সুফিয়া এবার বললো–ভয় নেই আব্বা, পুলিশ সুপারের বাড়িতে দস্যু বনহুর আসতে সাহসী হবে না।
ওদিক থেকে শোনা গেলো মিঃ আহমদ সাহেবের কণ্ঠ–তুমি জানো না সুফিয়া, দস্যু বনহুর কত সাংঘাতিক!
সাবধানেই থাকবো, চিন্তা নেই। সুফিয়া রিসিভার রেখে দিলো।
বনহুর বললো–সুফিয়া, মিথ্যে কেন বললে? আমি তো এসেছি।
সুফিয়া বনহুরের দিকে তখন তাকিয়ে আছে। সুন্দর মুখমণ্ডলে মলিন একটা ছাপ, ললাটের পাশে এক জায়গায় কেটে গিয়ে রক্ত ঝরছে। চুলগুলো এলোমেলো রুক্ষ, হাতে হাতকড়া, সমস্ত শরীরে শিকল জড়ানো।
এমন সময় বাইরে শোনা গেলো মিসেস সুপারের কণ্ঠস্বর–সুফিয়া!
সুফিয়া চমকে উঠলো, তাড়াতাড়ি বনহুরকে লক্ষ্য করে বললো–ভাইয়া, আপনি শীঘ্র বাথরুমে প্রবেশ করুন, আম্মা এদিকে আসছেন।
বনহুর সুফিয়ার কথায় দ্রুত বাথরুমে প্রবেশ করলো।
পরক্ষণেই কক্ষে প্রবেশ করলেন মিসেস আহমদ, কন্যাকে লক্ষ্য করে বললেন–এখানে কার যেন কথা শুনলাম সুফিয়া?
কই, নাতো? আমিই পড়ছিলাম। আমার যেন মনে হলো কোনো পুরুষ-কণ্ঠ?
পুরুষ-কণ্ঠ! আমার ঘরে! …কি যে বলো আম্মা? সত্যি তুমি দিন দিন কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। আমার ঘরে পুরুষ আসবে কোথা থেকে!
কি জানি, তবে ওদিকে বোধ হয় রাজু কথা বললো। যাই দেখি রাজু বাজার নিয়ে বোধ হয় ফিরেছে।
রাজু পুলিশ-সুপার আহমদ সাহেবের বিশ্বাসী চাকর। যত দাস-দাসীই থাক বেগম সাহেবা রাজুকে ছাড়া কারও হাতে বাজারের টাকা দেবেন না। রাজুর বাজার নাকি সবচেয়ে তার মনপুতঃ হয়। বাসায় বেশ সংখ্যক চাকর-বাকর থাকা সত্ত্বেও সুপার গৃহিণীর অভ্যাস নিজ হাতে তরকারিটুকু কুটবেন, রান্নার সময় বাবুর্চির পাশে দাঁড়িয়ে রান্নাটা দেখবেন। কোনো কোনো দিন সখ করে তিনি নিজেও উনানের পাশে মোড়টা নিয়ে নিজ হাতে রান্না করবেন এসব তার অভ্যাস।
তাই রাজু যখন বাজার থেকে ফেরে তখন বেগম সাহেবা যেখানেই থাকুন না কেন, হাজির হবেন রান্না ঘরের দরজায়। অসুখ-বিসুখ হলেও তাঁর স্বস্তি নেই, চাদর মুড়ি দিয়ে এসে বসবেন মোড়াটা টেনে নিয়ে। রাহেলার মা ঝিঙ্গা কুটতে পারে ভালো, বেগম সাহেবা নিজে না পারলে ওকে দিয়েই কুটিয়ে নেন। ওটা এমনি করে কাটো, ওটা বেশি বড়ো করিসনে হঠাৎ যদি কোনোটা ভুল করে বসে তবে সুপার গৃহিণী রেগে আগুন হন, বলেন–নাঃ তোদের দিয়ে কিছু হবে না, যত। সব অকেজো। দে বটিটা, আমাকে দে দেখি, আমিই কুটছি।
রাহেলার মা অতি সাবধানে বেগুনটা বা আলুটা কাটছিলো কিংবা মাছের টুকরো করছিলো, বেগম সাহেবার বিরক্তিপূর্ণ কথাতে তাড়াতাড়ি বটি ছেড়ে দিয়ে সরে বসতো।
