নূরী ফিরে তাকালো জোবাইদার দিকে, চোখে তার ক্রুদ্ধ ভাব ফুটে উঠেছে।
নাসরিন নূরীর কোল থেকে মনিকে নিজের কোলে নিয়ে বেরিয়ে গেলো কক্ষ থেকে।
ছোটবেলা থেকেই নাসরিন নূরীর অত্যন্ত প্রিয়, দুজনের মধ্যে ভাবও অত্যন্ত বেশি। জোবাইদার সঙ্গেও নূরীর ভাব কম নয় তবে জোবাইদা একটু স্পষ্টভাষী। কাউকে কোনো কথা বলতে তার মুখ আটকায় না। ন্যায় কথা বলতে কাউকে সে পরওয়া করে না।
নাসরিন বুঝতে পারলো, দুই সখীর মধ্যে এখন তর্ক-বিতর্ক শুরু হবে, ছোট বেলা হলে কিল চড়ও হতো অনেক। অবশ্য এখন আর সে সব হয় না, শুধু কথা কাটাকাটি চলে।
সর্দারের সঙ্গে নূরীর মেলামেশাটা শুধু জোবাইদার নয়, আস্তানার অনেকের চোখেই বাধতো। দস্যু হলেও তারা মানুষ, কাজেই নিয়মের ব্যতিক্রম সবার কাছেই দৃষ্টিকটু মনে হয়।
সর্দারের সঙ্গে ব্যাপারটা–কাজেই মুখ ফুটে কেউ কিছু বলতে সাহসী হতো না।
তাছাড়া অনুচরগণ সবাই জানতো তাদের সর্দার সম্পূর্ণ উদাসীন এ ব্যাপারে। নূরীকে যতদূর সম্ভব বনহুর এড়িয়ে চলে–এটা সবাই ভালভাবে লক্ষ্য করেছে। সর্দারকে তারা দোষ দিতে পারে না, বরং তাকে অন্তরে অনুচরগণ গভীরভাবে শ্রদ্ধা করে।
শ্রদ্ধা করলেও নূরীর সঙ্গে সর্দারের মেলামেশা নিয়ে দু’চারটা গোপন আলোচনা যে চলে না, তা নয়।
এতদিন সবাই জানতো–সর্দার নূরীকেই বিয়ে করবে। এমনকি নাসরিন জোবাইদা ও তাদের বৃদ্ধা দাইমা জহুরাও সেই রকম মনে করতো, কাজেই তারা কোনো দিন এ ব্যাপারে তেমন কিছু বলেনি, কিন্তু এখন আর ব্যাপারটা তারা সামান্য বলে অবহেলা করতে পারে না। সর্দারের দিক দিয়ে তাদের বলবার কিছু খুঁজে না পেলেও নূরীর দিকটা সকলের মনে রেখাপাত করতে শুরু করেছে।
সেদিন দাইমা শুয়ে শুয়ে বলেছিলো নাসরিন আর জোবাইদাকে– আমরা ডাকুর বেটি বটে কিন্তু ধর্ম ছাড়া নই। কালু খাঁ আমাকে এনেছিলো বনহুরকে মানুষ করবার জন্য হুসনাপুর গ্রাম। থেকে। বয়স তখন আমার শেষ হয়ে গিয়েছিলো, চল্লিশেরও বেশি হবে, সেই থেকে আমি আছি। এই আস্তানায়। কালু খাঁ ডাকাত ছিলো কিন্তু সে কোনো দিন পরস্ত্রীকে স্পর্শ করেনি। আর বনহুর তারই হাতে গড়া মানুষ, অথচ সে নূরীর সঙ্গে যা তা ভাবে মিশছে ধর্মে এটা সইবে না। আমার বাবাও ডাকু ছিলো কিন্তু লম্পট ছিলো না।
নাসরিন আর জোবাইদা বৃদ্ধার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো– তবেতো এটা ভারী অন্যায়। নাসরিন আর জোবাইদা এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছিলো অনেক।
সর্দার নূরীকে বিয়ে করবে, এই ভরসা নিয়েই এতদিন তারা কোনো কথা বলেনি, কিন্তু এখন তো নূরীর বয়স কম নয়। যৌবন তার কানায় কানায় ভরে উঠেছে সর্দার তবু তাকে বিয়ে করছে না, কারণ খুঁজে পায় না নাসরিন আর জোবাইদা।
