মনিরা অন্ধ হয়েছে তবু তার দুঃখ নেই ব্যথা নেই সে জন্য। আজ তার আনন্দ মৃত্যুর কবল থেকে তার মনির উদ্ধার পেয়েছে।
মরিয়ম বেগম আবার গিয়ে জায়নামাজে বসলেন, খোদার কাছে পুত্রের মঙ্গল কামনা করতে লাগলেন। না জানি কোথায় কি অবস্থায় এখন সে আছে। যেখানেই থাকে ওকে তুমি রক্ষা করো দয়াময়। ওকে তুমি উদ্ধার করো…
*
বেলা বেড়ে আসছে, রহমান দলবল নিয়ে প্রতীক্ষা করছে এই পথেই তাদের সর্দারকে নিয়ে পুলিশ ভ্যানগুলো আসবে। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা গড়িয়ে চললো। এতক্ষণও কোনো সাড়াশব্দ নেই পুলিশ ভ্যানের।
নূরী সবচেয়ে বেশি ঘাবড়ে গেলো, রহমানকে লক্ষ্য করে বললো–রহমান, আমাদের এই আক্রমণ প্রস্তুতি পুলিশবাহিনী হয়তো জ্ঞাত হয়েছে। তাই তারা সাবধানতা অবলম্বন করে অন্য পথে জম্বুর কারাগারে গমন করেছে।
রহমান উদ্যত রাইফেল সোজা করে উঠে দাঁড়ালো–জম্বুর কারাগারে যাবার এই একমাত্র পথ। নিশ্চয়ই কোনো ঘটনা ঘটে গেছে।
নূরী বলে উঠলো–রহমান, আমার মন বলছে–হুঁরকে পুলিশ বাহিনী ধরে রাখতে পারেনি। রহমান, সে নিষ্পাপ, সে পবিত্রতাকে কেউ জঘন্যভাবে হত্যা করতে সক্ষম হবে না
রহমান বলে ওঠেনূরী, আইনের কাছে নিষ্পাপ বা পবিত্রতার প্রশ্ন কোনো কাজ করে না। সর্দারকে ওরা আইনের চোখে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। পুলিশ কিছুতেই তাদের আইন ভঙ্গ করবে না।
কিন্তু আমার মন বলছে তাকে ওরা মৃত্যুদণ্ড দিতে সক্ষম হবে না।
সাবাস নূরী, খোদার কাছে এই প্রার্থনাই করো আমরা যেন সর্দারকে উদ্ধার করতে পারি।
রহমানের কথা শেষ হয় না,একটা পুলিশ ভ্যান দ্রুত এগিয়ে আসছে এদিকে দেখতে পায় তারা।
পুলিশ ভ্যানখানা অত্যন্ত বেগে এগিয়ে আসছে। যেখানে সে অনুচর আত্মগোপন করেছিলো সবাই রাইফেল বাগিয়ে প্রস্তুত হয়ে নেয়।
রহমান আর নূরী পাশাপাশি দুটো টিলার পাশে ছিলো। উভয়ের হাতেই গুলীভরা রাইফেল। রহমান চোখে দূরবীণ লাগিয়ে দেখছিলো, বললো সে–মাত্র একটা পুলিশ ভ্যান দেখতে পাচ্ছি।
নূরী বললো এবার তাহলে হুরকে এটাই আনছে নাকি?
রহমান হাসলো–এত বড় দুঃসাহস হবে পুলিশ বাহিনীর। দস্যু বনহুরকে একটি মাত্র পুলিশ ভ্যানে করে আনবে তারা অন্য কারাগারে?
দাও দূরবীণটা আমাকে দাও দেখি। নূরী রহমানের হাত থেকে দূরবীণ নিয়ে টিলার পাশে। উবু হয়ে শুয়ে পড়ে। ভাল করে লক্ষ্য করতেই দেখতে পায় ঐ ভ্যানে শুধুমাত্র কয়েকজন পুলিশ হাতে রাইফেল সবাই এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। না তার হুর নেই ওর মধ্যে।
নূরীর মনে সান্ত্বনা আসে, দূরবীণটা ফিরিয়ে দিয়ে বলে–এরা তাহলে এভাবে আসছে কেন?
