পুলিশ মহলে ভীষণ তোড়জোড় শুরু হলো। প্রত্যেকটা রাস্তায়, পথের বাঁকে ষ্টিমার ঘাটে, ফেরিঘাটে, টেলিফোন যোগে জানিয়ে দেওয়া হলো–দস্যু বনহুর পালিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ফোর্স ছুটলো। স্থানে স্থানে পাহারায় নিযুক্ত রইলো পুলিশগণ।
পুলিশ ইন্সপেক্টার মিঃ আহম্মদ কয়েকজন পুলিশ অফিসার সহ হন্তদন্ত হয়ে ছুটাছুটি শুরু করলেন। দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করতে তাকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছিলো, অনেক অসাধ্য সাধন করেই তবে তিনি জয়ী হতে পেরেছিলেন।
দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তার করে তিনি নিজেকে কৃতার্থ মনে করেছিলেন। তাঁর দক্ষ বুদ্ধি কৌশলকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলো। যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন তিনি। পুরস্কৃতও হয়েছিলেন–সরকার বাহাদুর লক্ষ টাকা তাঁকে দিয়েছেন দস্যু বনহুরকে গ্রেপ্তারের জন্য।
পুলিশ সুপার কাওসার আহমদ সাহেব আজ স্বয়ং উপস্থিত থেকে দস্যু বনহুরকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করবেন। সমস্ত দেশবাসীকে ভয়ঙ্কর দস্যুর কবল থেকে নিষ্কৃতি দেবেন। আজ থেকে হবে সকল চিন্তার অবসান। কিন্তু সব পণ্ড হয়ে গেলো, পুলিশ বাহিনীর এত পরিশ্রম সব বিফলে গেলো। পুলিশ সুপার ব্যস্তভাবে এখানে সেখানে, বিভিন্ন থানা, পুলিশ অফিসে টেলিগ্রাম করে চললেন।
সমস্ত পুলিশ বাহিনীর ব্যস্ততার সীমা নেই। বাসায় ফেরা তো দূরের কথা, এতটুকু নিশ্বাস ফেলার সময় নেই কারও।
*
পুলিশ সুপার কাওসার আহমদ সাহেবের বাসা।
পড়বার ঘরে বসে সুফিয়া বইয়ের পাতা উল্টে চলেছে, কয়েক দিন পর তার এম, এ, ফাইনাল পরীক্ষা। কিন্তু কিছুতেই বইয়ে মন দিতে পারছে না। যেদিন শুনেছে সুফিয়া দস্যু বনহুর গ্রেপ্তার হয়েছে, সেদিন হতেই তার বুকের মধ্যে একটা তোলপাড় শুরু হয়েছে। দস্যু বনহুরের সঙ্গে তার যে একটা গভীর সম্বন্ধ রয়েছে।
আজ কদিন থেকে সুফিয়ার চোখে ঘুম নেই, আহারে রুচি নেই। সব সময় গভীর চিন্তায় মগ্ন। বারবার মনে পড়ছে তার কথা–কার দয়ায় আজ সে ফিরে পেয়েছে নিজের জিন্দেগী, নিজের ইজ্জৎ। ঝিন্দ রাজকুমার মঙ্গল সিন্ধের লালসাপূর্ণ কবল থেকে যে তাকে রক্ষা করেছিলো, সে অন্য কেউ নয়–স্বয়ং দস্যু বনহুর।
শুধু তাকে রক্ষা করেনি সে, বড় ভাইয়ের স্নেহ-মায়া-মমতা দিয়ে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলো। সুফিয়া আজও ভুলতে পারেনি তাকে, কোনো দিন ভুলতে পারবে না।
দস্যু হলেও তার অন্তরের যে পরিচয় সুফিয়া পেয়েছে, তা ফেরেস্তার চেয়েও মহান। শুধু মানুষ হলেই নয়; হৃদয় যার উন্নত–মহৎ, সেই তো মানুষ।
পৃথিবীর সবাই যদি দস্যু বনহুরকে ঘৃণা করে, তার সুন্দর চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করে সুফিয়া পারবে না তাকে অবিশ্বাস করতে।
