দস্যু বনহুর ফসকে গেলে তাকে পাকড়াও করা অত সহজ নয় মা, অত সহজ নয়।
সুফিয়ার পড়বার ঘরের পাশেই ছিলো সুপারের বিশ্রামকক্ষ। পিতা পুত্রীর আলাপ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলো বনহুর। সে চুপচাপ দেয়ালে ঠেস দিয়ে শুনছিলো পুলিশ সুপার ও সুফিয়ার কথা বার্তা।
পিতার কথায় বললো সুফিয়া–আব্বা, দস্যু বনহুর কি করে পালালো? শুনেছিলাম অগণিত পুলিশ ফোর্স পরিবেষ্টিত অবস্থায় তাকে জম্বুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হবে?
মিঃ কাওসার আহমদ সোফায় হতাশভাবে বসে পড়ে বললেন–অগণিত পুলিশ ফোর্সের বেষ্টনী ভেদ করেই সে পালিয়েছে।
আশ্চর্য তো!
শুধু আশ্চর্যই নয় মা, কল্পনার অতীত।
আব্বা, তোমরা তো জানোই সে দুর্ধর্ষ। বেশ করে হাতে হাতকড়া পরিয়ে মজবুত করে বেঁধে ভ্যানে তুললেই পারতে?
সে কথা তোকে বলতে হবে মা। দক্ষ পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আহমদ তাকে গ্রেপ্তার করেছিলেন। তিনি স্বয়ং নিজের হেফাজতে পুলিশ পরিবেষ্টিত করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। দস্যু বনহুরের হাতে শুধু হাতকড়াই নয় তার সমস্ত শরীর ছিলো লৌহশিকল দিয়ে তালাবদ্ধ।
সুফিয়ার দু’চোখ ছানাবড়া। করে বলে–হাতে হাতকড়া শরীরে শিকল বাঁধা তবু কি করে পালালো দস্যু বনহুর?
জনতা। জনতাই তাকে পালাবার সুযোগ এনে দিয়েছে। দস্যু বনহুরকে যে পথ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো সে পথের দু’পাশে জনতা তাকে দেখবার জন্য এত ভীড় করেছিলো, সে কথা তোকে বলে বুঝাতে পারবো না মা।
এমন সময় সেই কক্ষে প্রবেশ করেন সুপার গৃহিনী। স্বামীকে লক্ষ্য করে বলেন–শুনলাম দস্যু বনহুর নাকি ভেগেছে।
হাঁ।
তা ভাগবে না। তোমাদের যেমন বুদ্ধি হাতে হাতকড়া, পায়ে বেড়িয়া পরিয়ে দিয়েছিলে?
হাতে হাতকড়া পরানো ছিলো কিন্তু–সত্যি বলেছো বেগম, পায়ে বেড়ি না পরিয়ে মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছিলো।
পাশের ঘরে বনহুরের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।
সুফিয়ার কোনো কথা শোনা যাচ্ছে না। সে বুঝি চাবির চিন্তায় আছে।
পুনরায় শোনা গেলো পুলিশ সুপারের গলা–যে কারণে আমি দস্যু বনহুরের হাতকড়া ও তার শরীরে বাঁধা শিকলের তালার চাবি নিজের কাছে রেখেছিলাম।
সুফিয়ার আনন্দসূচক কণ্ঠস্বর–সত্যি আব্বা, চাবি তোমার কাছেই ছিলো। দস্যু বনহুর
তাহলে চাবিবদ্ধ অবস্থায় কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাক নিশ্চিন্ত হলাম, চাবি তাহলে সে আর পাচ্ছে। না। কোথায় রেখেছো আব্বা?