আসলে বনহুর যে গোপনে মনিরাকে বিয়ে করেছিলো এ কথা আস্তানায় বিশিষ্ট কয়েকজন। অনুচর ছাড়া আর কেউ জানতো না। রহমান সবাইকে রীতিমতভাবে নিষেধ করে দিয়েছিলো, এ কথা তারা ছাড়া আর কেউ যেন জানতে না পারে।
রহমানকেও তারা কম ভয় করতো না, দস্যু বনহুরের প্রথম অনুচর রতনের অন্তর্ধানের পর রহমানই সর্দারের দক্ষিণ হাত ছিলো। কাজেই রহমানের নির্দেশেও তাদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটা অসম্ভব নয়।
দস্যু বনহুরের অনুচর হওয়া তাদের জীবনের বড় সম্পদ। তাছাড়া সর্দার তাদের সবদিকে সুবিধা করে দিয়েছিলো। অর্থের কোনো অভাব তারা জানতো না। প্রতিটি অনুচরের সুখ– সুবিধার দিকে ছিলো বনহুরের নিপুণ দৃষ্টি। কারও অসুখ হলে বনহুর নিজে তার পাশে বসে অসুখের বর্ণনা শুনে সেইমত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতো। বছরে একমাস ছুটি হতো সবার যার যার নিজ দেশে ফিরে যেতো তখন তারা।
দেশের এই বেকার সমস্যার প্রাক্কালে এমন একটা সুযোগ হারাবার ভয় কার না আছে। তাছাড়াও মৃত্যুভয়ও রয়েছে বটে। দস্যু আস্তানায় যেমন অর্থের কোনো হিসেব নেই, তেমনি অপরাধ করলে মৃত্যুরও কোনো সময় নেই। দোষ করলে শাস্তি গ্রহণ করতেই হবে।
কাজেই তারা জানতো তাদের সর্দার বিবাহিতা। তারা নীরবেই থাকতো। আর যারা যে। অনুচরগণ আজও জানে তাদের সর্দার এখনও অবিবাহিত; তারা নূরী আর সর্দার সম্বন্ধে গোপনে দু’একটা কথা আলোচনা করতো অবশ্য সর্দারকে তারা ভালভাবেই জানে। সর্দারের সম্বন্ধে তাদের মধ্যে এতটুকু সন্দেহের ছোঁয়াচ নেই। কারণ তারা সবাই জানে তাদের সর্দার একজন দেব সমতুল্য মানুষ। ইতিপূর্বে অনুচরদের অনেকেই অন্য দস্যুর সহচর হিসেবে কাজ করেছে। তখন তারা দেখেছে তাদের দলপতি বা সর্দারের আসল রূপ। মদ তাড়ি ভাং পান করা ছাড়াও সর্দার নারীদের নিয়ে যা তা ছিনিমিনি খেলতো তাদের হাতে কোনো মেয়ে পড়লে ইজ্জত বলে কিছু থাকতো না। আর দস্যু বনহুর ঠিক তার বিপরীত দস্যু হলেও কোনো নেশা তার ছিলো না। জীবনে সে কোনেদিন মদ স্পর্শ করেনি তাড়ি ভাং বা ঐ ধরনের কোনো নেশাও তার নেই। বনহুর নারীদের সম্মান করে মা-বোনের মত।
যে দস্যুদলের সর্দার এমন, তার অনুচরগণ কোনোদিন জঘন্য হতে পারে না, দস্যু বনহুরের অনুচরদের মধ্যে অনেকেরই অবশ্য গোপনে এসব নেশা ছিলো কিন্তু প্রকাশ্যে তারা কোনোদিন সর্দারের সামনে এইসব ব্যবহার করতে সাহসী হতো না।
সেই সর্দারের চরিত্র নিয়ে অনুচরগণ কুৎসিত ইংগিত করবে এ কখনও হতে পারে না। বরং অনুচরগণ সর্দারকে অন্তরে অন্তরে ধন্যবাদ জানাতো; নূরীর মত সর্বসুন্দরী চঞ্চলা মেয়েকে ঘনিষ্ঠভাবে পেয়েও সর্দার তাকে এড়িয়ে চলে।