আজ দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ড।
সুফিয়া পিতাকে বিদায় দিয়ে তার নিজের ঘরে এসে বই নিয়ে বসেছে, কিন্তু বইয়ের পাতা উল্টেই যাচ্ছে শুধু সে একটা অক্ষর তার চোখে পড়ছে না। মন তার চলে গেছে দূরে–বহু দূরে সেই অতীতে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে…বিনয় সেন বেশে দস্যু বনহুর, আর নিজের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে স্মরণ হতে লাগলো। সৌম্য-সুন্দর পুরুষোচিত দীপ্ত একখানা মুখ ভেসে উঠতে লাগলো সুফিয়ার চোখের সামনে, সে কিছুতেই নিজকে সংযত রাখতে পারছে না। দস্যু বনহুরের মৃত্যুদণ্ড সংবাদে অসহ্য একটা বেদনা অনুভব করছে সুফিয়া মনের কোণে; ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার গণ্ড বেয়ে পুস্তকের উপরে…হঠাৎ একটা শিকলের শব্দ ঝনাৎ করে উঠে তার কানে; চমকে ফিরে তাকায় সুফিয়া, বিস্ময়ে আরষ্ট হয়ে যায় সে। তার বইয়ের সেলফের পেছন থেকে এগিয়ে আসে দস্যু বনহুর। সমস্ত শরীরে তার শিকল বাধা, হাতে হাতকড়া।
সুফিয়া বিস্ময় বিস্ফারিত নয়নে দাঁড়িয়ে, মুখে তার কোনো কথা বের হচ্ছে না–একি সে স্বপ্ন দেখছে না সত্য!
বনহুর বুঝতে পারে, সুফিয়া তাকে এখানে দেখে বিস্ময়ের চরম সীমায় পৌঁছেছে। বিস্মিত হবার কারণও বটে। বনহুর তার সামনে এসে দাঁড়ালো–সুফিয়া, মৃত্যুর কবল থেকে পালিয়ে এসেছি।
এতক্ষণে অস্কুটধ্বনি করে উঠলো সুফিয়া ভাইয়া। ঠিক সেই মুহূর্তে টেবিলে ফোনটা বেজে উঠলো ক্রিং ক্রিং করে। সুফিয়া রিসিভার হাতে তুলে নিয়ে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো তার পিতার উদ্বিগ্ন কণ্ঠ–হ্যালো সূফিয়া; বড় দুঃসংবাদ।
হ্যালো, বলুন? বললো সুফিয়া। গলার আওয়াজ কেমন কেঁপে গেলো তার।
ওদিক থেকে বললেন পুলিশ সুপার–দস্যু বনহুর পালিয়েছে, আমাদের পুলিশ ফোর্সের চোখে ধূলো দিয়ে সে অসংখ্য জনতার মধ্যে আত্মগোপন করেছে…
সুফিয়া কোন কথা বলতে পারছে না, চুপ করে শুনে যাচ্ছিলো। ওপাশ থেকে আহমদ সাহেবের ব্যস্তকণ্ঠ–হ্যালো সুফিয়া, হ্যালো…
হ্যালো বলুন আব্বা?
সুফিয়া, তোমার গলার আওয়াজ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। হ্যালো হ্যালো সুফিয়া, কি হয়েছে?
কিছু না।
সুফিয়া, দস্যু বনহুর এখন শহরের মধ্যে কোনো স্থানে আত্মগোপন করে আছে। শহরের বিভিন্ন পথে-ঘাটে সর্বস্থানে তার সন্ধানে পুলিশ বাহিনী ব্যস্তভাবে ঘোরাফেরা করছে। সমস্ত পথে পুলিশ পাহারায় নিযুক্ত রয়েছে। কোনোক্রমে সে এখন শহরের বাইরে পালাতে পারবে না। হ্যালো সুফিয়া…হ্যালো…
বলুন আব্বা, বলুন, হ্যালো…বলুন?
প্রত্যেকটা বাড়িতে আনাচে-কানাচে, রান্নাঘরে, শোবার ঘরে খুঁজে দেখা হচ্ছে। হ্যালো সুফিয়া, আমাদের বাসায় তোমরা সাবধানে থাকবে…