দূরে ভ্যানটা পথের বাঁক ঘুরে ফিরে এগিয়ে আসছে।
রহমান বললো–কেমন করে বলবো বলো?
অন্যান্য দস্যু বাঁশি যুঁকিয়ে সজাগ হয়ে নিলো।
রহমান ক্ষান্ত থাকবার ইংগিতে বাঁশিতে শব্দ করলো।
কাজেই অন্যান্য দস্যু কেউ আর গুলী ছুঁড়বার জন্য প্রস্তুত হলো না।
রহমান তাড়াতাড়ি একটা বড় টিলার আড়ালে গিয়ে নিজের দস্যু ড্রেস পালটে অন্ধ ভিখারী সেজে নিলো তারপর বললো–নূরী, আমি এদের কাছে খবর নিয়ে আসি, সর্দার কোথায়।
নূরী বললো–ওরা যেভাবে এগিয়ে আসছে তাতে তোমার মত ভিখারীর সঙ্গে গাড়ি থামিয়ে কথা বলবে বলে মনে হয় না।
তুমি চুপ করে দেখো নূরী। নিশ্চয়ই কোনো অঘটন ঘটেছে বলে আমার মনে হচ্ছে। নইলে একখানা পুলিশ ভ্যান এমন দ্রুত গতিতে জম্বু অভিমুখে ছুটতো না।
রহমান ছোট ছোট টিলা আর ঝোপঝাড় পেরিয়ে ছুটতে থাকে গাড়ি এতদূর এসে পড়বার পূর্বেই তাকে পথে পৌঁছতে হবে।
রহমান অত্যন্ত দ্রুত কাজ করলো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই পথে এসে দাঁড়ালো। দ্রুত হস্তে কাঁধের ঝোলা থেকে কতকগুলো লোহার কাঁটা বের করে পথের ধুলোর মধ্যেই লুকিয়ে সোজা করে রাখলো। তারপর সেই স্থান হতে অনেক দূরে সরে গিয়ে খুড়িয়ে চলতে লাগলো আর বলতে লাগলো সে–আল্লা একটা পয়সা দে। আল্লা একটা পয়সা দে–
এদিকে পুলিশ ভ্যানটা দ্রুত এসে পড়লো সেই স্থানে। হঠাৎ পেছনের চাকার হাওয়া বেরিয়ে গেলো পুলিশ ভ্যানটার। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেমে গেলো।
পুলিশ ফোর্স গাড়ি থেকে নেমে পড়লো। তাদের কাছে পৃথক চাকা ছিলো, চাকা লাগানো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সবাই– সকলেরই চোখেমুখে ব্যস্ততার ছাপ।
এগিয়ে আসে ভিখারী, হাত পাতে পুলিশদের সামনে–আল্লা একটা পয়সা দে। আল্লা। একটা পয়সা দে–
একজন পুলিশ ধমক দিলো–ভাগ এখান থেকে, বেটা আমরা জ্বালায় বাঁচছি না, একটা পয়সা–মুখ ভেংচে বললো সে।
ভিখারী আবার হাত পাতলো আর একজনের সামনে একটা পয়সা দে–একটা পয়সা–
অন্য একজন পুলিশ বললো–বেচারা খোঁড়া ভিখারী, দিয়ে দাও একটা আনা। এই এদিকে আয়, নে। পুলিশটার প্রাণে দয়া আছে, পকেট থেকে একটা আনি বের করে ভিখারীর হাতে দিলো।
ভিখারী হাত উঁচু করে দোয়া করলো, তারপর বললো–বাবু তোমরা কোথায় যাবে।
যে পুলিশটা পয়সা দিয়েছিলো সেই বললো–দস্যু বনহুরের নাম শুনেছিস বুড়ো?
দস্যু বনহুর! হাঁ শুনেছি বাবা, তাকেই ধরতে যাচ্ছো বুঝি?
দস্যু বনহুর পালিয়েছে, তাই জম্বুতে খবর দিতে যাচ্ছি আমরা।
দস্যু বনহুর পালিয়েছে? এত জোয়ান জোয়ান লোক তোমরা অথচ একজনকে ধরে রাখতে পারলে না? আল্লা একটা পয়সা দে– একটা পয়সা দে– ভিখারী চলে গেলো বিপরীত দিকে।
