কিন্তু সর্দার তেমন করে না মিশলেও নূরী তো সর্দারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করে। এটাই অনেকের মনে দ্বন্দ্ব জাগিয়েছিলো। তবে প্রকাশ্যে কেউ কোনো কথা বলতে সাহসী হতো না।
সবাই ব্যাপারটা নিয়ে তেমন করে না ভাবলেও জোবাইদা চুপ থাকতে পারলো না। আজ সে বলেই বসলো নূরীকে সর্দারের সঙ্গে এভাবে মেশা তার অন্যায় শুধু নয়–পাপ।
নূরী তীব্রকণ্ঠে বললো–না, পাপ নয়। হুরের সঙ্গে বিয়ে আমার হয়ে গেছে অনেকদিন।
হাসলো জোবাইদা –এটা কল্পনার যুগ নয় নূরী। বনে বাস করলেও আমরা পৃথিবীর মানুষ। অসংযত ব্যাপার আমরা মেনে নিতে পারিনে। নূরী রাগতঃ গলায় বলে উঠলো– জোবাইদা, আমার মুখের উপর এতবড় কথা বলতে পারলি?
সব কিছুরই সীমা আছে, সর্দারকে বলো–তোমাদের বিয়ে হওয়া একান্ত প্রয়োজন। নূরী এবার আপনা আপনি নরম হয়ে এলো, ধীরে ধীরে জোবাইদার পাশে এসে দাঁড়ালো –জোবাইদা, এ কথা আমি অনেক দিন ভেবেছি, কিন্তু ওকে বলতে পারিনি। তাছাড়া ওর দিক থেকেও আমি তেমন কোনো সাড়া পাইনি কোনদিন। জোবাইদা, তুই বিশ্বাস কর হুরের মত মানুষ আর দ্বিতীয় জন নেই। তুই আমার শিশুকালের সাথী, সব তুই জানিস। তোকে বলতে আমার কোনো দ্বিধা নেই, বনহুরের সঙ্গে আমার অস্পৃশ্য কোনো কিছু ঘটেনি আজও। জোবাইদা আমি অনেক সময় নিজকে সংযত রাখতে পারিনি, নিজকে সঁপে দিয়েছি বনহুরের বাহুর মধ্যে কিন্তু তোকে কি করে বোঝাবো আমি–সে কত পবিত্র, কত নির্মল নিষ্পাপ
নূরীর কথাগুলো এক একটা যেন জোবাইদার হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছিলো। চোখে-মুখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে তাকিয়েছিলো সে নূরীর মুখের দিকে। নিশ্বাস পর্যন্ত পড়ছিলো কিনা বোঝা যাচ্ছিলো না।
আবার বললো নূরী মানুষ কোনোদিন ফেরেস্তা নয়। হুরও পুরুষ মানুষ আমি তার মধ্যে পুরুষোচিত মনোভাব জেগে উঠতে দেখেছি, কিন্তু সে নিজকে তখন কঠিনভাবে সংযত করে রেখেছে। কোনোদিন দূর্বল হয়নি আমার কাছে পাষাণ দেবতার মতই সে অবিচার করেছে আমার উপর। জেবাইদা হুরের এই হৃদয়হীন আচারণে আমি ক্ষুদ্ধ হয়েছি কিন্তু পারিনি ওকে কিছু বলতে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি সব রাগ অভিমান দুঃখ বেদনা ভুলে গেছি। জোবাইদা আমি কি করে বলবো তোকে আমার মনের দুঃখ ব্যথার কথা।
জোবাইদা নূরীর হাত দু’খানা মুঠায় চেপে ধরলো আমাকে মাফ করে দাও নূরী। না জেনে আমি তোমাকে রূঢ় কথা বলেছি।
*
সুফিয়া নিজের পড়ার ঘরে বইয়ের সেলফের পেছনে কম্বল আর চাদর বিছিয়ে সুন্দর করে বিছানা তৈরি করে দিলো। বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো সুফিয়া–ভাইয়া এবার আপনি এখানে। নিশ্চিন্ত মনে বিশ্রাম করুন। এই কক্ষে অন্য কেউ প্রবেশ করে না, তাছাড়াও আমি দরজায় তালা
আটকিয়ে রাখছি। যতক্ষণ আপনাকে মুক্ত করে দিতে না পারবো ততক্ষণ আমি নিশ্চিন্ত নই।
বনহুর সুফিয়ার তৈরি বিছানায় বসে পড়ে বললো–সুফিয়া, আমার জন্য তোমাকে না কোনো বিপদে পড়তে হয়।
না না, আমার জন্য আপনি মিছামিছি ভাবছেন ভাইয়া। ইনশাআল্লাহ আপনার বোন আপনাকে মুক্ত করতে সক্ষম হবে। আমি এক্ষুণি পুলিশ অফিসে যাবো এবং কৌশলে চাবি সংগ্রহ। করবো।
কিন্তু এটা কি সম্ভব হবে সুফিয়া?
