বছর গড়িয়ে যাচ্ছিলো, চৌধুরী বাড়ির রূপ আবার স্বাভাবিক হয়ে আসছিলো। আবার ভাবগম্ভীর চৌধুরী সাহেব আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে হলঘর সরগরম করে তুলতেন। মনিরাই তাদের এখন সব হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। মনিরাকে লেখাপড়া, গান-বাজনা শেখানো হয়ে উঠেছিলো চৌধুরী সাহেব ও তার গৃহিণীর চরম লক্ষ্য। বছরে চৌধুরী বাড়িতে নানা রকম উৎসব লেগেই থাকতো। আজ মনিরার জন্ম উৎসব, কাল মনিরার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার আনন্দ উৎসব, পরশু বান্ধবীদের নিয়ে পার্টি। তারপর চৌধুরী সাহেবের নিজস্ব ফাংশানের তো কথাই ছিলো না।
আজ সরকার সাহেব হলঘরে বসে এসব কথাই ভাবছিলেন। এতদিন তবু নানা কথায় সান্ত্বনার প্রলেপ দিয়ে বেগম সাহেবা আর মনিরাকে প্রবোধ দিয়ে এসেছেন। যদিও তিনি জানতেন এ সব বলা তার বৃথা, তবুও না বলে পারতেন না।
কিন্তু আজ তার মুখে কোনো কথা সরছে না।
স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন স্থবিরের মত, সম্মুখে রেডিওটা ভোলা, একটু পূর্বে খবর হয়ে গেছে, এখন পল্লীগীতি হচ্ছিলো।
সরকার সাহেবের কোনো দিকে খেয়াল নেই, তিনি নিশ্চুপ বসে শুনছিলেন, পল্লীগীতি নয় খবর। কিন্তু কখন যে খবর শেষ হয়ে গেছে সেদিকে খেয়াল নেই তার।
হঠাৎ সরকার সাহেবের চিন্তাধারা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। রেডিওতে শোনা যায় একটা গুরুগম্ভীর কণ্ঠের জরুরি ঘোষণা–”পুলিশ বাহিনীর যথেষ্ট সতর্কতা সত্ত্বেও দস্যু বনহুর পুলিশভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়ে বিপুল জনতার মধ্যে অদৃশ্য হয়েছে”…
এটুকু শুনেই সরকার সাহেবের মুখচোখ খুশিতে দীপ্ত হয়ে উঠলো, তিনি আর শুনবার ধৈর্য ধরতে পারলেন না, ছুটলেন সিঁড়ি বেয়ে উপরে–বেগম সাহেবা, বেগম সাহেবা-মা মনিরা, মা মনিরাও পালিয়েছে, ও পালিয়েছে…মনির পালিয়েছে…
সরকার সাহেবের কলকণ্ঠ মরিয়ম বেগমের কানে পৌঁছতেই তিনি জায়নামাজ থেকে উঠে ছুটে চললেন সরকার সাহেবের দিকে।
মনিরার কানেও সরকার সাহেবের গলার আওয়াজ গিয়ে পৌঁছেছিলো। মনিরা অন্ধ–সে কথা নিজে ভুলে গেলো, উঠিপড়ি করে সেও এগুতে লাগলো।
মরিয়ম বেগমের চোখে অশ্রু মুখে হাসির ছটা, তিনি চিৎকার করে বলছেন আর ছুটছেন– আমার মনির পালিয়েছে? আমার মনির পালিয়েছে…।
মনিরার দৃষ্টিশক্তি নেই। সে কানে শুনতে পাচ্ছে বটে কিন্তু দেখতে পাচ্ছে না। বার বার দেয়ালে টক্কর খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, আবার উঠছে, এগুচ্ছে, আবার হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। যাচ্ছে, তবু মুখে দীপ্ত হাসির ছটা।
অপূর্ব সে মুহূর্ত, ওদিক থেকে সরকার সাহেব সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে আসছেন, ও ঘর থেকে মরিয়ম বেগম ছুটে আসছেন, ও ঘর থেকে মনিরা একবার উঠছে, একবার পড়ছে, আবার দেয়াল ধরে ধরে হাতড়ে এগুচ্ছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে সরকার সাহেব এসে দাঁড়ালেন দোতলার বারান্দায়। মরিয়ম বেগমও এসে সম্মুখে দাঁড়ালেন, চোখেমুখে তার ফুটে উঠেছে দীপ্ত উচ্ছ্বাস।
সরকার সাহেব খুশিতে আত্মহারা হয়ে ব্যস্তকণ্ঠে বললেন–পালিয়েছে, বেগম সাহেবা ও পালিয়েছে।
কে…কে পালিয়েছে সরকার সাহেব, আমার মনির?
