বনহুর সুফিয়ার মুখের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলো।
সুফিয়া বললো–আব্বার গলা এটা।
বনহুর নির্বাক হয়ে কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে তখনও তাকিয়ে আছে সুফিয়ার মুখে।
*
মনিরা অন্ধ।
শুধু অন্ধই নয়, অসুস্থ। আজ স্বামীর মৃত্যুদণ্ড দিবস।
মনিরা খাটের সঙ্গে মাথা আছড়ে কাঁদছিলো, ভোর থেকে এখন পর্যন্ত এক মুহূর্ত তার কান্না। থামেনি। খাটে মাথা ঠুকে রক্ত বের করে ফেলেছে মনিরা, তবু মনে এতটুকু সান্ত্বনা পাচ্ছে না। মনিরার এ অবস্থা, বাড়ির সকলেরই মনে শান্তি নেই। গোটা বাড়িময় একটা করুণ ভাব ফুটে উঠেছে।
মরিময় বেগম আজ আর মনিরাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য তার পাশে বসে নাই, নিজের ঘরে জায়নামাজে বসে দুহাত তুলে পুত্রের জন্য অশ্রু বিসর্জন করে চলেছেন। মায়ের হৃদয় আজ গুমড়ে। গুমড়ে কেঁদে উঠছে। সব ব্যথা এতদিন তিনি নীরবে সহ্য করে এসেছেন, এমন কি স্বামীর মৃত্যুও তাকে এতখানি বিচলিত করেনি। আজ মরিয়ম বেগম সমস্ত দুনিয়াকে অন্ধকার বিভীষিকাময় দেখছেন। পৃথিবীর সবাই যেন কাঁদছে আজ তাঁর সন্তানের জন্য। আকাশ বাতাস, বৃক্ষ-লতা-গুল্ম। নদী, পাহাড়-পর্বত, সবাই যেন হাহাকার করছে, শুধু তার সন্তানের জন্য……
পাশের ঘরে মনিরার কান্নায় প্রতিধ্বনিই মরিয়ম বেগমের হৃদয়ে এই ভাবের সৃষ্টি করে চলেছে। বেচারী মনিরা, কিইবা এমন বয়স হয়েছে–এই বয়সেই সংসারের সব ব্যথা তাকে হজম করতে হচ্ছে। শিশুকালে পিতা মাতাহারা আশ্রয়স্থল হিসেবে একমাত্র মামুজানকে পেলো সে। তাঁকেও হারালো অল্পদিনের মধ্যে। নারীর মাথার মণি স্বামী–আজ সেই স্বামীকেও বেচারী হারাতে চলেছে। তাই শুধু নয়, নিজের দৃষ্টিশক্তিও হারিয়েছে সে…
চৌধুরী বাড়ির এই গুমোট ভাব দাসদাসীর মনে একটা অহেতুক চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই কিন্তু জানে না চৌধুরীবাড়ির ভিতরের গোপন রহস্য। জানতেন সরকার সাহেব আর সামান্য একটু জানতো নকিব।
সরকার সাহেব আজকাল একেবারে হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। চৌধুরী বাড়ির আনন্দে তার। আনন্দ, চৌধুরী বাড়ির দুঃখে তার দুঃখ। আজ কতদিন হলো চৌধুরী বাড়ির আনন্দে ভাটা পড়েছে। কারও মুখে হাসি নেই, কারও মনে শান্তি নেই। সব সময় একটা বিমর্ষ থমথমে ভাব বাড়িটার সর্বত্র। সরকার সাহেব চৌধুরী বাড়ির একজন হিতাকাঙ্ক্ষী, কাজেই তার মনে যে দারুণ একটা অশান্তির করাল ছায়া আচ্ছন্ন থাকবে তাতে তার আশ্চর্য কি!