হবে, আমি যে কোনো উপায়ে চাবি জোগাড় করবোই–
বনহুর আর সুফিয়ার মধ্যে যখন কথাবার্তা হচ্ছিলো তখন গাড়ি বারান্দায় মোটরের হর্ন বেজে ওঠে।
সুফিয়া বলে–ভাইয়া, আমার আব্বা এসেছেন।
সুফিয়া, তুমি যাও।
হাঁ, আমি যাচ্ছি, দরজায় তালা লাগিয়ে দিচ্ছি–সুফিয়া দ্রুতপদে পড়বার ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিলো।
ততক্ষণে পুলিশ সুপার কাওসার আহমদের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা যায় সুফিয়া, সুফিয়া–
কাওসার আহমদ সাহেবের কন্যাকে ডাকা একটা স্বভাবে পরিণত হয়েছিলো। যখনই যেখান থেকে ফিরুন, হলঘরের বারান্দায় পা দিয়েই ডাকবেন–সুফিয়া, সুফিয়া কোথায় তুমি মা?
সুফিয়া জানতো তার আব্বা তাকে কত স্নেহ করেন কত ভালবাসেন। যেখানেই থাক, সুফিয়া আসতো পিতার পাশে। ঘরে প্রবেশ করলে নিজের হাতে জামাকাপড় খুলে নিয়ে স্লিপিং গাউনটা এগিয়ে দিতো সে। হেসে হেসে কথা বলতো পিতার সঙ্গে। নানা খবর সংগ্রহ করতো সুফিয়া তাঁর নিকট থেকে।
মিঃ আহমদ কন্যাকে কাছে পেলে মনে আনন্দ বোধ করতেন। কন্যার কাছে তিনি মুখর হয়ে উঠতেন ছোট্ট শিশুর মতই। মিসেস আহমদ রাশভারী মানুষ, স্বামীর সেবা বড় একটা করে উঠতে পারতেন না। বাড়িতে চাকর বাকর দাস দাসী তো আর কম নয় কাওসার আহমদ তার নিজের যত কাজ চাকর-বাকর আর গার্ডদের দিয়ে সমাধা করে নিতেন। অনিচ্ছা বা ইচ্ছা সত্ত্বেও তিনি স্ত্রীকে অযথা বিরক্ত করতেন না।
তারপর সুফিয়া বড় হয়ে পিতার সেবার ভার নিজ হাতে তুলে নিয়েছেন। চাকর বাকর থাক তবু সুফিয়ার পিতা বাইরে যাবার সময় তাঁর জামা-কাপড় নিজ হাতে এগিয়ে দিতো, আবার ফিরে এলে খুলে নিতো। চা-নাস্তা নিজেই পরিবেশন করে খাওয়াতো পিতাকে। কন্যার হাতে স্বামীর সেবার দায়িত্বভার তুলে দিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন বেগম সাহেবা।
প্রতিদিনের স্বভাব অনুযায়ী আজও কাওসার আহমদ বাসায় ফিরে কন্যাকেই ডাকলেন।
ব্যস্তভাবে সুফিয়া এসে দাঁড়ালো পিতার সামনে–আব্বা, দস্যু বনহুরের সন্ধান পেয়েছো?