হাঁ হাঁ বেগম সাহেবা…
মনিরা তাড়াতাড়ি আসতে আবার পড়ে গেলো হোঁচট খেয়ে। অস্ফুট কণ্ঠে বললো–সে পালিয়েছে!
মরিয়ম বেগম দ্রুত মনিরাকে তুলে ধরলেন।
সরকার সাহেব বললো–আসুন, রেডিও ঘোষণা শুনুন।
মনিরার কক্ষে ছিলো একসেট রেডিও। যখন খুশি মনিরা রেডিও খুলে দিয়ে গান শুনতে খবর শুনতো। আজ কদিন সে রেডিও স্পর্শ করেনি।
মরিয়ম বেগম আর মনিরা সহ সরকার সাহেবের কক্ষে প্রবেশ করলেন।
সরকার সাহেব দ্রুতহস্তে রেডিও চালু করে দিয়ে বললেন–শুনুন শুনুন বেগম সাহেবা। মনির শোনো মা, আমি বলেছিলাম–আমাদের ছোট সাহেবকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না…
রেডিওতে তখনও পুলিশ-সুপারের গম্ভীর কণ্ঠের ঘোষণা চলেছে। তিনি জনগণকে বারবার দস্যু বনহুর সম্বন্ধে সাবধান হবার নির্দেশ দিচ্ছেন।
রেডিওর পাশে ঝুঁকে পড়লেন সরকার সাহেব, মরিয়ম বেগম আর মনিরা। তাদের নিশ্বাস পড়ছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। স্তব্ধ হয়ে শুনছেন তারা পুলিশ-সুপারের সাবধান বাণী।
পুলিশ সুপারের কণ্ঠস্বর–”বিপুল জনতা তাকে দেখবার জন্য পথের ধারে এমনভাবে ভিড় করে” শেষ পর্যন্ত জনতা পুলিশ ভ্যানের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, যার জন্য দস্যু পালাতে সক্ষম হয়। পুলিশ কিছুতেই জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে সক্ষম হয়নি। দস্যু বনহুর যখন জনতার মধ্যে উধাও হলো তখন শুধুমাত্র জনতার জীবনহানির আশঙ্কায় পুলিশ গুলী ছেড়েনি। দস্যু বনহুরের হাতে এখনও হাতকড়া এবং তার শরীরে মজবুত করে শিকল আটকানো আছে। যে তাকে পুনঃ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে তাকে পঁচিশ হাজার টাকা বখশীস দেওয়া হবে। আমি আবার আপনাদের সাবধান করে দিচ্ছি আপনারা প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়ির সর্বত্র সর্তক দৃষ্টি রাখুন, দস্যু বনহুর আপনাদের মধ্যেই আত্মগোপন করে আছে…
মনিরা দু’হাতে টেবিলের রেডিও চেপে ধরে আনন্দভরা কণ্ঠে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠলো– তুমি বেঁচে আছো! তুমি বেঁচো আছো–
মরিয়ম বেগম দু’হাত উপরে তুলে ধরে–হে পাক পারওয়ারদেগার, তুমি রহমানুর রাহিম, তোমার অসাধ্য কিছু নেই। আমার মনিরকে তুমি বাঁচিয়ে নাও, ওকে যে আমি তোমার দরগায় সঁপে দিয়েছি।
সরকার সাহেব চোখে অশ্রু মুখে হাসি নিয়ে বললেন–বেগম সাহেবা, ছোট সাহেবের কেউ অমঙ্গল করতে পারবে না। সে যে অতি উত্তম পুরুষ।