এই যে আমার পকেটেই রেখেছিলাম মা। মিঃ কাওসার আহমদ চাবি দুটো বের করে কন্যা আর স্ত্রীকে দেখালেন ভেবেছিলাম জম্বুর কারাগারে দস্যুর মৃতদেহ থেকে হাতকড়া আর শিকল খুলবার সময় এ দুটো চাবি কাজে লাগবে।
সুফিয়ার আর কোনো কথা শোনা যায় না।
বনহুরের চোখ দুটো দীপ্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সুফিয়ার বাসনা তাহলে পূর্ণ হবে। এক্ষণে সুফিয়া পাশে থাকলে সে ওর হাত দুটো চেপে ধরে অন্তরের স্নেহ জানাতো।
শোনা গেলো বেগমের গলা দস্যুটা মরলে তবু দেশে শান্তি ফিরে আসতো।
সুফিয়ার চোখ দুটো মায়ের কথায় অশ্রুসজল হলো, বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বললো–ছি আম্মা, দস্যু তোমার কি অন্যায় করেছে? বরং সে তোমাদের যে উপকার করেছে তা জীবনে পরিশোধ করতে পারবে না।
মিসেস সুপার বলে ওঠেন–তুই জানিস নে সুফিয়া কেন সে তোকে ওভাবে উদ্ধার করে এনেছিলো। উদ্দেশ্য ছিলো প্রচুর অর্থ পাবে। তোর আব্বা তাকে পুরস্কৃত করবেন–
আম্মা, দস্যু হলেও তার হৃদয় অত নীচু নয়। অর্থের লালসা তার মোটেই নেই, তাছাড়া পুরস্কার বা প্রতিদান সে কারও কাছে চায় না।
সুফিয়া একটা দস্যুর হয়ে কথা বলা উচিত নয়। তোমার মা যা বলছেন সত্য। নিশ্চয়ই দস্যু বনহুরের কোনো উদ্দেশ্য ছিলো–
আব্বা, তুমিও ভুল করছে।
সুফিয়া! রাগতঃ কণ্ঠস্বর পুলিশ সুপারের।
বনহুর পাশের ঘরে গম্ভীর হয়ে পড়ে সুফিয়ার ছেলে মানুষি কথাগুলো শুনে চিন্তিত হয় সে। ভাবে–কি দরকার এই মুহূর্তে সেই পুরোনো কথাগুলো তোলার বড় বোকামি হচ্ছে সুফিয়ার। এক্ষণে বনহুর সম্বন্ধে তারও নিন্দা করা উচিত ছিলো।
পরক্ষণেই শুনতে পেলো সুফিয়ার কণ্ঠ–তোমাদের কোনোরকম কৃতজ্ঞতাবোধ নেই। দস্যু হলেও সে মানুষ, অপরাধী সে হতে পারে কিন্তু সে আমার জীবন রক্ষাকারী–
সুযোগ পেলে সে-ই এখন ভক্ষক হয়ে দাঁড়াবে। বললেন বেগম সাহেবা।
সুফিয়া, কিছু বলতে যাচ্ছিলো, ঠিক সেই মুহূর্তে সুফিয়ার পড়ার ঘরে একটা কিছুর শব্দ হয়।
মিঃ কাওসার আহমদ বললেন–কিসের শব্দ হলো?
সুফিয়া তাড়াতাড়ি বললো–আমি দেখে আসি আব্বা।
বেগম সাহেবা বলে উঠলেন–ভালভাবে দেখো সুফিয়া। শেষে দস্যুটা না আমাদের বাসায় এসে লুকিয়ে পড়ে।
হাসলেন পুলিশ-সুপার–হ্যাঁসালে বেগম, আমার বাসায় আসবে দস্যু বনহুর এমন সাহস তার হবে–
সুফিয়া ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে।
একটু পরে ফিরে আসে সুফিয়া হেসে বলে–মিনি বিড়ালটা আমার বইয়ের সেলফ থেকে নিচে লাফিয়ে পড়েছে, তারই শব্দ হলো।
পুলিশ সুপার বললেন–বোধ হয় ইঁদুর দেখেছে তোমার মিনি। হাঁ, আব্বা ঠিক বলেছো। মিনি ইঁদুর ধরবে বলে ঐ ঘরে ঢুকেছে। আমি তালা আটকে রেখেছি– তাড়াহুড়ো করে বললো সুফিয়া এবার আলু দস্যুকে খুঁজতে খুঁজতে সব ভুলে গেছো। তোমার খাবার সময় চলে গেছে কখন। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে সে–এখন বেলা চারটে, খেয়াল আছে?
