যাবে হঠাৎ তার হাতের কাছে ধারণাও করতে পারেনি সে। ভেবেছিলো অফিসে গিয়ে কৌশলে চাবি সংগ্রহ করবে কিন্তু তাকে এত কিছু করতে হলো না।
ডাইনিং রুম থেকে ভেসে আসছে পিতার কণ্ঠস্বর খেতে খেতে মায়ের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করছেন তিনি। এটাই সুবর্ণ সুযোগ। সুফিয়া এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে আলমারীতে উঠিয়ে রাখা কোটের পকেট থেকে চাবি দুটো দ্রুত হস্তে বের করে নেয়। তারপর লঘু পদক্ষেপে ফিরে আসে নিজের কামরায়। সুফিয়ার পড়বার ঘরের দরজা ছিলো তার শোবার ঘরের মধ্য দিয়ে সুফিয়া তালা খুলে প্রবেশ করে চাপা কণ্ঠে ডাকলো–ভাইয়া।
বনহুর একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলো। অবশ্য যতক্ষণ পুলিশ সুপার, বেগম সাহেবা ও সুফিয়ার কথাবার্তা চলছিলো, ততক্ষণ কান পেতে সব শুনছিলো সে।
পুলিশ সুপার খেতে গেলেন তারপর সুফিয়া বেশ কিছুক্ষণ নীরব রয়েছে। ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো বনহুর, তাই একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলো সে। সুফিয়ার কণ্ঠস্বরে উঠে বসে সুফিয়া।
ভাইয়া, আমি চাবি এনেছি–কই দেখি হাতটা সুফিয়া চট পটু বনহুরের হাতের হাতকড়া খুলে ফেললো, তারপর দেহের শিকলের তালা খুলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
বনহুর কৃতজ্ঞতাপূর্ণ কণ্ঠে বললো বোন সুফিয়া, তোমাকে কি বলে আমার অন্তরের আন্তরিকতা জানাবো ভেবে পাচ্ছিনে।
ভাইয়া, আপনাকে মুক্ত করতে পেরেছি এর চেয়ে আনন্দ আমার আর কিছু নেই।
দস্যু বনহুরের চোখ দুটো অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে এসেছিলো, বললো –সুফিয়া চিরদিন তোমার কথা স্মরণ থাকবে আমার।
সুফিয়া হাতকড়া আর লৌহশিকলটা অতি সাবধানে লুকিয়ে রাখলে নিজের বইয়ের সেলফের পেছনে। তারপর সে চাবি দুটো নিয়ে ফিরে গেলো পিতার কক্ষে। আলমারী খুলে চাবি দুটো কোটের পকেটে রেখে স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করলো।
এমন সময় খাওয়া শেষ করে এলেন পুলিশ সুপার এবং বেগম সাহেবা।
সামান্য একটু বিশ্রাম করার পর এক্ষুণি আবার তাঁকে বেরুতে হবে।
সোফায় বসে সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করলেন পুলিশ সুপার।
বেগম সাহেবা আর একটা সোফায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে বললেন–দেখো সাবধানে যেও, দস্যু বনহুর না কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসে। এমন জাদরেল দস্যু কোনোদিন দেখিনি বাবা।
পুলিশ জীবনেই এমন দস্যু দেখিনি, আজ আঠারো বছর আমার চাকরী হলো!
পাশের ঘরে যখন পুলিশ সুপার এবং পুলিশ সুপার গৃহিণী দস্যু বনহুরকে নিয়ে আলাপ আলোচনায় রত তখন সুফিয়ার পড়ার ঘরে দস্যু বনহুর পায়চারী করে চলেছে। সন্ধ্যা অবধি তাকে এই কক্ষে প্রতীক্ষা করতে হবে।
খোদার কাছে লাখো শুকরিয়া করলো বনহুর কেমন করে তিনি তাকে বাঁচিয়ে নিলেন। আর অন্তরের সমস্ত অনুভূতি দিয়ে আন্তরিক মোবারকবাদ জানালো সে সমস্ত দেশবাসীকে। আজ তাদের হৃদয়ের নিবিড় টানে তারা ছুটে গিয়েছিলো তাকে এক নজর দেখবে বলে। বিপুল জনতার কঠিন চাপে পুলিশ বাহিনী অতিষ্ঠ হয়ে না উঠলে আজ তার মুক্তির অন্য কোনো পথ ছিলো না। শত শত নাগরিকের আগ্রহভরা ব্যাকুল আঁখি ভেসে ওঠে বনহুরের চোখের সামনে। কিন্তু আনেকেই তাকে দেখতে পায়নি, সামান্য কিছু সংখ্যক জনতা তাকে দেখতে পেরেছে মাত্র। যারা তাকে দেখতে পায়নি তাদের জন্য ব্যথা অনুভব করে সে মনের কোণে।
অল্পক্ষণ পর পুলিশ সুপার বেরিয়ে গেলেন, অনেক কাজ এখনও তাঁর বাকি। দস্যু বনহুরকে পুনরায় গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত পুলিশ অফিসারদের স্বস্তি নেই। সমস্ত শহরময় একটা ভীতিকর ভাব বিরাজ করছে। রেডিও বারবার সাবধান বাণী ঘোষণা করছে। দস্যু বনহুর শহরের কোনো গোপন স্থানে আত্মগোপন করে আছে। তাকে যে কেহ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হলে এবং পুলিশের নিকটে ধরিয়ে দিতে পারলে তাকে উপযুক্ত পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে।
*
নাসির শাহ কোনো কাজে বোন জুলেখার চেম্বারে প্রবেশ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো।
জুলেখা তার সহপাঠি ডক্টর হামিদকে বলছে–আমি অনেক চিন্তা করে দেখলাম মনিরার চোখে দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।
হাঁ মিস জুলেখা আপনার নিকটে আপনার বান্ধবী সম্বন্ধে সব শোনার পর আমিও অনেক বই ঘেটেছি তাতে বোঝা গেলো আপনার বান্ধবীর দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
ডক্টর, আপনি যদি আমাকে সাহায্য করেন তাহলে হয়তো বেচারী মনিরার জীবন ব্যর্থ নাও হতে পারে।
ডক্টর হামিদের কণ্ঠস্বর–আপনি আমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারেন, আমি আপনার বান্ধবীর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করবো।
