ততক্ষণে গাড়ির চাকা পাল্টানো হয়ে গিয়েছিলো, পুলিশগণ গাড়িতে উঠে বসে স্টার্ট দিলো। রহমান ছুটলো তার দলবলের নিকটে। রহমানকে খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ছুটে আসতে দেখে তার দল বল সবাই তাকে ঘিরে ধরে। নূরী ব্যস্তকণ্ঠে বলে ওঠে–রহমান খবর কি রহমান?
রহমান আনন্দধ্বনি করে ওঠেনূরী তোমার কথাই সত্য হলো! সর্দার পুলিশের হাত থেকে পালিয়েছে।
রহমান!
হাঁ নূরী, সত্য। সেই সংবাদ নিয়েই পুলিশ ভ্যানটি জন্ধুর পথে যাচ্ছে।
আমি জানতাম ওকে কেউ বন্দী করে রাখতে পারবে না। কেউ ওকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। আর কি সংবাদ রহমান? এখন আমার হুর কোথায়? কেমন আছে সে?
পাগলী, সে সংবাদ আমি কি করে জানবো?
রহমান বাঁশির শব্দে সমস্ত অনুচরগণকে একত্রিত করলো। তারপর তাদের সর্দারের সংবাদ জানালো।
সবাইকে ডেকে একটা সভা করলো।
রহমান সুউচ্চ একটা পাথরের উপরে দাঁড়িয়ে অনুচরদের লক্ষ্য করে বললো–ভাইরা সর্দার আমাদের রক্তক্ষয় হতে রক্ষা করলেন। তিনি নিজকে বাঁচিয়ে নিয়েছেন পুলিশের হাত থেকে। কিন্তু তিনি এখন কোথায় কিভাবে আছেন আমরা কিছু জানি না। পুলিশদের নিকটে শুধু এইটুকুই জানতে পেরেছি–দস্যু বনহুর পালিয়েছে।
অনুচরগণ আনন্দধ্বনি করে উঠলো।
তাদের সংঘবদ্ধ কণ্ঠস্বর প্রকম্পিত হয়ে উঠলো বনাঞ্চল।
রহমান বললো এবার–ভাইগণ, আমরা এখনও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত নই, যতক্ষণ না সর্দার আস্তানায় ফিরে এসেছেন। কাজেই আমাদের কাজ এখন অনেক বাকি। এই দণ্ডে আমরা কয়েকজন ছদ্মবেশে শহরে প্রবেশ করবো। গোপনে অনুসন্ধান করতে হবে–কোথায় কিভাবে আছেন তিনি। নিশ্চয়ই পুলিবাহিনী সমস্ত শহরটাকে কড়া পাহারায় রেখেছে, আমাদের অতি সাবধানে কাজ করতে হবে। এখন আমাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা–শহরে প্রবেশ করা কঠিন হবে। একটু নিশ্চুপ থেকে কি যেন ভাবলো রহমান, তারপর বললো–যে পুলিশ ফোর্স অল্পক্ষণ পূর্বে জম্বু অভিমুখে চলে গেলো তারা নিশ্চয়ই ফিরে আসবে এবং এই পথেই আসবে।
নূরীর চোখ উজ্জ্বল দীপ্ত হয়ে উঠলো, আনন্দসূচক কণ্ঠে বললো সে–ঠিক বলেছো রহমান, ঐ সুযোগেই একমাত্র পথ শহরে প্রবেশ করবার।
হাঁ, পুলিশ ভ্যানটাকে আটকাতে হবে এবং গাড়িতে যে ক’জন পুলিশ ছিলো তাদের সাবধানে। আটকে রাখতে হবে। তাদের পোশাকগুলো এবং ভ্যানটা হলেই আমাদের চলবে।
নূরী বললো–সাবাস বুদ্ধি তোমার রহমান।
মুখ গম্ভীর করে ব্যথাভরা কণ্ঠে বললো রহমান-কই আর বুদ্ধি খাটাতে পারলাম। সর্দারকে জান দিয়ে উদ্ধার করতে পারলে নিজকে ধন্য মনে করতাম, কিন্তু সর্দার সে সুযোগ আমাদের দিলেন কই। একটু চুপ করে থেকে বললো রহমান-এবার আমাদের কিছু সংখ্যক অনুচরকে কান্দাই প্রবেশ পথে পাহাড়িয়া অঞ্চলে আত্মগোপন করে থাকতে হবে, যতক্ষণ না ঐ পুলিশভ্যানটা ফিরে আসে। তারপর নূরীর দিকে তাকিয়ে বললো–নূরী তুমি বহুক্ষণ আমাদের সঙ্গে রয়েছে, তোমার মনি বড় পেরেশান হয়ে পড়েছে, যাও এবার তোমার ছুটি।
নূরীর মনে মনির কথা উদয় হতেই চিন্তিত হলো। অশ্বযোগে সোজা সে আস্তানায় ফিরে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে পুরুষ ড্রেস পাল্টে নিলো। তারপর এগিয়ে চললো যেখানে নাসরিন আর জোবাইদা মনিকে নিয়ে খেলা করছিলো সেখানে।
নূরী নিকটবর্তী হতেই তার কানে এলো মনির কণ্ঠস্বর বলো না, আমার বাপি কোথায়? বলোনা নাসু, আমার বাপি কোথায়? কোথায় গেছে সে?
