পারবো।
সত্যি?
হাঁ, আমি কৌশলে একটা হাতকড়া যোগাড় করে নেবো, নিশ্চয়ই সঙ্গে চাবি থাকবে। ভাইয়া, পুলিশ সুপারের মেয়ের একটা হাত কড়ার চাবি সংগ্রহ করতে বেশি সময় লাগবে না,
কিন্তু নয় সুফিয়া, তুমি আমার হাত দুটো মুক্ত করে দাও, তাহলেই দেহের শিকলের দিকে তাকিয়ে বললো বনহুর–এগুলো খুলে ফেলতে আমার বেশি সময় লাগবে না।
তাই দেবো ভাইয়া, আপনাকে মুক্ত করে দেবো।
সুফিয়া!
ভাইয়া, আপনি আমার শোবার ঘরে চলুন, এই তো ভিতর দিয়ে দরজা। চলুন কেউ আসবে না আমার ঘরে। আমার বিছানায় আপনি শুয়ে থাকুন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললো বনহুর–সুফিয়া।
চলুন ভাইয়া।
সুফিয়া বনহুরকে সঙ্গে করে শোবার ঘরে প্রবেশ করলো। সুফিয়ার মা তখন সংসারের কাজকর্ম চাকর-বাকরগণকে দেখিয়ে দিতে ব্যস্ত।
সুফিয়ার কোনো ভাই-বোন ছিলো না, কাজেই তার ঘরে একমাত্র মা ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতো না। আর করতো রাহেলার মা। সে ঘর পরিস্কার করতো, ঘর গোছাতো সুফিয়ার বই পত্তর গুছিয়ে রাখতো। চাকর বাকর অনেক থাকলেও সহসা কেউ সুফিয়ার কক্ষে যেতো না।
কাজেই বনহুরকে তার কক্ষে লুকিয়ে রাখতে তেমন কোনো কষ্ট হলো না। কিন্তু হঠাৎ যদি তার মা এসে পড়েন বা রাহেলার মা–তাহলে কি হবে, সুফিয়া একটু চিন্তিত হলো বইকি।
বনহুর সুফিয়ার কক্ষে প্রবেশ করে বললো–তোমার ঘরে আমার প্রবেশ অন্যায় সুফিয়া। তুমি পুলিশ সুপারের কন্যা। আর আমি একজন ঘৃণিত দস্যু।
না না ভাইয়া এ কথা আপনি বলবেন না, দস্যু হলেও আপনি মহান আমার জীবন রক্ষাকারী।
সুফিয়া, তোমাদের বাড়ির চারপাশে পুলিশ পাহারায় নিযুক্ত রয়েছে, দরজায় রাইফেলধারী। পুলিশ আর একজন দস তোমার কক্ষে।
দস্যু হলেও আপনি আমার ভাইয়া; আর আমি আপনার বোন। ভাইয়া, আপনি আমার বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম করুন।
দস্যু বনহুর আর সুফিয়ার মধ্যে যখন কথাবার্তা হচ্ছিলো তখন তারা অত্যন্ত চাপা এবং নীচুস্বরে বলছিলো। কক্ষের বাইরে কেউ শুনতে পাচ্ছিলো না।
বনহুর সুফিয়ার বিছানায় বসলো।
সুফিয়া নিজ হাতে বনহুরের ললাটের রক্ত মুছে দিয়ে ওষুধ লাগিয়ে দিলো। তারপর দরজার পাশে গিয়ে উচ্চকণ্ঠে ডাকলোরাহেলার মা! রাহেলার মা!
যাই আপা…রাহেলার মায়ের কণ্ঠ শোনা গেলো।
অল্পক্ষণে রাহেলার মা এসে দাঁড়ালো–আপা আমায় ডাকছেন?