এই বাড়িতে একদিন কিনছিলো আর কি না হতো! সব সময় হলঘর গমগম করতো আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুবান্ধবে। চৌধুরী সাহেব ছিলেন সদা হাস্যালাপী মানুষ। একদণ্ড লোকজন না হলে তিনি যেন হাঁপিয়ে উঠতেন। তার বাড়িতে প্রায়ই খানা-পিনা-পার্টি ও ফাংশন লেগেই থাকতো। শহরের বাড়িতে যত না হতো, তার চেয়ে অনেক বেশি হতো তার দেশের বাড়িতে। বছরান্তে সপরিবারে চৌধুরী সাহেব নৌকাযোগে দেশে যেতেন। যে ক’দিন দেশের বাড়িতে থাকতেন নানা রকম উৎসব আর আনন্দ চলতো।
এ গ্রাম, সে গ্রাম থেকে আত্মীয়কুটুম্ব এসে বাড়ি সরগরম হয়ে উঠতো। বন্ধুবান্ধবে মুখর হয়ে উঠতো বৈঠকখানা। মেয়ে মহলেও তেমনি ভীড় জমতো। যেখানে যে আত্মীয়া এসে জড়ো হতো সবাই চৌধুরী বাড়িতে। মরিয়ম বেগম বহুদিন পর তাঁর আত্মীয়দের পেয়ে অনেক খুশি হতেন। অভাব নেই কিছুর–রান্নার উঠানে রান্না চলেছে, গল্পের আসরে গল্প বৈঠকখানায় চৌধুরী সাহেব পুরুষদের নিয়ে মেতে থাকেন। খাবার সময় হলে ডাক পড়তো উঠানে। চৌধুরী সাহেব সঙ্গী সাথীদের নিয়ে পরম আনন্দে ভোজন করতেন।
সরকার সাহেবের এসব কি ভুলবার! কোনোদিন তিনি এ বাড়ির কারও বিষণ্ণ মুখ দেখেননি, অবশ্য শিশু মনির হারিয়ে যাবার পর কিছুদিন চৌধুরী বাড়ির রূপ বদলে গিয়েছিলো সম্পূর্ণরূপে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে চৌধুরী সাহেব এবং বেগম সাহেবা উন্মাদ প্রায় হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু সেও তো আজ পঁচিশ বছর আগের কথা।
পুত্রহারা চৌধুরী সাহেব তারপর নিজকে সুস্থির করে নিতে পেরেছিলেন অনেক কষ্টে। আল্লাহ যা করেন তার উপর তো হাত বাড়াতে পারবেন না। তিনি নিজের অদৃষ্টের উপর বিশ্বাস রেখে সন্তানের স্মৃতি মুছে ফেলেছিলেন মন থেকে।
আবার তিনি পূর্বের ন্যায় হাসি-খুশিতে মুখর হয়ে উঠেছিলেন। বিশেষ করে মনিরাকে পেয়ে তিনি ভুলতে সক্ষম হয়েছিলেন প্রিয় পুত্র মনিরকে। কন্যা সমতুল্য মনিরা মামা-মামীর সমস্ত হৃদয় জয় করে নিতে পেরেছিলো।
মনিরার হাসি-খুশি মুখ সন্তানহারা স্বামী-স্ত্রীর মনে এনেছিলো এক অনাবিল আনন্দ। চঞ্চল শিশু মনিরা ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো, ভুলে গেলেন চৌধুরী সাহেব মনিরার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজ পুত্রের মুখ।
যদিও চির হাস্যময় চৌধুরী সাহেব পুত্রের অন্তর্ধানে একেবারে অসাড়ের মত স্তব্ধ হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তাঁর এই ভাবগম্ভীর মুহূর্তগুলো বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি, মনিরার উচ্ছল হাসি-খুশি আবার তাঁকে পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক করে তুলেছিলো। অন্তরের ব্যথার আগুনে গুমড়ে আগুন মরলেও নিজেকে বেশিক্ষণ চিন্তাযুক্ত রাখতে পারেননি। মনিরাকে বুকে নিয়ে পুত্রস্মৃতি ভুলতে চেষ্টা করেছেন। মরিয়ম বেগমও স্বামীর মনের কথা বুঝতেন কিন্তু কি করবেন যা গেছে তা কি আর ফিরে আসবে! তাই তিনিও স্বামীকে সান্ত্বনা দিতেন, নানা রকম প্রবোধ বাক্যে স্বামীর মনের ব্যথা মুছে ফেলতে চেষ্টা করতেন।