মনি নাসরিনকে নাসু বলে ডাকতো, এটা অবশ্য নূরীর শেখানো বুলি। আর জোবাইদাকে জুবি বলতো মনি। নূরী নিজেই সঙ্গিনীদের আদর করে এই নামে ডাকতো। আম্মির মুখে শুনে শুনে মনিরও অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো ঐ নাম দুটো।
মনির কথা শুনে আড়ালে লুকিয়ে পড়লো নূরী।
মনি যদিও কথাটা নাসুকে জিজ্ঞাসা করলো কিন্তু জবাব দিলো জোবাইদা–তোমার বাপি কে মনি? যাকে তুমি বাপ বলে ডাকো, তিনিতো আমাদের সর্দার।
আমার বাপি তো তোমাদের সর্দার।
হেসে বললো জোবাইদা–তোমার আম্মির এখনো বিয়েই হয়নি।
আম্মির বিয়ে হয়নি?
না।
বিয়ে কেমন বলোনা জুবি?
তোমার আম্মিকে জিজ্ঞেস করো।
নূরী আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে এসব কি হচ্ছে?
একসঙ্গে মুখ টিপে হাসে নাসরিন আর জোবাইদা।
মনি কিছু বুঝতে না পেরে একবার তার আম্মির একবার নাসরিন আর জোবাইদার মুখে তাকায়।
নূরী অভিমানে মুখ ভার করে মনিকে তুলে নেয় কোলে, তারপর নিজের ঘরে চলে যায়।
কানের কাছে জোবাইদা আর নাসরিনের কথাগুলোর প্রতিধ্বনি হতে থাকে। জোবাইদার কণ্ঠ– তোমার আম্মির বিয়েই হয়নি, বাপি পাবে কোথায় মনি তোমার আম্মির বিয়ে হয়নি, তোমার আম্মির বিয়েই হয়নি।
নূরী মনিকে বুকে চেপে ধরে অস্ফুট কন্ঠে বলে–না না, বিয়ে আমার হয়ে গেছে–বিয়ে আমার হয়ে গেছে–হুঁর আমার স্বামী।
এমন সময় কক্ষে প্রবেশ করে জোবাইদা আর নাসরিন।
জোবাইদা বলে-নূরী, তুমি যা বলছে তা সম্পূর্ণ নিছক ভিত্তি হীন। নূরী, আমরা তোমার সঙ্গিনী, শিশুকাল হতে একসঙ্গে খেলাধূলো করে আজ এত বড় হয়েছি! আগে ছোট ছিলাম, তুমিও ছিলে, খেয়ালের বশে যা করেছে বা আমরা করেছি তা তেমন কোনো দোষণীয় নয় কিন্তু আজ আমরা বড় হয়েছি, তুমিও হয়েছে। সব বুঝতে শিখেছো জানো মুসলমান হলে কলেমা না পড়ে কোনোদিন বিয়ে হয় না। সর্দার তোমাকে বিয়ে করেনি, কলেমা পাঠ করে তোমাকে বিয়ে করেনি