বেগম সাহেবা তরকারি কাটতে কাটতে বলতেন–দেখ একটু শিখে নে, দুদিন অসুখে পড়ে থাকলে যেন তরকারিটা অন্ততঃ কাটতে পারিস। সুপার-গৃহিণীর সংসারে প্রতি অত্যন্ত মোহ, কাজেই সবকিছু তিনি নিজে দেখাশুনা করিয়ে নেন।
আজও রাজুকে বাজারে পাঠিয়ে বেগম সাহেবা প্রতীক্ষা করছিলেন কখন ফিরবে সে। স্বামী সেই সাত সকালে এক কাপ চা মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন। আজ দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ড, কাজেই সারাটা দিন তিনি ব্যস্ত থাকবেন। কখন ফিরবেন ঠিক নেই।
এই বেলাটুকুর মধ্যে কতবার যে বেগম সাহেবা দস্যু বনহুরকে বদদোয়া করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। দস্যু বনহুরের জন্য আজ তার স্বামীকে রাত ভোর না হতেই ছুটতে হয়েছে অফিসে। কখন ফিরবেন না ফিরবেন তারও ঠিক নেই। শুধু কি আজই, এমনি অসময়ে ছুটতে হয়েছে বিশ্রাম ত্যাগ করে। তাই সুপার-পত্নীর যত রাগ ঐ দস্যু বনহুরের উপরে।
অবশ্য সুফিয়া মাকে বলেছিলো বহুদিন, আম্মা, দস্যু বনহুরকে তুমি দেখতে পারো না কেন? সে না হলে আজ তোমার কন্যাকে ফিরে পেতে না জানো?
বেগম সাহেবা বলতেন, যত বড় দস্যই হোক তোর আব্বার নাম শুনলে থরথর করে কাঁপে জানিস। তার ভয়েই দস্যু বনহুর তোকে সসম্মানে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে।
সুফিয়া হেসে বলতো, তুমি জানো না আম্মা, দস্যু কোনোদিন কাউকে ভয় করে না, আর সে, তো দুঃসাহসী দস্যু বনহুর। বেশি কথা বলে মাকে বিরক্ত করতে চাইতো না সে, সরে যেতো। আলগোছে।
আজ সকাল থেকে মা দস্যু বনহুরকে উদ্দেশ্য করে যখন গালমন্দ করছিলেন, নীরবে সরে থেকেছে সুফিয়া। মনের অবস্থা তার মোটেই ভাল নয়, কাজেই মায়ের সঙ্গে কথা বাড়াতে মন তার চাইতো না। চুপচাপ সরে ছিলো পড়ার ঘরে।
সুপার-গৃহিণী চলে যেতেই সুফিয়া বাথরুমের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো, চাপাস্বরে ডাকলো– ভাইয়া!
বাইরে বেরিয়ে এলো বনহুর, বললো সে–সুফিয়া, আমাকে কতক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারবে, তার চেয়ে পুলিশের হাতেই তুলে দাও।
ভাইয়া আপনার ঋণ জীবনে পরিশোধ করতে পারবো না। আমার জীবন দিয়েও আপনাকে রক্ষা করতে চেষ্টা করবো।
কিন্তু পারবে?
দৃঢ়কণ্ঠে বললো সুফিয়া–পারবো।
সুফিয়া বোন, কি করে তা সম্ভব হয়। তবে কোনোক্রমে রাত অবধি যদি আমাকে…
আপনাকে এ অবস্থায় আমি ছেড়ে দিতে পারিনে ভাইয়া। শিকলে আপনার সমস্ত শরীর বাঁধা, হাতে হাতকড়া।
সুফিয়ার কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে এলো।
বনহুর বললো–উপায় কি বলো?
ভাইয়া, আপনার হাতকড়া খুলে দিলে আপনি…
সুফিয়াকে কথা শেষ করতে দেয় না বনহুর, বলে উঠে–হাত কড়ার চাবি সংগ্রই করতে পারবে সুফিয়া?