হাঁ, শোন্ এক কাপ চা আর কিছু গরম সিঙ্গারা নিয়ে আয়, এখনও কিছু নাস্তা করতে পারিনি তেমন করে। শোন এনে আমাকে বাইরে থেকে ডাকবি।
আজ নতুন নয়–সুফিয়া নিজের ঘরে কারও যাওয়া পছন্দ করতো না; বলতো তার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটবে। সুফিয়া প্রায়ই শাসিয়ে দিতো রাহেলার মাকে–খবরদার, আমার ঘরে ঢুকবি নে।
তাই আজ সুফিয়ার কথায় কিছুমাত্র অবাক হলো না রাহেলার মা, অবাক হলো হঠাৎ অসময়ে চা-সিঙ্গারা খাবার জন্য এত আগ্রহ কেন সুফিয়ার। বললো সে–আচ্ছা, আসছি আপামণি।
চলে গেলো রাহেলার মা।
অল্পক্ষণের মধ্যেই রাহেলার মা গরম সিঙ্গারা আর চা নিয়ে দরজার পাশ থেকে ডাকলো– আপামনি, চা…সিঙ্গারা…
দড়বড় বেরিয়ে এলো সুফিয়া, রাহেলার মার হাত থেকে চা-সিঙ্গারার ট্রে নিয়ে চলে গেলো। ভিতরে যাবার সময় বললো–নিজের কাজ করগে যা, আমি যখন ডাকবো তখন আসবি।
চলে যায় রাহেলার মা নিজের কাজে।
বেগম সাহেবা তরকারি কাটছিলেন, রাহেলার মাকে বললেন–দিয়ে এসেছিস বাছার চা আর সিঙ্গারা?
হাঁ; দিয়ে এলাম আম্মা।
বেশ করছিস বাছা মেয়েটা সময় মত খাবে না; হঠাৎ কখন সে কি খেতে ইচ্ছা করে ঠিক নেই। না খেয়ে খেয়ে শুকিয়ে গেলো। বেগম সাহেবা আপন মনেই বিড় বিড় করে বলতে। লাগলেন।
সুফিয়া বনহুরের সম্মুখে খাবার রেখে বললো–ভাইয়া একটু মুখে দিন।
সুফিয়া, আমার হাত দুটো বাধা, খাবো কি করে, শুধু একটু বিশ্রাম করতে দাও।
আমি খাইয়ে দিচ্ছি ভাইয়া।
সুফিয়া!
বোন ভাইকে খাইয়ে দেবে এতে আপত্তি কিসে? সুফিয়া নিজের হাতে বনহুরের মুখে তুলে। দিতে লাগলো।
সত্যই বনহুর অত্যন্ত ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলো সুফিয়ার হাতে খেতে তার আপত্তি রইলো না।
এদিকে পুলিশ সুপারের কন্যাহস্তে দস্যু বনহুর যখন খাবার খাচ্ছিলো তখন পুলিশ সুপার দস্যু বনহুরের সন্ধানে পুলিশ ফোর্সদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন–একটা লোক যেন শহরের বাইরে যেতে না পারে কোন যানবাহনও নয়। শহরের প্রত্যেকটা রাস্তায় কড়া পাহারা থাকবে পুলিশ-সুপারের। নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ দল কাজ করতে লাগলো।
আজ গোটা দিন ধরে স্বস্তি নেই কারও।
পুলিশ সুপার থেকে শুরু করে পুলিশ-গার্ড পর্যন্ত।
কোথায় আজ দস্যু বনহুরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে দেশবাসী নিশ্চিন্ত হবে, আর হলো কি।
কথাটা অল্পক্ষণের মধ্যেই সমস্ত শহরে প্রচারিত হলো। রেডিও অফিস থেকে বললেন পুলিশ সুপারের জরুরি ঘোষণা।
সুফিয়ার টেবিলে রেডিওতে একটা পল্লীগীতি হচ্ছিলো, সুফিয়া যখন বনহুরের মুখে চায়ের কাপ তুলে ধরলো ঠিক সেই মুহর্তে শোনা গেলো পুলিশ সুপারের গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর, “পুলিশ বাহিনীর যথেষ্ট সতর্কতা সত্ত্বেও দস্যু বনহুর পুলিশ ভ্যান থেকে লাফিয়ে পড়ে বিপুল জনতার মধ্যে অদৃশ্য হয়েছে। শহরের যে কোন গোপন স্থানে সে এখন আত্মগোপন করে আছে। আজ তার মৃত্যুদণ্ডের তারিখ ছিলো। তাকে হাঙ্গেরী কারাগার থেকে জম্বুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো, কিন্তু আমাদের পুলিশ বাহিনীর সমস্ত সতর্কতা ভেদ করে দস্যু পালিয়েছে।”
